আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
আবাসন সংকটে কর্মজীবী নারী

কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে রাজধানীতে কর্মজীবী নারীদের আবাসন সংকটও প্রকট আকার ধারণ করছে। ফলে কাজের জন্য ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত নারীদের ভোগান্তি বাড়ছে। সরকারিভাবে নারীদের নিরাপদ আবাসনের জন্য ঢাকায় আছে মাত্র তিনটি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল। কিন্তু চাহিদার তুলনায় এসব হোস্টেলে সিটসংখ্যা সীমিত। বিশেষ করে নীলক্ষেত ও মিরপুরের কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে দুটি সিটের বিপরীতে বরাদ্দের জন্য আবেদনপত্র পড়েছে যথাক্রমে ৭০ থেকে ৮০টি এবং ১৫টি। সিট পেতে এসব হোস্টেলে নারীদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এমনকি সিট পেতে অনেকেই ওপর মহলে লবিং করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। খিলগাঁও কর্মজীবী হোস্টেল ছাড়া অন্য দুটি হোস্টেলের বোর্ডাররা জানান, হোস্টেলের খাবারের মান অত্যন্ত খারাপ। রাজধানীতে আসা কর্মজীবী নারীরা এও জানিয়েছেন, নগরীর বেসরকারি হোস্টেলগুলোয় অতিরিক্ত ভাড়া আর সেখানে পরিবেশও ভালো নয়। বর্তমানে কর্মজীবী নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অধিক হারে সম্পৃক্ত করতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল কর্মসূচির মাধ্যমে ঢাকায় নিরাপদ আবাসন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি এই হোস্টেলগুলো হচ্ছে— কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল নীলক্ষেত, মিরপুর-১-এ নওয়াব ফয়জুন্নেছা কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল এবং খিলগাঁওয়ে বেগম রোকেয়া কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল। মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, সরকরিভাবে সারা দেশে কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের সংখ্যা সাতটি। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও যশোরে একটি করে কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল পরিচালিত হচ্ছে। এই সাতটি হোস্টেলে মোট সিটসংখ্যা ১ হাজার ৪০৬টি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২ হাজার ৮৯ জন নারী এসব হোস্টেল থেকে সুবিধা ভোগ করেন। কিন্তু দেশের মোট কর্মক্ষম নারীর তুলনায় কর্মজীবী হোস্টেলের সিট অত্যন্ত কম। সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হোস্টেলে সিট খালি থাকা সাপেক্ষে কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের অফিস থেকে অফিস সময়ে সিট প্রাপ্তির আবেদন ফরম সংগ্রহ করে তা জমা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বোর্ডারদের বয়স আঠারোর নিচে এবং ঊনষাটের ঊর্ধ্বে হওয়া যাবে না। এসব হোস্টেলে থাকা পুরনো বোর্ডাররা জানান, হোস্টেলে থাকার মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় তাদের অনেকেই এখন আতঙ্কে আছেন। কারণ মেয়াদ শেষে একজন বোর্ডার দ্বিতীয়বার সেখানে থাকার সুযোগ পান না। কিন্তু নীলক্ষেতে অনেক পুরনো বোর্ডারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা সিট খালি করছেন না। ফলে নতুন বোর্ডাররাও স্থান পাচ্ছেন না। ঢাকায় কাজ করতে এসে আবাসন সংকটে ভুগছেন এমন কয়েকজন কর্মজীবী নারী বলেন, সরকারি হোস্টেলগুলোতে সহজে সিট পাওয়া যায় না। সিট পেতে হলে লবিং লাগে।

নীলক্ষেতের কর্মজীবী হোস্টেলের কয়েকজন বোর্ডার জানান, এই হোস্টেলের খাবার মানসম্পন্ন নয়। এ খাবারে তাদের প্রায়ই পেটের পীড়ায় ভুগতে হয়। এ ছাড়া এই হোস্টেলে টয়লেটগুলো অধিকাংশ সময়ই অপরিষ্কার থাকে। এই হোস্টেলে বোর্ডারদের অভিযোগের জন্য একটি অভিযোগ খাতা থাকলেও কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয় না। এই হোস্টেলের আসনসংখ্যা ৫১৬টি। অতিথিদের জন্য আছে ১৩টি সিট। নীলক্ষেত কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের সুপার সাবেকুন নাহার বলেন, ‘আমাদের হোস্টেলে বর্তমানে সিট স্বল্পতা আছে। সিট খালি আছে মাত্র দুটি। কিন্তু এর বিপরীতে এখানে ৭০ থেকে ৮০টি দরখাস্ত জমা পড়েছে। আমরা সিট বরাদ্দ দেওয়ার জন্য নিয়মিত মিটিংয়ে বসছি। যেহেতু মাত্র দুটি সিট খালি এ জন্য সিটপ্রত্যাশী অনেকেই সিট পেতে ওপর মহলে তদবির করতে পারেন বলে ধারণা করছি। আবার পুরনো বোর্ডারদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যারা এখনো সিট ছাড়ছেন না। সিট খালি করে দেওয়ার জন্য তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। মেয়ে বলে তাদের হুট করে তুলে দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।’ এ ব্যাপারে মহিলাবিষয়ক অধিদফতর কর্তৃপক্ষ পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে হোস্টেল সুপার জানান। খাবারের মান প্রসঙ্গে সাবেকুন নাহার বলেন, ‘এখানে ভাত ১২ টাকা এবং মুরগি ২২ ও মাছ ১৮ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এত সস্তায় ঢাকার অন্য কোথাও খাবার পাওয়া যায় না। এ জন্য খাবারের মান হয়তো বোর্ডারদের আশানুরূপ হচ্ছে না।’ মিরপুরের টোলারবাগে স্থাপিত নবাব ফয়জুন্নেসা কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের কয়েকজন কর্মজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডাইনিংয়ের খাবারের মান অত্যন্ত খারাপ। এই খাবারে বোর্ডারদের প্রায়ই পেট খারাপ, গ্যাস্ট্রিকসহ বিভিন্ন শারীরিক অসুবিধায় পড়তে হয়। সংশ্লিষ্ট কারণে এখানকার বেশিরভাগ বোর্ডারই নিজ উদ্যোগে রান্না সারেন। তারা জানান, নিয়মিত পরিষ্কার না করায় হোস্টেলের টয়লেট ও বাথরুমগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। এ ছাড়া হোস্টেলের দারোয়ান প্রবেশ গেটে সব সময় দায়িত্ব পালন করেন না বলেও তারা অভিযোগ করেন। এই হোস্টেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছামিনা হাফিজ বলেন, ‘আমাদের এখানে বর্তমানে মাত্র দুটি সিট খালি আছে। কিন্তু গত মাসে ও চলতি মাসে মোট ১৫টি সিটের জন্য আবেদনপত্র জমা পড়েছে। সিট স্বল্পতা সমাধানের জন্য বর্তমানে তিনতলা হোস্টেলটি ১০ তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এতে নতুন করে মোট ৭০০ সিট যুক্ত হবে। হোস্টেলের খাবারের নিম্নমান প্রসঙ্গে হোস্টেল সুপার বলেন, যারা এখন ক্যান্টিনের কাজ করছে, তারা বাজারের টাকা নিয়ে অনিয়ম করে। এতে মাঝে মধ্যে খাবারের মান কিছুটা খারাপ হয়। এখানকার কয়েকজন বোর্ডার নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকায় আমাদের বাসা নেই। নেই কোনো আত্মীয়। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই এই হোস্টেলে থাকছি।’ এই হোস্টেলে সিটসংখ্যা ১৫৪টি। আর অতিথিদের জন্য আছে ছয়টি সিট। কিন্তু সিটের বিপরীতে এখানে চাহিদা অনেক। জানা যায়, প্রতি মাসে এই হোস্টেলে গড়ে ১০টি নতুন সিটের আবেদন জমা পড়ে। খিলগাঁওয়ের বেগম রোকেয়া কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলেরও কমবেশি কিছু সমস্যা আছে। এখানকার বোর্ডাররাও টয়লেট ও হোস্টেলের অপরিচ্ছন্নতার অভিযোগ তুলেছেন। এখানে আছে ২০০টি আসন। আর অতিথিদের জন্য আরও ১০টি আসন রয়েছে। তবে তুলনামূলক বাকি দুটোর চেয়ে এই হোস্টেলটি ভালো। এখানে সিট পাওয়ার ক্ষেত্রে বোর্ডারদের এক মাস আগেই আবেদন করতে হয়। এখানকার প্রতি কক্ষে চারটি বেড আছে। এই হোস্টেলটির বোর্ডারদের দীর্ঘদিন ধরে একটি সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে। হোস্টেলের পাশে অবস্থিত ‘চায়না পার্ক’ নামের একটি বাড়ির সুয়ারেজ লাইন ইচ্ছাকৃতভাবে ফুটো করে দেওয়ায় সেখানকার ময়লা হোস্টেলের সুয়ারেজ লাইনে ঢুকে পড়ছে। এতে প্রায়ই হোস্টেলটির সুয়ারেজ লাইন জ্যাম হয়ে যাচ্ছে। দুর্গন্ধে বোর্ডারদের ভোগান্তি হচ্ছে। এই হোস্টেলের সুপার রাহেনুর বেগম বলেন, ‘এখানে মেয়েদের সিট প্রাপ্তি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। যোগ্য বোর্ডার হলে যাচাই-বাছাই করে আমরা সিট দিই। পাশের বাড়ির সুয়ারেজ সমস্যা নিয়ে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’ বিডিপ্রতিদিন

মন্তব্য