আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
ভাসানচরে আবাসন হচ্ছে এক লাখ রোহিঙ্গার, প্রকল্প অনুমোদন

নিপীড়নের মুখে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আবাসন সংকট নিরসনে ‘আশ্রয়ণ-৩’ নামে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নোয়াখালীর ভাসানচরে আশ্রয় পাবে এক লাখ ৩ হাজার ২০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী। আবাসনের পাশাপাশি দ্বীপের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও নির্মাণ করা হবে এ প্রকল্পের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে দুই হাজার ৩১২ কেটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নের এ প্রকল্পের কাজ ২০১৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৮ নভেম্বর) রাজধানীর শেরে-বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় “নোয়াখালী জেলার হাতিয়া থানাধীন চর ঈশ্বর ইউনিয়নস্থ ভাসান চরে ১ লক্ষ বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের আবাসন এবং দ্বীপের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ” প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে ইতিমধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে। কিন্তু এত অভিবাসীকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সময় দরকার। বর্তমানে অনেক রোহিঙ্গা খোলা আকাশের নিচে অমানবিক পরিবেশে বসবাস করছে। এ পরিস্থিতিতে তাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, নোয়াখালী জেলার চর ঈশ্বর ইউনিয়নে ভাসান চরের অবস্থান। নোয়াখালী থেকে এর দূরত্ব ২১ নটিক্যাল মাইল।

একনেক সভা সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ৩ হাজার ২০০ জনের বসবাসের জন্য ১২০টি গুচ্ছগ্রাম নির্মিত হবে। যেখানে ১ হাজার ৪৪০টি ব্যারাক হাউজ, ১২০টি শেল্টার স্টেশন থাকবে। এছাড়া, উপসানলয়সহ দ্বীপটির নিরাপত্তার জন্য নৌ-বাহিনীর অফিস ও বাসভবন নির্মিত হবে। এছাড়াও ভাসানচরের অভ্যন্তরীণ সড়ক, পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো, নলকূপ, ওয়াচ টাওয়ার, বেড়া, নির্মিত হবে। রোহিঙ্গাদের ‍সুবিধায় একটি মাইক্রোবাস, ১২টি মোটরসাইকেল, ২৩টি হিউম্যান হলার, ৪০টি ঠেলাগাড়ি, ৪৩টি ভ্যানগাড়ি এবং আটটি হাইস্পিড বোট কেনা হবে। বিশাল প্রকল্পের আওতায় গুদামঘর, জ্বালানি ট্যাঙ্ক, হেলিপ্যাড, চ্যানেল মার্কিং, বোট ল্যান্ডিং সাইট, রাডার স্টেশন, সোলার প্যানেল, জেনারেটর, বৈদ্যুতিক সাব স্টেশন নির্মিত হবে।

সূত্র আরও জানায়, নানা কারণে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার থেকে আসা বিপন্ন রোহিঙ্গাদের বিশাল স্রোত দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বলপূর্বক এসব রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। কক্সবাজারে শরণার্থী রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রতিনিয়ত এখানে পাহাড়ি জমি ও বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে। টেকনাফ ও উখিয়ায় প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা আছে। সব মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করছেন। বাংলাদেশে পর্যটনের প্রধান কেন্দ্র কক্সবাজার হুমকির মুখে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জরুরি ভিত্তিতে ১ লাখ নাগরিকের আবাসন সমস্যা নিরসনে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

ভাসান চর
এই চরের আয়তন জোয়ারের সময় ১০ হাজার এবং ভাটার সময় ১৫ হাজার একর। জনমানবহীন চরটি মূলত গরু-মহিষের চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হত। ২০১৩ সালে এ চরকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল এলাকা ঘোষণা করা হয়। ইঞ্জিনচালিত নৌযান ছাড়া সেখানে যাতায়াতের সুযোগ নেই। হাতিয়া থেকে যেতেও তিন থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। এক দশক আগে জেগে ওঠা এই চরকে ‘ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ’ এবং জলদস্যুর উৎপাতের কারণে বসবাসের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করে চলতি বছরের শুরুতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ বন বিভাগের এক প্রতিবেদনেও দ্বীপটিকে মানুষ বসবাসের অনুপযোগী বলা হয়।

মাসখানেক পরে নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাসান চরের পরিবেশ অন্যান্য চরের মতই। আনুষঙ্গিক অবকাঠামো তৈরি করা হলে সেখানে জনবসতি স্থাপনে সমস্যা হবে না। এর মধ্যে আগস্টের শেষে মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হলে আবারও রোহিঙ্গার ঢল নামে। এ দফায় প্রায় সোয়া ছয় লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে এসে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়ায় ভাসান চরকে দ্রুত বসবাসের উপযোগী করার উদ্যোগ নেয় সরকার।

গত ২০ নভেম্বর জাতীয় এক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেদেশের সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, বাড়ি-ঘরে আগুন দেওয়া শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়ে কক্সবাজার জেলায় আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে বিভিন্ন শিবিরে।

 

সম্পাদনা: আরএ/এসকে/জেডএইচ

মন্তব্য