আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে হুমকিতে বসবাস

ঝড় উঠলেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। জোরে বাতাসে কেঁপে ওঠে দালান। ফাটল দিয়ে পানি এসে ঘর ভেসে যায়। ঝড়-বৃষ্টির প্রতিটা দিন বিভীষিকার মধ্য দিয়ে যায় আমাদের। শুধু সাধন চন্দ্র দাসই নন, পুরান ঢাকার তিন শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ির বাসিন্দা প্রতিনিয়ত জীবনহানির হুমকি নিয়ে বসবাস করছেন এসব ভবনে। এই ভবনগুলো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করায় সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের অনুমতি নিয়ে তৈরি হয়েছে টানাপড়েন। ফাইল জটিলতায় পলেস্তারা খসে রড ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া ছাদের নিচে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন বাসিন্দারা। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, শাঁখারীবাজারের ভবনগুলোসহ যেসব ভবন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করা হয়েছে, এসব ভাঙার ব্যাপারে নিষেধ আছে। তবে যেসব ভবন মেরামতের জন্য নগর উন্নয়ন কমিটি থেকে অনুমতি দেওয়া হবে, শুধু সেসব ভবনই মেরামত করা যাবে। এদিকে অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, বার বার নগর উন্নয়ন কমিটির অফিসে যোগাযোগ করা হলেও মেলে না ভবন মেরামতের অনুমতি। জানা যায়, ২০০৪ সালের ৯ জুলাই শাঁখারীবাজার এলাকায় একটি একতলা ভবন ধসে ১৯ জন নিহত হন। তখন বুয়েটের একটি প্রতিনিধি দল পুরান ঢাকা পরিদর্শন শেষে লালবাগ, শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারকে বিপদাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। তারা শতাধিক ভবন ভেঙে ফেলার পরামর্শ দেন; কিন্তু ১৩ বছর পরও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ মানুষ মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সেখানে বসবাস করছে। যেখানে নতুন ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে পুরনো ভবনের কথা বলাই বাহুল্য। ফলে যে কোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, ওয়ারী, বাংলাবাজার, শাঁখারীবাজার, আহসান উল্লাহ রোড, তাঁতীবাজার, রায়সাহেব বাজার, কুলুটোলা, কাগজিটোলা, টিপু সুলতান রোড, নারিন্দা, নবাবগঞ্জ রোড, লালবাগ, চকবাজার, সাতরওজা, হাজারীবাগ, বংশাল, কোতোয়ালি, শ্যামপুর, কামরাঙ্গীর চর, কদমতলী এমনকি বাবুবাজার পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনগুলোয় জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে বসবাস করছেন কয়েক লাখ মানুষ। তবে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এসব ভবনের বয়স ২০০ থেকে ২৫০ বছর! আরও বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারকাজ চালানোর দায়িত্ব যে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের, খোদ রাজধানীতে তাদের ভবনগুলোই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দেখা গেছে, এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অফিস ভবন, করপোরেশনের ব্যবহূত আঞ্চলিক কার্যালয়, বিভিন্ন মার্কেট, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়ি বা বাণিজ্যিক ভবন, সমাজকল্যাণ কেন্দ্র, শরীরচর্চা কেন্দ্র, রাজস্ব অফিস, স্টাফ কোয়ার্টার, রাস্তাসংলগ্ন বাজার, হকার্স মার্কেট, বিভিন্ন এলাকার সরকারি কলোনি, নাট্যমঞ্চ, জবাইখানা, কলেজের লাইব্রেরি ও একাডেমিক ভবন, কাঁচাবাজার, পাবলিক লাইব্রেরি, ব্যায়ামাগার, পাবলিক টয়লেট, দাতব্য চিকিৎসালয় হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। রাজউক সূত্র জানায়, রাজধানীর পুরান ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ৩২১টি। আর পাঁচ হাজার ভবন নির্মাণ বিধিমালার নিয়ম অমান্য করায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৪৫টি তাত্ক্ষণিক ভেঙে ফেলার সুপারিশ রয়েছে। এর মধ্যে ২১টি হাজারীবাগে, ৭৩টি লালবাগে ও ৯৩টি শাঁখারীবাজারে। কিন্তু এ বিষয়ে নেই কোনো উদ্যোগ। এ ব্যাপারে ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান মো. আজিম বকস বলেন, বেশ কিছু সরকারি ভবন রয়েছে যেগুলো কিছুটা সংস্কার করলেই ঝুঁকিমুক্ত হবে। কিন্তু সরকারের নিজের সম্পদের দিকেই কোনো লক্ষ্য নেই। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর সংরক্ষণ ও সংস্কার বিষয়ে সঠিক সমাধান দিতে পারে। কিন্তু আমরা কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ বা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দেখছি না।

মন্তব্য