আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
ইউলুপে কমেছে গতি, বেড়েছে ভোগান্তি

দুপুর দুইটা। রামপুরা ব্রিজ হয়ে এগোচ্ছে বাসের সারি। গন্তব্য কুড়িল। কিছু দূর গিয়ে একে একে থমকে দাঁড়াল বাসগুলো। উপায় না দেখে যাত্রীদের কেউ কেউ নেমে পড়লেন, হাঁটা শুরু করলেন বাড্ডা লিংক রোডের দিকে। দূরের যাত্রীরা বাসেই রইলেন বসে। স্টার্ট বন্ধ করে দিলেন চালকরা।

১৬ এপ্রিল, সোমবার এমন চিত্র চোখে পড়ে রাজধানীর মধ্য বাড্ডায়। যানবাহনের গতি বাড়াতে একটি ইউ আকৃতির সড়ক তথা ইউলুপ নির্মাণের কাজ চলায় এমন দৃশ্য স্বাভাবিক হয়ে গেছে ওই এলাকাটিতে।

রাজধানীর হাতিরঝিল, রামপুরা ব্রিজ ও লিংক রোড এলাকার যানজট নিরসনে বিকল্প তৈরি করতে ওই ইউলুপটি নির্মাণ শুরু হয় ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে। এরপর তিন বছর পার হতে চললেও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ। এই সময়ে শুধু সড়কে ভোগান্তি নয়, আশপাশের দোকানিদের বিক্রি কমেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিকল্পনায় ওই ইউলুপ নির্মাণ শুরু হয়। হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এর কাজ চলছে। উদ্দেশ্য ছিল সহজে দ্রুত গতিতে এক পাশ থেকে অন্য পাশে গাড়িগুলোর চলাচলে সুবিধা করে দেওয়া।

নকশা অনুযায়ী বাড্ডা ইউলুপের দৈর্ঘ্য ৪৫০ ও প্রস্থ ১০ মিটার। ইউলুপটি তৈরির কাজ করছে স্পেকট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড।

সোমবারের পর বুধবার দুপুরে গিয়ে দেখা গেল, ইউলুপের অর্ধেক গোলাকার অংশে শ্রমিকরা ঢালাইয়ের কাজ করছেন। ব্রিজের রেলিংয়ের পাত বসাতে চলছে ঝালাইয়ের কাজও। কাজের পর বিভিন্ন মালামাল অর্ধেক কাজ হওয়া ব্রিজের ওপর ফেলে রাখা হয়েছে।

কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢালাই শুরুর আগে রডের ওপর লোহার পাত বসাতে ঝালাই চলছে। এ জন্য সময় লাগবে মাসখানেক। ঢালাই শুরু হবে আরও দুই মাস পর। সে সময় শ্রমিকের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। জুনের মাঝামাঝি নাগাদ তারা ঢালাই দিতে পারবেন বলে আশা করছেন। তবে বর্ষার কারণে কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে।

শ্রমিকদের কাজ দেখিয়ে দিচ্ছিলেন কামরুল নামের এক সাইট প্রকৌশলী। কতদিনে কাজ শেষ হবে ও কারা এর দেখভাল করছেন জানতে চাইলে কামরুল প্রিয়.কমের কাছে বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। শুধু একটি কথাই বলেছেন, ‘বিষয়টির দেখভাল করছেন মেজর সাদিক স্যার। তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন।’

ইউলুপের কাছে গিয়ে দেখা যায়, এর নিচ দিয়ে যানবাহন চলছে ঝুঁকি নিয়ে। মাথার ওপরে বিশাল বিশাল লোহার পাত ঝুলে থাকায় যানবাহনগুলোকে থাকতে হচ্ছে সার্বক্ষণিক ঝুঁকিতে। পাতগুলো যেকোনো সময় খুলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নির্মাণাধীন ইউলুপের পাশে থাকা একটি ভবনের বাসিন্দা রিয়াজুল হক বলেন, ‘এই কাজ যে কতদিনে শেষ হবে? আমরা আর পারছি না। প্রতিদিন ধুলাবালি খেতে খেতে অবস্থা কাহিল।’

রিয়াজুল জানান, শুষ্ক মৌসুমে ইউলুপের নিচের রাস্তা থেকে ধুলাবালি উড়ে, পাশের ভবনের বাসায় ঢুকে পড়ে। এতে অনেকের কাশি ও বুকের সমস্যা হয়েছে এবং হচ্ছে। বিশেষ করে স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীরা বেশি বিপাকে পড়েন। বেশির ভাগ সময় তারা চলাচলের সময় হাতে রুমাল ব্যবহার করে পথ চলেন।

রুবাব হাসান নামের এক কলেজছাত্র বলে, ‘আমরা চাই ইউলুপটি হোক। কিন্ত ভোগান্তিতে ফেলে নয়।’

গাজীপুর-সায়েদাবাদ রুটে চলা তুরাগ পরিবহণের হেলপার আরিফ জানান, যখন কাজ শুরু করা হয়, সে সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে ছিল। কাজ অর্ধেক শেষ হওয়ায় আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তারপরও রাতের বেলা হাতিরঝিল অংশের সিগন্যালকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

আরিফ জানান, ইউলুপটি তৈরির সময় যানজট বেশি ছিল। এমনও রাত গেছে, যানজটে পড়ে ভোর পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে দ্রুত কাজ শেষ করতে পারলে ইউলুপের সুফল পাওয়া যাবে।

সুপ্রভাত পরিবহনের চালক রাজু আহমেদ জানান, আগে এমনও দিন গেছে, যানজটে পড়ে সারাদিন চলে গেছে। তবে এখনো সেই যানজট কমেনি। এই ভোগান্তি কবে শেষ হবে, সেই জিজ্ঞাসাই ছিল তার।

রাফি এন্টারপ্রাইজ নামের একটি স্টিলের দোকানের মালিক রাকিব হোসেন জানান, ইউলুপ তৈরির সময় তার দোকান ছিল পশ্চিম দিকে। কিন্তু এর কাজ শুরুর পর তাকে দোকান ভেঙে অন্য অংশে নিতে হয়েছে। আর এ জন্য যেমন দোকান তৈরিতে বাড়তি ব্যয় হয়েছে, তেমনি বেচা-বিক্রিও কমেছে।

ইউলুপের পূর্ব অংশে পুরান কাগজ বিক্রির ব্যবসা করেন লিটন। তিনি জানান, ইউলুপ তৈরিতে সাধারণ মানুষ সুবিধা পাবেন। কিন্তু তার দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। আগের বিক্রির চার ভাগের এক ভাগও এখন হয় না। ক্রেতারা অনেকে তার দোকান অন্যত্র চলে গেছে বলে আসেন না। এ কারণে বিক্রিতে ভাটা পড়েছে।

পুরান কাপড় বিক্রেতা দুলাল জানান, তিন বছর থেকেই তার কেনাকাটায় মন্দাভাব। ইউলুপ তৈরির আগে তিনি ভালোই আয় করতেন। ইদানীং তার দোকানে তেমন ক্রেতাও আসেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক জামাল আক্তার ভূঁইয়া জানান, ইউলুপটির প্রায় ৮৬ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। নিচের অংশে এখন কাজ চলছে। ওপরের দিকের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত কাজের সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। কাজ শুরুর পর মামলার কারণে অনেক দেরি হয়ে যায়। পাশাপাশি ডেসকো, বিটিসিএল, তিতাস, ওয়াসাসহ বেশ কিছু পরিষেবা সংস্থার আন্ডারগ্রাউন্ড তার নিয়ে সমস্যাও ছিল।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা মেজর এসএম সাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘অফিসে আসেন, সরাসরি কথা বলব।’ প্রিয়

মন্তব্য