আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
পূর্বাচল উপশহরে নকশা ছাড়াই এত ভবন!

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) হিসাবে গত ৮ মে পর্যন্ত পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পে তিনটি প্লটে নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। আর একটিতে চলছে পাইলিং। তবে পূর্বাচলে গেলে শত শত ভবন দেখা যায়। এর মধ্যে একতলা ভবনই বেশি। ডুপ্লেক্স, দোতলা, তিনতলা ভবনও রয়েছে। এগুলো হলো কীভাবে? অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ভবন অনুমোদনহীন। নকশা অনুমোদন ছাড়াই তৈরি হয়েছে এগুলো। যেমন খুশি তেমন করে ভবন বানানোর ধুম পড়েছে পূর্বাচলে। ফলে পূর্বাচলকে পরিকল্পিত উন্নত উপশহর হিসেবে গড়ে তোলার সরকারি পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ডেইরি ফার্ম, গোডাউন, আবাসন, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহূত হচ্ছে অনুমোদনহীন ভবনগুলো। এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে রাজউক কয়েকবার অভিযান চালালেও তা কোনো কাজে আসেনি। অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, এ রকম হলে স্বপ্নের পূর্বাচল আর হবে না। বড়জোর উত্তরার মতো অপরিকল্পিত একটি মিশ্র এলাকা হতে পারে।

অবশ্য এই উদ্বেগ আমল করছেন না রাজউক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান। তিনি বলেন, পূর্বাচল হবে একটি আইকন উপশহর। দু-একটা ঘরবাড়ি কেউ বানালেও তা কোনোভাবেই রাখা হবে না। বর্তমানে দু-একজন অস্থায়ীভাবে একতলা বা টিনশেড বানাচ্ছে। এগুলোও ভেঙে দেওয়া হবে। পূর্বাচলের ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়। এটা শতভাগ নিশ্চিত, নকশা ছাড়া পূর্বাচলে একটা স্থাপনাও থাকতে পারবে না।

পূর্বাচল এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজউকের পরিচালক অলিউর রহমান অনুমোদনহীন ভবনের বিষয়ে একই কথা বললেন। জানতে চাইলে  তিনি বলেন, এর আগে একবার অভিযান চালিয়ে কয়েকটি অনুমোদনহীন ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আবারও একটি ফাইল প্রসেস হয়েছে। শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।

পূর্বাচল এলাকার অথরাইজড অফিসার মো. আদিলুজ্জামান জানান, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৮টি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দু-তিনজন ছাড়া কেউ বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেনি। আর ১০টি আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অন্য যা আছে সবই অবৈধ।

রাজউকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যে তিনটি প্লটে বৈধ নকশায় বাড়ি তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে ১ নম্বর সেক্টরের ৩০১ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর প্লট। এটির মালিক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা। তিনিও নকশা অনুমোদনের আগেই তিনতলা বাড়ির কাজ শুরু করেছিলেন। পরে নকশা অনুমোদন করিয়ে নেন। ১৩ নম্বর সেক্টরের ৪০৫ নম্বর রোডের ১১ নম্বর প্লটে ছয়তলার নকশা অনুমোদন করিয়েছেন মালিক আবদুল খালেক। এরই মধ্যে তিনতলা পর্যন্ত উঠেছে। ৪ নম্বর সেক্টরের ৩০৫/১ নম্বর রোডের ২ নম্বর প্লটে সাততলার নকশা অনুমোদন করিয়ে কাজ শুরু করেছেন মালিক আবদুর রউফ। এ ছাড়া পূর্বাচলে কোনো অবকাঠামো থাকার কথা নয়। কিন্তু সরজমিন ১৩ নম্বর সেক্টরের ৪০৮ নম্বর রোডের ৪ নম্বর প্লটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তিনতলা একটি আধুনিক বাড়ি। বাড়ির সামনে মজবুত স্টিলের ফটক। ভেতরে কৃষ্ণচূড়া ফুলের গাছটি বাড়ির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘নূরজাহান’স প্যারাডাইস’। স্থানীয়রা বাড়ির মালিকের নাম জানাতে পারেননি। তারা জানান, একজন নিরাপত্তাকর্মী বর্তমানে দেখভাল করে। তবে সরেজমিনে ওই নিরাপত্তাকর্মীকে পাওয়া যায়নি।

১৩ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর রোডের ৬৫ নম্বর প্লটে দেখা যায় আরেকটি তিনতলা বাড়ি। এটি তৈরি করেছেন আবদুছ ছোবহান। তার স্ত্রী পরিচয় দিয়ে একজন বয়স্ক নারী জানান, নকশার অনুমোদন আছে কি-না, তা তিনি জানেন না। তবে রাজউকের সঙ্গে মামলা চলছে। আবদুস ছোবহানের ফোন নম্বর চাইলে তিনি দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

অদূরেই দেখা যায় আরেকটি তিনতলা বাড়ির ফটকের পাশে একটি সাইনবোর্ড টাঙানো। গাছের পাতার আড়ালে পড়ে যাওয়া সাইনবোর্ড থেকে যেটুকু পাঠোদ্ধার করা যায়, তাতে বোঝা গেল বাড়ির মালিক কুদরত আলীর সঙ্গে রাজউকের মামলা চলছে। সাইনবোর্ডে লেখা, ‘… সূত্রে বর্ণিত মোকদ্দমায় সহকারী জজ, রূপগঞ্জ আদালত, নারায়ণগঞ্জ বিবাদী পক্ষকে স্থিতাবস্থা রাখাসহ কারণ দর্শানোর নির্দেশ প্রদান করেছেন।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রভাবশালী প্লট মালিকরা নকশা ছাড়াই বহুতল ভবন তৈরি করেছেন। রাজউক সেগুলো ভাঙতে গেলে তারা আদালতের আশ্রয় নেন। ভেঙে দিলে তারা কোথায় থাকবেন- এমন বিবেচনায় আদালত উচ্ছেদে স্থগিতাদেশ দেন। এ রকম ১৫ জনের বিরুদ্ধে রাজউকের মামলা চলছে। ওইসব অনুমোদনহীন ভবনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না রাজউক।

এভাবেই ১৭ নম্বর সেক্টরের ৩০৩ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর প্লটে নকশা ছাড়াই আরেকটি চারতলা ভবন তৈরি করছেন জনৈক ফজু মিয়ার ছেলে রিপন মিয়া। রিপন মিয়া জানান, পাঁচ কাঠার প্লটে ছয়তলার ভবন তৈরি করছেন। নকশা পাস না হলেও অনুমোদনের জন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। এ জন্য তিনি আগেভাগেই কাজ শুরু করেছেন। এ ছাড়া পূর্বাচলের প্রকল্প পরিচালক এবং ওই এলাকার অথরাইজড অফিসারসহ অনেকেই তার পরিচিতি। ফলে নকশা পাসে কোনো সমস্যা হবে না।

অভিযোগ আছে, রাজউক নিয়ে সরকারের বিশেষ প্রত্যাশা থাকলেও রাজউক এ বিষয়ে নির্বিকার। অবশ্য এ প্রসঙ্গে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, পূর্বাচলের দেখভালের জন্য ৪/২ নামে একটি নতুন এলাকা করা হয়েছে। কিন্তু জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। মহাখালী অফিসের অথরাইজড অফিসার মো. আদিলুজ্জামান ও ইন্সপেক্টর জাহিদকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। তারা গুলশান-বনানীর সমস্যা দেখতেই হিমশিম খান। পূর্বাচলের তদারকি করবেন কীভাবে? পূর্বাচলের মতো একটি বড় এলাকার তদারকি করতে হলে আঞ্চলিক কার্যালয়ে পুরো জনবল থাকা প্রয়োজন। সেটা না থাকায় এমন অবস্থা হচ্ছে। এ বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে।

সম্প্রতি এ প্রতিবেদক সরজমিনে পাঁচটি সেক্টর পরিদর্শন করেন। এ সময় বিভিন্ন সেক্টরে অসংখ্য স্থাপনা পাওয়া যায়। টিনশেড ঘর, দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট, পার্ক, বাজার, বাসভবন প্রভৃতি, এগুলোর সবই অনুমোদনহীন। সমকাল

মন্তব্য