আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
ধূলিসাৎ করা হচ্ছে ল্যাবএইডের পাশে সবুজ সড়কদ্বীপগুলো

সড়কদ্বীপে কৃত্রিম লেক ও দুটি ছোট্ট জলাধারে ফুটে আছে পদ্ম। আছে নানা জলজ উদ্ভিদ। ব্যাঙ, শামুক, ঝিনুক, ছোট ছোট মাছও আছে। সাঁতার কাটছে হাঁস। কৃত্রিম পাহাড়সারির চূড়ায় বসানো ঘরে বাকবাকুম করে ডাকছে কবুতর। আছে ফুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। ডালে বসে কিচিরমিচির করে শালিক, চড়ুই, দোয়েল। উড়ছে প্রজাপতি, ফড়িং।
রুক্ষ নগরের বুকে এই কোমল সুন্দরের অবস্থান সায়েন্স ল্যাবরেটরির সড়কদ্বীপে, নাম অর্ঘ। কংক্রিটের এই শহরের মিরপুর রোড ও গ্রিন রোডের সংযোগস্থলের এই সবুজ দেখে প্রশান্তি অনুভব করেন পথচারীরা। দেখতে বদ্বীপের মতো এই ছোট উদ্যানটি ভেঙে ফেলার তোড়জোড় শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
কয়েক মাস আগে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার মোড়ের সড়কদ্বীপে হেরিটেজ ক্রিয়েটিভ কাউন্সিলের ‘নগরে নিসর্গ’টি ভেঙে ফেলে ডিএসসিসি। সেখানে সিটি করপোরেশন বড় আকারের এলইডি বিলবোর্ড বসিয়েছে। অথচ নগরে নিসর্গ নামের সড়কদ্বীপটি ছিল এই এলাকার একমাত্র সবুজ স্থান। এটির বৈশিষ্ট্য অনেকটাই অর্ঘ উদ্যানের মতো ছিল বলে জানিয়েছে হেরিটেজ ক্রিয়েটিভ কাউন্সিল।
ডিএসসিসি থেকে ইজারা নিয়ে সড়কদ্বীপ দুটিতে নান্দনিক সবুজায়ন করেছিল হেরিটেজ ক্রিয়েটিভ কাউন্সিল নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। সিটি করপোরেশনের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি সময়মতো ডিএসসিসিকে রাজস্বও দেয়নি। ইজারার নির্দিষ্ট মেয়াদও শেষ হয়েছে। তাই নতুন করে আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ‘অর্ঘ’সহ আরও ছোট্ট দুটি সড়কদ্বীপ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অর্ঘ সড়কদ্বীপটি যে অবস্থায় আছে, তাকে সেভাবে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রকৃতি ও নগর পরিকল্পনাবিদেরা। তাঁরা বলেছেন, সেখানে এলইডি বিলবোর্ড বসালে এই সড়কদ্বীপে পাখি, জলজ প্রাণী, উদ্ভিদ, পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ আর থাকতে পারবে না। ভালো জিনিস ভেঙে নতুন করে গড়ার পেছনে বাণিজ্যিক ভাবনা কাজ করছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
হেরিটেজ ক্রিয়েটিভ কাউন্সিল জানায়, আগে অর্ঘ সড়কদ্বীপের জায়গাটি পরিত্যক্ত ছিল। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে ডিএসসিসি থেকে জায়গাটি সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বরাদ্দ নেন হেরিটেজ ক্রিয়েটিভ কাউন্সিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাফেয়া আবেদীন। ১৮ কাঠার এই জায়গাটিতে তিনি প্রায় ৪২ লাখ টাকা খরচ করে সবুজ ল্যান্ডস্কেপ তৈরি করেন। ডিএসসিসির অনুমতি নিয়ে সেখানে তিনটি বিলবোর্ডও স্থাপন করা হয়। বিলবোর্ড থেকে আসা আয় এটার রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করতেন। তিনি জানান, প্রতিবছর তাঁকে বরাদ্দ নবায়ন করতে হতো। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে তাঁকে আর বরাদ্দ নবায়নের সুযোগ দেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালের শেষ দিকে সড়কদ্বীপের বিলবোর্ডও ভেঙে ফেলে ডিএসসিসি। এতে আয় বন্ধ হয়ে গেলেও তিনি নিজ খরচে দেড় বছর ধরে সড়কদ্বীপটির সৌন্দর্য রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন। এখন শুনছেন, তাঁর বরাদ্দ বাতিল করে দিয়েছে ডিএসসিসি। আর, এই উদ্যানটি ভেঙে ফেলবে ডিএসসিসি। তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে, এই সড়কদ্বীপে এলইডি বিলবোর্ড স্থাপন করবে ডিএসসিসি। তা করা হলে রঙিন আলো ও শব্দের কারণে উদ্যানে পাখি আসবে না। পোকামাকড়, কীটপতঙ্গও বাঁচবে না। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে।’
রাফেয়া আবেদীন বলেন, ‘আমি চাই সড়কদ্বীপটি যে অবস্থায় আছে, সেভাবেই থাকুক। না ভেঙে এটি রক্ষণাবেক্ষণে যত্ন নিতে হবে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, সায়েন্স ল্যাবরেটরির পেট্রল পাম্পসংলগ্ন উদ্যানটির চারদিকে বেষ্টনী দেওয়া। উদ্যানের ভেতর আছে কাঞ্চন, জাপানি কাশিয়া, চেরি, গোল্ডেন শাওয়ার, টাইগার লিলি, বাগানবিলাস, রক্তকরবী, দোপাটি, বকুল, রঙ্গন, জবা, টগর, হাসনাহেনা, কয়েক জাতের কাঠগোলাপের গাছ। উদ্যানের চারদিকের ফুটপাতও সাজানো হয়েছে গাছ দিয়ে। উদ্যানের ভেতরে কালো টাইলসে নির্মিত ভাস্কর্য।
ল্যাবএইড হাসপাতাল এলাকা থেকে এই উদ্যানের পাশ দিয়ে হেঁটে নিউমার্কেটের দিকে যাচ্ছিলেন পথচারী রায়হান আলমগীর। পার্কটি দেখে এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়ালেন তিনি। আলাপকালে বললেন, এখানে একটি ছোট্ট পার্ক বা সবুজ জায়গা আছে, সেটি এই পথে গাড়িতে আসা-যাওয়ার পথে দেখেছি। কাছ থেকে দেখা হয়নি। সড়কদ্বীপটি যে এত সুন্দর করে সাজানো হয়েছে, তা কাছে না এলে বুঝতে পারতাম না।’ তিনি বলেন, নগরীর প্রতিটি সড়কদ্বীপে এ রকম উদ্যান তৈরি করলে শহরের সৌন্দর্য বাড়বে। যথাযথভাবে যত্ন নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও একটি সবুজ নগরী পাবে।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার বলেন, ওই প্রতিষ্ঠানকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই সড়কদ্বীপটি ইজারা দেওয়া হয়েছিল। তাদের ইজারার সময় শেষ হওয়ায় নতুন করে আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যে প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তারা তাদের মতো নকশা তৈরি করে ডিএসসিসিতে জমা দিয়েছে। সেটি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত করেছে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও মেয়র। নতুন নকশাটি বর্তমান সড়কদ্বীপের চেয়ে অনেক আধুনিক। ডিজিটাল বিলবোর্ডে এর ক্ষতি হবে না।
পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার মোড়ে হেরিটেজ ক্রিয়েটিভ কাউন্সিলের তৈরি করা আরেকটি সড়কদ্বীপ ছিল, নাম ‘নগরে নিসর্গ’। এই সড়কদ্বীপটির বৈশিষ্ট্যও অনেকটা অর্ঘের মতো ছিল। পাশের একটি পার্কের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলে কয়েক মাস আগে সেটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। তারপর সেখানে বসিয়েছে ডিজিটাল বিলবোর্ড।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, আগে ওই পার্কটির চারপাশে কংক্রিটের টবে ছিল নানা জাতের ফুলগাছ। পুরো চত্বর ঘিরে ছিল সবুজ ঘাস। পরিপাটি করে কাটা ঘাসগুলো ছিল যেন সবুজ গালিচা। দক্ষিণ পাশে ছিল পাহাড়ের আদলে নির্মিত স্থাপনা। এর বেশ কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে পানি নিচে নেমে আসত। এই সড়কদ্বীপটি পুরান ঢাকার পরিবেশের জন্য ছিল স্বস্তিকর। গতকাল বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা যায়, ধু-ধু সড়কদ্বীপটির চারপাশে টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।
হেরিটেজ ক্রিয়েটিভ কাউন্সিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাফেয়া আবেদীন বলেন, ‘২০০৮ সালের মার্চে ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকার সৌন্দর্যবর্ধন করতে পাঁচ কাঠা আয়তনের এই সড়কদ্বীপটি সবুজময় করেছিলাম। এতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। অথচ গত বছরের মার্চে সড়কদ্বীপের ভেতর এলইডি বিলবোর্ড স্থাপন করেছে ডিএসসিসি। এ ধরনের স্থাপনা নগরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্যের পরিপন্থী। এর মাস ছয়েক পর পুরো সড়কদ্বীপটিই গুঁড়িয়ে দিয়েছে তারা।’
জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, ‘অর্ঘ ও নগরে নিসর্গ-দুটি সড়কদ্বীপ হেরিটেজ ক্রিয়েটিভ কাউন্সিল যেভাবে সবুজময় করেছিল, সেটি প্রশংসার দাবিদার। তবে বর্তমানে আমরা যেভাবে এগুলো সাজাতে চাইছি, সেটা বাস্তবায়ন হলে আগের চেয়ে সৌন্দর্য বাড়বে।’
এ বিষয়ে নিরাপদ ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, ছোট এ জায়গাটিতে অসংখ্য প্রজাপ্রতি ও ছোট ছোট প্রাণীসহ এটিকে যেভাবে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে, তা খুবই দৃষ্টিনন্দন। উন্নয়ন মানেই প্রকৃতিকে ধ্বংস করার একটা অপচেষ্টা দীর্ঘদিন থেকে লক্ষ্য করছি, যা খুবই দুঃখজনক।

মন্তব্য