আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
সময় বেড়েছে সাতবার হতাশ প্লটের মালিকরা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের কালীগঞ্জের অংশবিশেষ অধিগ্রহণ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বাস্তবায়নাধীন পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের একাংশে এ বছরও কাজ শেষ না হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্নিষ্টরা। প্রকল্পের কালীগঞ্জ অংশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন দূরে থাক, প্লটের জন্য নির্ধারিত জায়গার দখলই নিতে পারেনি রাজউক। হাজার হাজার আদিবাসী এখনও এসব জমিতে বসবাস করছেন। পরপর সাতবার সময় বাড়িয়ে রাজউক শেষবার ঘোষণা দিয়েছিল, ২০১৮ সালের মধ্যে এ প্রকল্পের যাবতীয় কাজ শেষ হবে, বরাদ্দপ্রাপ্তদের প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এবারও তা সম্ভব হচ্ছে না।

অবশ্য প্রকল্পের রূপগঞ্জ অংশে ইতিমধ্যে প্লট বরাদ্দপ্রাপ্তদের প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, ড্রেনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজও প্রায় শেষের দিকে। অনেকে নকশার অনুমোদন নিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস শুরু করেছেন। কিন্তু কালীগঞ্জ অংশে এসবের ছিটেফোঁটাও হয়নি। প্রকল্পের একাংশে উন্নয়নের আলো জ্বললেও আরেক অংশে এখনও অন্ধকার জমে আছে।

এ প্রসঙ্গে পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক উজ্জ্বল মল্লিক বলেন, ঠিক সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা দূরের কথা, যে জায়গায় প্লট দেওয়া হবে, সেখান থেকে অবৈধ দখলদারই উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। রাজউক উচ্ছেদে গেলেই এলাকাবাসী বাধা দেয়। তারা বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপির কাছেও যায়। তাই এখনও এখান থেকে অবৈধ দখলদারদের একজনকেও উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে কী করে? তিনি বলেন, বিষয়টা নিয়ে আপনারাও লেখেন। চেয়ারম্যানের সঙ্গেও কথা বলেন।

রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান  বলেন, গাজীপুর অংশেও অনেক বাধা ছিল। বিভিন্নজনের কারণে কাজ শেষ করা যায়নি। এ নিয়ে একজনের মৃত্যুও হয়েছে। কিছু আদিবাসী ক্ষতিপূরণের টাকা নেয়নি, এমনকি প্লটও নেয়নি। শেষ পর্যন্ত গাজীপুরের একজন প্রতিমন্ত্রীর (মেহের আফরোজ চুমকি) সহযোগিতায় কাজ শুরু হয়েছে। যারা ক্ষতিপূরণের টাকা নেয়নি, তাদের টাকা নেওয়ার জন্য একটা সময়ও দেওয়া হয়েছে। ওই অংশের উন্নয়নের দায়িত্ব এখন নৌবাহিনীকে দেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে গাজীপুর অংশের পুরো কাজ শেষ হবে বলে আশা করেন তিনি।

১৯৯৫ সালে রাজউক ‘পূর্বাচল উপশহর প্রকল্প’ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে। এ প্রকল্পের জন্য মোট ছয় হাজার ২৭৭ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে রয়েছে চার হাজার ৫৭৭ দশমিক ৩৬ একর। গাজীপুরের কালীগঞ্জ অংশে রয়েছে ১৫০০ একর। মোট ৩০টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে পুরো এলাকা। এ ছাড়া ১৫০ একর জমি ঢাকা জেলার খিলক্ষেত থানায় কুড়িল ফ্লাইওভার এবং লিঙ্ক রোড নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্রকল্পে বিভিন্ন আকারের ২৭ হাজার আটটি প্লট তৈরির কথা। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে সাত হাজার ৭৮২ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

এরই মধ্যে রূপগঞ্জ অংশের প্রায় সবাইকে প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘরবাড়ি তৈরির মতো সেবা সুবিধাও নিশ্চিত করা হয়েছে। তিন দফা সময় বাড়িয়ে ২০১০ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল। এরপর আরও দুই দফা সময় বাড়িয়ে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। পরে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। সর্বশেষ আবারও সময়সীমা বাড়িয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রূপগঞ্জ অংশের সব প্লটের সীমানা চিহ্নিত করার কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। পুরো এলাকার রাস্তা ও ড্রেনের কাজও শেষ পর্যায়ে। সাড়ে চার কিলোমিটার লেক উন্নয়নের কাজ শেষ হয়েছে। ইকো পার্কের কাজও শেষ। ৩৩টি ব্রিজের মধ্যে ২৮টির কাজ শেষ। এ ছাড়া ১৪ ও ১৫ নম্বর ব্রিজের কাজ চলমান। অন্য তিনটি ব্রিজের কাজের দরপত্র আহ্বানও প্রক্রিয়াধীন। বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপনের কাজও শেষ পর্যায়ে। এরই মধ্যে ১, ২, ৩, ৪, ৫, ১৩ ও ১৪ নম্বর সেক্টরের বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হয়েছে। স্কুল, কলেজ, মন্দির, মসজিদ, গির্জা, খেলার মাঠের সীমানাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় সব জায়গাতেই নকশা অনুমোদন করা হচ্ছে।

অন্যদিকে কালীগঞ্জ অংশের ১৫, ১৬ ও ১৭ নম্বর সেক্টরে রাস্তার কাজ কেবল শুরু হয়েছে। তাও চলছে ধীরগতিতে। ১৫টি ব্রিজের একটারও কাজ শুরু হয়নি। কোনো বিদ্যুতের লাইন স্থাপন করা হয়নি। তিন কিলোমিটার লেকের কাজও শুরু হয়নি। কোনো প্লটের সীমানা নির্ধারণও হয়নি। এমনকি বরাদ্দ দেওয়ার কাজও বাকি। খেলার মাঠ, মন্দির, মসজিদ, স্কুলের সীমানাও নির্ধারণ হয়নি। পুরনো ঘরবাড়িগুলো আগের মতোই রয়ে গেছে। পাঁচ-ছয় হাজার লোক এখনও প্রকল্প এলাকায় বসবাস করছে। কূটনৈতিক পল্লীর সীমানাও নির্ধারণ হয়নি। ৩০ নম্বর সেক্টরের ৫৩ একর জমির ওপর নির্মিত পার্ক একটি চক্র দখল করে রেখে এখনও ব্যবসা করছে। রাজউক তা এখনও নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর পাড় ঘেঁষে অনেক অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ফলে পুরো প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ হওয়া নিয়ে ব্যাপক সংশয় রয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুর অংশের সমন্বিত উন্নয়ন না হওয়ার কারণে যারা ওই অংশে প্লট পেয়েছেন, তারাও হতাশার মধ্যে রয়েছেন। সমকাল

মন্তব্য