আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
স্বকীয়তা হারাচ্ছে ঢাকার আট পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা

ঢাকায় পরিকল্পিত আবাসনের জন্য স্বাধীনতা-পূর্বাপর সময়ে পরিকল্পিত বিভিন্ন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়। তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট বা ডিআইটি (বর্তমান রাজউক), গণপূর্ত অধিদফতর ও ন্যাশনাল হাউজিং কর্তৃপক্ষ এসব এলাকা গড়ে তোলে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বকীয়তা হারাচ্ছে এসব আবাসিক এলাকা। গড়ে উঠছে বাণিজ্যিকসহ বিভিন্ন স্থাপনা। আবার আবাসিক এলাকাগুলোর অর্ধেকের বেশি অবকাঠামোর বয়স ২০ বছরের বেশি। ফলে এগুলো ক্রমশ ব্যবহার-অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
রাজউকের সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। রাজধানী ঢাকা ও আশেপাশের এলাকার জন্য ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়নের অংশ হিসেবে এ সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ঢাকার আটটি আবাসিক এলাকার বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ঢাকার পরিকল্পিত আট আবাসিক এলাকায় মোট ভবন রয়েছে ৬০ হাজার ৬১৩টি। এর মধ্যে আবাসিকের সংখ্যা ৪২ হাজার ৬৫১। বাকি ১৭ হাজার ৯৬২ ভবন ব্যবহৃত হচ্ছে বাণিজ্যিক ও অন্যান্য কাজে, যা মোট ভবনের প্রায় ৩০ শতাংশ। এদিকে আট আবাসিক এলাকার মধ্যে ৩২ হাজার ১৩৭টি বা ৫৩ শতাংশ ভবনের বয়স ২০ বছর পেরিয়ে গেছে।
ঢাকার পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ধানমন্ডির। এলাকাটিতে দুই হাজার ৩০৫টি ভবন রয়েছে, যার মাত্র ৫৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ আবাসিক হিসেবে ব্যবহƒত হচ্ছে। আর বাণিজ্যিক ও মিশ্র অবকাঠামো রয়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। এলাকাটির ৬৫ শতাংশের বেশি ভবন গড়ে উঠেছে ২০ বছরেও বেশি আগে। আর ১১ থেকে ২০ বছর সময়ের মধ্যে গড়ে উঠেছে ২১ দশমিক ৯০ শতাংশ ভবন।
আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ও অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে ওঠায় এরপর রয়েছে মোহাম্মদপুর। এলাকাটির পাঁচ হাজার ৫১৬ ভবনের মধ্যে ৬৪ দশমিক ৫২ শতাংশ আবাসিক হিসেবে ব্যবহƒত হচ্ছে। আর বাণিজ্যিক ও মিশ্র কাজে ব্যবহƒত হচ্ছে ২৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এছাড়া মোহাম্মদপুরের ৬৬ শতাংশের বেশি ভবন গড়ে উঠেছে ২০ বছরেও বেশি আগে। আর ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী ভবন রয়েছে গড়ে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ।
এদিকে রাজধানী সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে স্বাধীনতার পর গড়ে তোলা হয় উত্তরা আবাসিক এলাকা। ঢাকার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত উত্তরা মডেল টাউনেও অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে ওঠার হার বাড়ছে। এলাকাটির ১০ হাজার ৫২৯ ভবনের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ আবাসিক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর বাণিজ্যিক ও মিশ্র কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ২২ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভবন। এদিক থেকে অনেকটা ভালো অবস্থায় রয়েছে উত্তরা ৪নং সেক্টর। এলাকাটির এক হাজার ৭০ ভবনের মধ্যে ৭৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ আবাসিক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর বাণিজ্যিক ও মিশ্র কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
উত্তরা মডেল টাউনের প্রায় ৫০ শতাংশ ভবন গড়ে উঠেছে ২০ বছরেরও বেশি আগে। ১১ থেকে ২০ বছর আগে গড়ে উঠেছে ২১ দশমিক ৩৯ শতাংশ ভবন। আর ২৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ ১০ বছর বা তার চেয়েও কম সময় আগে নির্মাণ করা হয়েছে। উত্তরা ৪নং সেক্টরের ভবনগুলো এক্ষেত্রে অনেকটা ভালো অবস্থানে রয়েছে। এলাকাটির ৭২ শতাংশ ভবনের বয়স ১০ বছর বা তার চেয়েও কম। আর ২৭ শতাংশের বয়স ১১ থেকে ২০ বছর।
এর বাইরে বনশ্রী এলাকাটিতে ভবন রয়েছে এক হাজার ৪৫৫টি। এর মধ্যে ৬৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ আবাসিক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর বাণিজ্যিক ও মিশ্র কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ২৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। তবে বনশ্রীর বেশিরভাগ ভবনই তুলনামূলক নতুন। এলাকাটির ৭৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভবনের বয়স ১০ বছর বা তার চেয়ে কম। বাকি ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশের বয়স ১১ থেকে ২০ বছর।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক বা অন্যান্য ভবন তুলনামূলক কম গড়ে উঠেছে মিরপুর, গুলশান ও বনানীতে। এ তিন এলাকায় ভবন রয়েছে যথাক্রমে ৩৫ হাজার ৪৫৭, দুই হাজার ৪৮৯ ও এক হাজার ৭৯২টি। এর মধ্যে মিরপুরের ৭৩ দশমিক ৫৬, গুলশানের ৭২ দশমিক ৩৬ ও বনানীর ৭১ দশমিক ৭১ শতাংশ ভবন আবাসিক। আর বাণিজ্যিক ও মিশ্র ভবন রয়েছে যথাক্রমে ১৯ দশমিক ২০, ১২ দশমিক ৮৫ ও ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
এদিকে মিরপুরের ৬১ শতাংশ ভবন গড়ে উঠেছে ২০ বছরেরও বেশি আগে। আর ১০ বছর বা তারচেয়ে কম সময় আগে গড়ে উঠেছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ ভবন। অপরদিকে গুলশানের ৭৪ দশমিক ২১ শতাংশ ভবন গড়ে উঠেছে ১০ বছর বা তারচেয়ে কম সময় আগে। আর ২৫ দশমিক ১১ শতাংশ ভবনের বয়স ১১ থেকে ২০ বছর। এ-ছাড়া বনানীর ৫৮ দশমিক ১৫ শতাংশ ভবন গড়ে উঠেছে ১০ বছর বা তারচেয়ে কম সময় আগে। আর এলাকাটির ৪১ দশমিক ২৯ শতাংশ ভবনের বয়স ১১ থেকে ২০ বছর।
জানতে চাইলে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ঢাকা ও আশেপাশের এলাকার পরিকল্পিত উন্নয়নে ২০১০ সালে ‘ড্যাপ’ প্রণয়ন করা হয়। তবে এ নিয়ে পরবর্তীকালে বিভিন্ন অভিযোগ আসতে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ড্যাপ রিভিউ করা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকা ও আশেপাশের এলাকাকে দুই অংশে ভাগ করে বিশদ সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। এতে ঢাকার পরিকল্পিত আটটি আবাসিক এলাকার এ চিত্র উঠে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, ২০১৬ থেকে ২০৩৫ সালের জন্য নতুন করে ড্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে। এতে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ও মিশ্র অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামোগুলোর মধ্যেও যেগুলোর বাণিজ্যিক অনুমোদন নেই, সেগুলোতে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে রাজউক।
উল্লেখ্য, ড্যাপ পর্যালোচনার অংশ হিসেবে ঢাকা ও আশেপাশের এলাকাকে সমান দুই অংশে ভাগ করে সমীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়েছে। এর একটি অংশের জন্য বেসরকারি কোম্পানি শেলটেক ও দ্য ডিকোড লিমিটেড এবং অপর অংশের জন্য ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালটেন্টস (ডিডিসি) লিমিটেডকে নিয়োগ দিয়েছে রাজউক।

মন্তব্য