আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
মাটি পরীক্ষার পর ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেবে রাজউক

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি পরীক্ষা করে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সংস্থাটি বলছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকার মাটির গুণগত মান একই ধরনের নয়। কিছু স্থানে মাটির মান খুবই ভালো থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে এতই খারাপ যে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে যে কোনও সময় ওইসব এলাকার ভবন ভেঙে পড়তে পারে। এ কারণে ভবন নির্মাণের আগে মাটি পরীক্ষা করানো জরুরি।

নগরবাসীকে এ বিষয়ে সহায়তা দিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘আরবান রেজিলিয়েন্ট প্রকল্পে’র আওতায় ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ করতে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে রাজউক। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন,প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রাজধানী ঢাকা অনেকাংশে রক্ষা পাবে। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনাই হবে এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে রাজউক, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন। ২০২০ সালের জুন নাগাদ প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা। ২০১৫ সালের ২৫ জুন প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পের আওতায় রাজউক ঝুঁকি সংবেদনশীল ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। এর মাধ্যমে রাজধানীতে ভূমি জোনিং করে কোন এলাকায় সর্বোচ্চ কত তলা ভবন নির্মাণ করা যাবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। তাছাড়া ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত উপাদান ভূমিকম্প সহনশীল কিনা তাও পরীক্ষা করে দেখা হবে।

অন্যদিকে,ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন স্যাটেলাইট ও কন্ট্রোল অফিস নির্মাণসহ হুইল ড্রেজার, এক্সক্যাভেটর, ক্রেন ও মোবাইল জেনারেটরের মতো ভারী যন্ত্রপাতি কিনবে। আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এ-সংক্রান্ত ইনস্টিটিউট স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনবে। প্রকল্পের আওতায় এ তিন প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কিনা তা তদারক করবে পরিকল্পনা কমিশন।’

প্রকল্পের আওতায় রাজউক ৭টি ভিত্তির ওপরে কাজ করবে। বিষয়গুলো হচ্ছে- রাজধানীর বর্তমান ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনশীল কিনা সে জন্য সব ভবন অত্যাধুনিক যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করা,মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া,ভূমিকল্প ইউনিয়ন গঠন,ভবন নির্মাণে নকশার ব্যত্যয় রোধে ভবনের প্লান অনলাইনে দেওয়া,ভূমিকম্প বিষয়ে কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণে বাধ্য করা এবং ভবন নির্মাণ সংশ্লিষ্ট সব উপকরণ পরীক্ষার জন্য রিসার্স ট্রেনিং টেস্টিং ল্যাবলেটরি স্থাপন করা। এই বিষয়গুলো এগিয়ে নিয়ে এরই মধ্যে ৭টি বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়ার কাজ চলছে। আগামী জুনের মধ্যে পরামর্শক নিয়োগ চূড়ান্ত করা হবে। জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করা হবে।

বুয়েটের সঙ্গে যৌথভাবে সরকারের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি-সিডিএমপির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় সাড়ে সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়বে। যেখানে তৈরি হবে সাত কোটি টন কংক্রিটের স্তুপ। এতে ৫০ হাজার মানুষ নিহত ও দুই লাখ মানুষ আহত  হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ মাত্রার ভূমিকম্পে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫৭৩ কোটি ডলার বা ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সরকার এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ভবনের স্থায়ীত্ব তার মাটির ওপর অনেকটা নির্ভর করে। মাটির মান খারাপ হলেও বহুতল ভবন নির্মাণ করা যায়। সেক্ষেত্রে পাইলিংয়ের ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যেখানে মাটির গভীরে ৩০০ ফুট পাইলিং করা প্রয়োজন সেখানে ৪০ ফুট পাইলিং করা হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও অনেক কম করা হচ্ছে। বিশেষ করে আবাসন কোম্পানিগুলো এমন কাজ বেশি করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণ করা হচ্ছে না।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আব্দুল লতিফ হেলালী বলেন, ঢাকার সব এলাকার মাটি এক নয়। অনেক স্থানে নরম মাটি আবার আবার অনেক স্থানে শক্ত মাটি রয়েছে। দুই জায়গায় দুই ধরনের ভবন বানাতে হবে। বর্তমানে সব জায়গায় কম বেশি বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে। নরম মাটি এলাকায় যেসব ভবন নির্মাণ হয়েছে ভূমিকম্প হলে সেগুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে পড়বে। এ জন্য মাটি পরীক্ষা করে আমরা দেখবো কোন এলাকায় কী ধরনের ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া যাবে। পরীক্ষায় মাটির গভীরে ৩০০ ফুট পর্যন্ত অনুসন্ধান করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভূমিকম্প নিয়ে দেশে কোনও অফিস বা দফতর নেই। রাজউকই এই প্রথম ‘আরবান রেজিলিয়েন্ট ইউনিট’ গঠন করবে। যাতে পরবর্তীতে ভূমিকম্প নিয়ে কাজ করা যায়। তাছাড়া বর্তমানে যেসব ভবন রয়েছে সেগুলো অত্যাধুনিক যন্ত্র দিয়ে চেকিং করা হবে। এতে একটি ভবনে কয়টি রড বা কী পরিমাণ ম্যাটারিয়াল রয়েছে সব দেখা হবে। এরপর চিহ্নিত করে দেওয়া হবে ভবনটি ভূমিকম্প সহনশীল কিনা।’

এই কর্মকর্তা আরও জানান, বর্তমানে রাজউক থেকে বাড়ির প্ল্যান পাস করার পর হাতে হাতে দেওয়া হচ্ছে। ফলে একটি বাড়ির অনুমোদিত নকশা তার পাশের বাড়ির লোকজন দেখার সুযোগ থাকে না। এর সুযোগ নিয়ে ভবন নির্মাণের সময় অনেক বাড়ি মালিক ও সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করেন। এজন্য রাজউক প্রতিটি নকশা বা প্ল্যান অনুমোদন দিয়ে অনলাইনে দিয়ে দেবে যাতে সবাই দেখতে পারে। একই সঙ্গে বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করতে সংশ্লিষ্টদের বাধ্য করা হবে। এছাড়া কর্মশালার মাধ্যমে ভবন নির্মাণ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। এজন্য সাতটি আন্তর্জাতিক ফার্ম নিয়োগ করা হচ্ছে। জুনের পরে নিয়োগ প্রাপ্ত ফার্মগুলো কাজ শুরু করে দেবে।

বর্তমানে বাড়ি নির্মাণের সময় ভূপৃষ্ঠের মাটি পরীক্ষা করার জন্য বুয়েট ছাড়া আর কোনও প্রতিষ্ঠান নেই। কিন্তু বুয়েটে মাটি পরীক্ষা অনেক ব্যয়বহুল। সে জন্য বাড়ি মালিকরা ভবন নির্মাণের আগে যেসব প্রকৌশলীদের মাধ্যমে মাটি পরীক্ষা করান তারা সঠিক ফলাফল দিতে না পেরে নামকাওয়াস্তা একটা প্রতিবেদন দিয়ে দেন। এর ওপর ভিত্তি করেই বাড়ি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু রাজউকের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এই সুযোগ আর থাকবে না। প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা হবে রিসার্স ট্রেনিং টেস্টিং ল্যাবলেটরি। এই পরীক্ষাগার থেকে বাড়ি মালিককে মাটি পরীক্ষার ফলাফল সংগ্রহ করতে হবে।

রাজউকের প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান,মাটির মানকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়। এর ওপর ভিত্তি করেই তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অনেক নিচের মাটি সংগ্রহ করে গুণগত মান পরীক্ষা করেছেন। এতে প্রতিটি স্তরের মাটির ভূতাত্ত্বিক অবস্থা, ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, গঠন প্রকৃতি পর্যালোচনা করা হবে।

জানা গেছে, ২০১৫ সালে তৈরি করা বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরও ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মাটি নিয়ে জরিপ করেছে। ওই জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর ৬৫ শতাংশ এলাকার মাটির গুণগত মান বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য উপযুক্ত নয়। এসব এলাকার মাটির মান এতই নিম্নমানের যে, বহুতল ভবন নির্মাণ করলে সামান্য ভূমিকম্পে ভবন ভেঙে যেতে পারে। এমনকি দেবে যেতেও পারে। এরপরেও ওইসব এলাকায় একের পর এক বহুতল ভবন গড়ে উঠছে।

ওই পরীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার ৩৫ শতাংশ এলাকা ছাড়া বাকি এলাকার মাটির মান খুবই নিম্নমানের। সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন মাটি রয়েছে কোতয়ালি,মতিঝিল, সায়েদাবাদ, কমলাপুর, সেগুনবাগিচা, কাকরাইল, ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরখান, উত্তরার অংশবিশেষ, মিরপুর ১, মিরপুর ২, মিরপুর ৩, মিরপুর ৬ ও মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায়। অন্যদিকে খুবই নিম্নমানের মাটি রয়েছে মেরাদিয়া, সাঁতারকুল, বাড্ডার অংশবিশেষ, ভাটারা, মিরপুরের ১৪ নম্বর এলাকা, বোটানিক্যাল গার্ডেনের আশপাশের নিম্নাঞ্চল, কল্যাণপুর ও মোহাম্মদপুরের অংশবিশেষ, পল্লবীর নিম্নাঞ্চল, কালাপানি এলাকাসহ আরও কিছু এলাকায়। এসব এলাকায় ভবন নির্মাণ করা উচিত নয়। খুব প্রয়োজনে ডুপ্লেক্স বা কাঠের বাড়ি নির্মাণ করা যেতে পারে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের এই প্রতিবেদনকে গুরুত্ব গিয়েই রাজউক মাটি পরীক্ষা করবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক আব্দুল লতিফ হেলালী।

জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান বলেন, ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ কেউ ঠেকাতে পারে না। তবে তবে প্রস্তুতির কারণে অনেক ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়। আমরা সেই প্রস্তুতিই নিচ্ছি। আমাদের এই প্রকল্পের আওতায় মাটি পরীক্ষা করে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হবে। পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে রাজধানী ঢাকা ভূমিকম্প সহনশীল শহরে পরিণত হবে বলে মনে করছি। বাংলা ট্রিবিউন

মন্তব্য