আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
অর্থের উৎস না খোঁজা ও রেজিস্ট্রেশন ফি অর্ধেক করার দাবি

ঢাকা শহরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ কমাতে রাজধানীর বাইরে আবাসনশিল্পকে উৎসাহিত করতে মহানগর এলাকায় পাঁচ বছর এবং অন্যান্য পৌর এলাকায় ১০ বছর ‘ট্যাক্স হলিডে’ ব্যবস্থা প্রচলনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশন (বিএলডিএ)। আসন্ন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে গতকাল রবিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনাকালে বিএলডিএর পক্ষে এ প্রস্তাব তুলে ধরেন মাগুরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন।

বিএলডিএর মহাসচিব মহীউদ্দীন বলেন, আবাসন শিল্প খাত দেশের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনৈতিক আয়ের খাত। জাতীয় উন্নয়নে এ খাতের অবদান ২১ শতাংশ। মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার বাসস্থানের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন শিল্পের ব্যবসায়ীরা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। আবাসনশিল্পের ২৬৯টি উপখাতে কমপক্ষে ১২ হাজার শিল্প-কারখানা চালু আছে এবং এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এ খাতের সঙ্গে দেশের আড়াই লাখ মানুষের রুজিরোজগার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশই অত্যন্ত নিম্ন আয়ের লোক।

আবাসন খাতের এ সংগঠন থেকে অর্থ আইন ২০১৩-এর মাধ্যমে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ধারা ১৯বি পুনঃপ্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ধারার বিধান অনুযায়ী একজন করদাতা যদি আবাসিক প্রয়োজনে বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় বা নির্মাণে বিনিয়োগ করেন এবং সংশ্লিষ্ট বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টের পরিমাপের ওপর নির্দিষ্ট হারে কর প্রদান করেন, তাহলে কর বিভাগ বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থা বা এজেন্সি আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। কমপক্ষে ১০ বছরের জন্য এ আইন কার্যকর করার সুপারিশ করেছে বিএলডিএ।

এ ছাড়া সেকেন্ডারি মার্কেটে জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রির নিবন্ধন ফি ৭ শতাংশের পরিবর্তে ৩.৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করেন মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন। প্রস্তাবে বলা হয়, যেসব জমি বা ফ্ল্যাট প্রথম বিক্রির পর পাঁচ বছরের মধ্যে পুনরায় বিক্রি হবে, শুধু সেসব জমি বা ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ৩.৫ শতাংশ হারে বিক্রির জন্য সেকেন্ডারি মার্কেট চালু করা আবশ্যক।

এ বিষয়ে এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর বিষয়ে আমরা ভূমি মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে একটি চিঠি পাঠাতে পারি।’

আবাসন খাতে বিনিয়োগের ওপর নানা ধরনের মূল্য সংযোগ কর (মূসক) ও অন্যান্য করের অব্যবস্থাপনার কারণে অর্থপাচার হচ্ছে উল্লেখ করে বিএলডিএ নেতা মহীউদ্দীন বলেন, ‘দেশের বাইরে গিয়ে অনেকেই এখন খুব সহজে বাড়ি করতে পারছে। ওই দেশগুলো এই অর্থের উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে না। কিন্তু আমাদের দেশে জমি কেনা বা ফ্ল্যাট কিনতে কেউ যদি ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন করে, তাহলেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাকে ডেকে বসছে। এ কারণে অনেকে ভয় পেয়ে দেশে অপ্রদর্শিত অর্থ দিয়ে বাড়ি করতে পারছে না। ওই অর্থ বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।’

আবাসনশিল্প রক্ষায় ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব জানিয়ে বলা হয়েছে, এ তহবিল থেকে ক্রেতাসাধারণকে চাহিদামতো জমি বা প্লট কিনতে সর্বনিম্ন সুদে ঋণ প্রদান করা প্রয়োজন। আবাসন খাতে অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ঋণ সরবরাহ করা যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রস্তাবে উল্লেখ আছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) আওতাধীন এবং আওতাবহির্ভূত এলাকায় জমির ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৪ ও ৩ শতাংশ হারে কর নির্ধারণের ফলে ক্রেতাদেরও ব্যয় বেড়েছে। এই কর কমিয়ে যথাক্রমে ২ ও ১ শতাংশ নির্ধারণের দাবি করা হয়। গেইন ট্যাক্স ২ শতাংশ, স্ট্যাম্প ফি ১.৫ শতাংশ, নিবন্ধন ফি ১ শতাংশ, স্থানীয় সরকার কর ১ শতাংশ, মূসক ১.৫ শতাংশ—এভাবে মোট নিবন্ধন ফি ও কর ৭ শতাংশ নির্ধারণ প্রয়োজন বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

বিএলডিএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা ও জটিলতার কারণে সার্বিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ আবাসনশিল্প খাতটি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সরকারের নীতি সহায়তার অপ্রতুলতা—যেমন মাত্রাতিরিক্ত রেজিস্ট্রেশন-সংশ্লিষ্ট ফি ও করহার, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার, তারল্য সংকট এবং আয়কর আইনের কিছু ধারা এ শিল্পের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে এ খাতে বিনিয়োগকারীরা তাদের কষ্টার্জিত টাকা দেশে বিনিয়োগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ সেকেন্ড হোম, বিজনেস মাইগ্রেশনসহ অন্যান্য সহজ শর্তে বিনিয়োগের আওতায় বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের আবাসনশিল্প খাত রক্ষার্থে আসন্ন জাতীয় বাজেটে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এতে স্থবির আবাসনশিল্পে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিএলডিএর প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

প্রাক-বাজেট ওই আলোচনায় একই সঙ্গে এসএমই ফাউন্ডেশন, অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা), বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ), বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ লুব ব্লেন্ডার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা তাঁদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বসুন্ধরা গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান, এনবিআরের সদস্য (শুল্কনীতি ও বাজেট) মো. ফিরোজ শাহ আলম, মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে সামসুদ্দিন খান প্রমুখ। কালের কণ্ঠ

মন্তব্য