আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
ঘোষণা
আবাসন সম্পর্কিত যেকোনো নিউজ পাঠাতে পারেন আমাদের এই মেইলে- abasonbarta2016@gmail.com
রড সিমেন্টের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে স্থবির উন্নয়ন কর্মকাণ্ড

রড-সিমেন্টের দাম না কমায় চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের অবকাঠামোখাত। গত কয়েক মাস ধরে নির্মাণ সামগ্রীর প্রধান উপকরণ রড ও সিমেন্টের দাম বেড়েছে লাগামহীনভাবে। এক মাসের ব্যবধানে প্রতি টন রডের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা। অন্যদিকে প্রতি বস্তা সিমেন্টে বেড়েছে ৭০ থেকে ৯০ টাকা। ফলে আবাসন ও নির্মাণ খাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। দেশের বড় বড় সরকারী অবকাঠামোখাতেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণে চলমান প্রকল্পগুলোর জন্য আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়ার দাবি করা হচ্ছে। আর আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, রড ও সিমেন্টের দাম না কমলে তাদের বিনিয়োগ নতুন সঙ্কটে পড়বে। এ অবস্থায় নির্মাণ শিল্পের কর্মকা- স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত রড ও সিমেন্টের দাম আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নির্মাণ খাতের অবদান প্রায় ১৫ শতাংশ। সরকারের রাজস্ব আয়, কর্মসংস্থান, রড, সিমেন্ট, টাইলসসহ ২৬৯ প্রকার সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রসারের মাধ্যমে সমগ্র নির্মাণ খাত জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয় নির্মাণ সামগ্রী কেনাকাটার জন্য। এ অবস্থায় রড ও সিমেন্টের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারী-বেসরকারীখাতের উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থবছরের শেষ সময় অর্থাৎ মার্চ-জুন সময়ে সরকারী প্রকল্পগুলোর দ্রুত শেষ করে আনার তাগিদ রয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এ কারণে হঠাৎ নির্মাণ সামগ্রীর ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়ন কাজে স্থবিরতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এছাড়া, বাংলাদেশের আবাসন শিল্প শুধু আবাসনের সঙ্কট দূর করছে না। একই সঙ্গে ৩৫ লাখ শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল দুই কোটি লোকের অন্নের যোগান দিয়েছে। আবাসনখাত নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করছে। রড-সিমেন্টের মূল্য বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক বলছে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট এ্যান্ড হাউজিং এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের নেতারা বলেন, হঠাৎ করে নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক আবাসন ব্যবসায়ী নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিতে চাইছেন। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। দুর্ভোগে পড়বেন ক্রেতারা। বড় ক্ষতির মুখে পড়বে আবাসন খাত। তারা বলেন, বর্তমানে সিমেন্টের ওপর কোন ধরনের কর আরোপ করা হয়নি। কিন্তু তারপরও সিমেন্টের দাম বাড়ানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, রড-সিমেন্টের দাম আগের অবস্থায় না ফিরলে ফ্ল্যাটের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, রড ও সিমেন্টের দাম বাড়লে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় বেড়ে যায়। ক্রেতাদের কাছে বেশি দাম চাওয়া যাচ্ছে না। রিহ্যাবের প্রথম সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, কোন রকম যুক্তি ছাড়াই রড-সিমেন্টের দাম বেড়েছে। গত চার-পাঁচ বছরে ফ্ল্যাটের দাম ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সংশোধন হয়েছে। ক্রেতাদের ধারণা ছিল হয়ত দাম আরও কমবে। কিন্তু রড ও সিমেন্টের দাম না কমলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফ্ল্যাটের দাম আর না কমার সম্ভাবনাই বেশি। বরং নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ায় কোন কোন প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে।

এদিকে, এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ইন্ডিভিজুয়াল হোম বিল্ডার্স (আইএইচবি) অর্থাৎ যারা নিজেরা বাড়ি নির্মাণ করেন তারাই সিমেন্টের সবচেয়ে বড় গ্রাহক। প্রায় ৬০ শতাংশ সিমেন্ট যায় এই খাতে। ফলে দাম বাড়ার কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে সাধারণ মানুষ। সম্প্র্রতি রাজধানীতে কোম্পানিভেদে ৬০ গ্রেডের প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে ৬৮ হাজার ৫শ’ থেকে ৭২ হাজার টাকা। এছাড়া ৪০ গ্রেডের রড প্রতি টন ৬০ হাজার থেকে ৬২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। অন্যদিকে প্রতি বস্তা সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৯০ টাকা। ঢাকার বাইরে দাম আরও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। অথচ মাত্র এক মাস আগে ৬০ গ্রেডের প্রতি টন রডের দাম ছিল ৫৮ থেকে ৬০ হাজার টাকা। অন্যদিকে প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম ছিল ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকা। তবে সরকারী সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবি’র তথ্যমতে, বর্তমান বর্তমান ৬০ গ্রেডের এমএস প্রতিটন রড ৬৬-৬৮ হাজার টাকা এবং ৪০ গ্রেডের প্রতিটন এমএস রড ৫৭-৫৯ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর এক বছর আগে ৬০ গ্রেডের রড ৫২ হাজার থেকে ৫৩ হাজার এবং ৪০ গ্রেডের রডের বিক্রি হয়েছে ৪২ থেকে ৪৩ হাজার টাকায়। তার মানে এক বছরের ব্যবধানে প্রতি টন রডের দাম প্রায় ২৭-৩০ শতাংশ বেড়েছে।

মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে রড-সিমেন্টের দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গতবছর থেকেই অস্থিও দেশের রডের বাজার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম থেকে রড আনতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং বাজারে রডের কাঁচামাল বিলেট ও স্ক্রাপের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই পণ্যটির দাম বাড়ছে। তবে সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, হঠাৎ করে এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের পরিকল্পিত কারসাজি। এতে আবাসন খাতে ব্যয় বাড়বে- যার ভার বহন করতে হবে ক্রেতাদের। দেশের বাজারে রড ও ইস্পাত সামগ্রীর দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ নির্মাণ শিল্প সমিতি (বিএসিআই)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে সম্প্র্রতি জানানো হয়, প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বৃদ্ধির ফলে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিএসিআইর সভাপতি প্রকৌশলী মুনীর উদ্দিন আহমেদ জানান, হঠাৎ করে অবকাঠামো উন্নয়নের মূল উপাদান এসএস রডের অস্বাভাবিক দাম বাড়ানো হয়েছে। আগের বেশি দাম এখন আর দাম কমছে না। এ কারণে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের গতি মন্থর হয়ে যাচ্ছে।

বিএসিআইর মতে, এখন দেশেই বেশিরভাগ বিলেট তৈরি করা হয়। বিলেটের কাঁচামালের দাম ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে কিছুটা বেশি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এই বৃদ্ধির পরিমাণ ৩ শতাংশ, কিন্তু হঠাৎ করে দেশের বাজারে রডের দাম ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করা অযৌক্তিক এবং অনৈতিক। রড উৎপাদনকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের কারণে কয়েক দফায় দাম আগেও বাড়ানো হয়েছে। এসব সিন্ডিকেট সুপরিকল্পিতভাবে দাম বৃদ্ধি করেছে। এক্ষেত্রে রডের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে আনার জন্য সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে সংগঠনটি। তবে দাম বাড়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং এ্যান্ড স্টিল মিলস এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মানোয়ার হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দেরি হওয়ায় জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে রডের মূল কাঁচামাল স্ক্র্যাপ লোহা আমদানির খরচ বেড়ে গেছে। তবে রড ও সিমেন্টের সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, এ দুটি পণ্যের বেড়ে যাওয়া দাম আর না কমলে দেশের সরকারী-সেরকারীখাতের অবকাঠামোখাতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে যেতে পারে। জনকণ্ঠ

মন্তব্য