আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
প্লাস্টিক: আধুনিক যুগের নির্মাতা নাকি পরিবেশ ধ্বংসকারী!

মাত্র এক শতাব্দীর ব্যবধানে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর উদ্ভাবন থেকে প্লাস্টিক পরিণত হয়েছে পরিবেশ দূষণকারী অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে।

আজ থেকে ১১১ বছর আগে ১৯০৭ সালে প্রথম আধুনিক প্লাস্টিক, বেকেলাইট উদ্ভাবন করা হয়। এ উদ্ভাবনের ফলে অসংখ্য সিনথেটিক পলিমার দ্রব্য উৎপাদনের দরজা খুলে যায়। সিনথেটিক পণ্য হচ্ছে এমন পণ্য, যা বৃহৎ অণুর যৌগের সরল পুনরাবৃত্তি এককে উৎপাদিত।

গেল শতকের ৫০ দশকের শেষ দিকে এবং ষাটের দশকের শুরুর দিকে ম্যানুফ্যাকচারিং প্রক্রিয়া উন্নত হওয়ায় প্লাস্টিক তৈরির উৎপাদন ব্যয় ব্যাপক মাত্রায় হ্রাস পায়, ফলে সস্তায় বিপুল উৎপাদন শুরু হয়।

যুক্তরাজ্যর কভেন্ট্রিভিত্তিক ম্যানুফ্যাকচারার স্টেজার ক্লিয়ার প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ান জেমি বলেন, প্লাস্টিক একটি অনবদ্য উপাদান, একটি অনবদ্য উদ্ভাবন। এটি পালকের মতো হালকা, শক্তিশালী, স্বচ্ছ, পানিরোধী।

এটা বলা অতিশয়োক্তি হবে না যে, প্লাস্টিক আধুনিক দুনিয়া নির্মাণ করেছে। আজকের দিনে যেসব জিনিসকে নিশ্চিত ধরা হয়, সেগুলোর অনেকগুলোই এর ওপর নির্ভর করছে। উদাহরণস্বরূপ, দুগ্ধপণ্য এখন আর কাচের বোতলে পরিবহন করতে হয় না। এগুলো পরিবহন করা এখন অনেক নিরাপদ ও কম আয়াসসাধ্য হয়েছে।

প্লাস্টিকের ফলে সুপারমার্কেটগুলোয় নানা ধরনের তরতাজা পণ্য, নানা আকারে সাজিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলেন, খোলা বিক্রি না করে আঁটসাঁট ট্রেতে আঙ্গুর বিক্রির ফলে খুচরা দোকানদাররা ২০ শতাংশের বেশি অপচয় কমিয়েছেন।

খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো ভোক্তাদের উপদেশ দেন খাদ্যের বিষক্রিয়া এড়াতে মুরগির মাংস প্লাস্টিক ব্যাগে মুড়ে রাখার জন্য। আধুনিক চিকিৎসাও ১৯৫৫ সালে ডিসপোজিবল প্লাস্টিক সিরিঞ্জ উদ্ভাবন হওয়ার পর দারুণ উপকৃত হয়েছে।

ব্রিটিশ প্লাস্টিক ফেডারেশনের মতে, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যদি প্লাস্টিকের বদলে অন্য কিছু দিয়ে পণ্য প্যাকেজিং করা হতো, তবে প্যাকেজিংয়ের ওজন, শক্তির অপচয় এবং গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ বেড়ে যেত। প্লাস্টিকের বদলে অন্য কোনো উপাদান ২ দশমিক ৭ গুণ গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ বাড়িয়ে দিত।

এসব কারণে বেশির ভাগ পরিবেশবাদী প্লাস্টিক-পূর্ব যুগে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে খুব কমই গুরুত্বারোপ করেন। বরং চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এর সবচেয়ে বাজে প্রভাবগুলো সীমিত করা এবং এর ফলে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমিয়ে আনার উপায় খোঁজা।

ডেম এলেন ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ পরিচালনা করছে, যার নাম নিউ প্লাস্টিক ইকোনমি। এতে পুরো পণ্য চক্রটি নতুন করে ডিজাইন করতে হয়। নিজ নামে ফাউন্ডেশনটি পরিচালনা করা ডেম এলেন ম্যাকআর্থার বিবিসিকে বলেন, প্রতি বছর ৭ কোটি ৮০ লাখ টন প্লাস্টিক প্যাকেজিং পণ্য উৎপাদন হয়, যার ৪০ ভাগ সরাসরি মাটি ভরাটে চলে যায়।

তিনি বলেন, এর ৩২ শতাংশ পরিবেশে অবমুক্ত হয়, ১৪ শতাংশ ভস্মীভূত হয় এবং মাত্র ১৪ শতাংশ রিসাইকেল করার জন্য সংগৃহীত হয়। এর মধ্যেও মাত্র ২ শতাংশ একই মানের প্লাস্টিকে রিসাইকেল করা হয়। এটি দারুণ, তবে ৭ কোটি ৮০ লাখ টনের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ খুবই অপ্রতুল।

ডেম এলেন বলেন, ৫০ শতাংশ প্লাস্টিকই কার্যকরভাবে রিসাইকেল করা যায়। প্রায়ই এমন পণ্য বানানো হয়, যেগুলো রিসাইকেল করা যায় না, কারণ রিসাইকেলযোগ্য এবং রিসাইকেল অযোগ্য প্লাস্টিকের অংশ এতে মিশে থাকে এবং সেগুলোকে সহজে আলাদা করা যায় না।

স্টাইজার ক্লিয়ার প্যাকেজিংয়ের জেমি বলেন, তিনি গবেষকদের নিয়ে নতুন ধরনের প্লাস্টিকের সন্ধান করছেন, যেগুলো পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকারক হবে। তবে কারিগরি কারণে আগের উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হয়েছে এবং নতুন পণ্যটি আরো দামি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেষতক সমাধান ভোক্তাদের হাতে। যারা প্লাস্টিক ক্যানের বিরোধিতা করেন, তারা প্রায়ই কাচের বোতল কিংবা টিনের ক্যানে প্যাকেট করা পণ্য কিনতে পারেন। এছাড়া অন্যান্য ধরনের প্লাস্টিকও উন্নয়ন করা হচ্ছে। তবে সেগুলোর দাম বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, প্লাস্টিক দূষণ কমানোর জন্য ত্যাগ স্বীকার করার জন্য কি ভোক্তারা প্রস্তুত আছেন? বণিকবার্তা

শেয়ার করুন