আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
রাজউকের জমিতে নব্য যুবলীগ নেতার অবৈধ মার্কেট

রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার পাশে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পের অবস্থান। এ প্রকল্পের জায়গা দখল করে অবৈধ মার্কেট ও বস্তি গড়ে তুলেছেন ইমরান হোসেন সুলতান নামের এক ব্যক্তি। প্রকল্পের বৃন্দাবন ও নতুন বৃন্দাবন চান্দুরা টেক এলাকা অংশে অবৈধ মার্কেট গড়ে ছয় বছর ধরে তা প্রসারিত করা হচ্ছে। প্রায় ২০০ ঘর ও ১০০ দোকান তুলে তাতে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির অবৈধ সংযোগ। পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে অটোরিকশার অবৈধ গ্যারেজ। এসব থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন সুলতান। প্রশাসনের চোখের সামনে এসব অবৈধ স্থাপনা গড়ে চাঁদাবাজি চালালেও কেউ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। স্থানীয় লোকজন বলছে, যুবলীগের নেতা পরিচয়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সেখানে এসব কাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন সুলতান। তাঁর বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করার সাহস পায় না। আগে সুলতান বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে যুবলীগের নাম ব্যবহার করলেও বস্তুত তিনি কোনো কমিটিতে নেই। সুলতান বর্তমানে ঢাকা উত্তর যুবলীগের তুরাগ থানায় নেতার পদ পেতে প্রভাবশালীদের কাছে ছোটাছুটি করছেন। তবে পদ পাওয়ার আগেই বিপুলভাবে দখল ও চাঁদাবাজি করা এই ‘নব্য নেতার’ দায়িত্ব নিতে চাইছেন না স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ইমরান হোসেন সুলতান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদ্যুতের একটা লাইন নিছি। এখানে অবৈধের কী আছে? খালি প্লটে বাজার! কয়েকটা ঘর আছে মাত্র। এইটা তো নতুন হয় নাই।’ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি যুবলীগ করি। এলাকার সবাই জানে।’

রাজউকের উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পের পরিচালক আব্দুল আউয়াল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দায়িত্ব নিয়ে আমি এখানে এসেছি তিন-চার মাস হলো। দখল করা ওই জায়গাটি দেখেছি। দ্রুতই সেখান থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।’

সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পল্লবীর ডিওএইচএস সংলগ্ন রাজউকের তৃতীয় প্রকল্পের জায়গায় বৃন্দাবন ও নতুন বৃন্দাবন চান্দুরা টেক এলাকাটি তুরাগ থানার আওতায়। স্থানীয় হরিরামপুর ইউনিয়নের সুলতান রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে ২০১২ সাল থেকে সেখানে অবৈধ স্থাপনা ও মার্কেট গড়ে তুলতে থাকেন। তাঁর মামা রহিম বাদশা উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পের উত্তরা ১৭ ও ১৮ নম্বর সেক্টরে বাড়ির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের ঠিকাদারি কাজ করেন এককভাবে। বালু ভরাট ও রাস্তার কাজও তাঁর একক নিয়ন্ত্রণে। আর ভাগ্নে সুলতান এই সুযোগে দখল বাণিজ্য শুরু করেন। ক্ষমতাধর মামা-ভাগ্নের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। সুলতান টিনশেড বস্তি ও বাজার নির্মাণ করে সেখান থেকে প্রতি মাসে চাঁদা তোলেন প্রায় ছয় লাখ টাকা। সেখানকার ৩০০ ঘরে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির অবৈধ সংযোগ। নিম্ন আয়ের মানুষ সেখানে বসবাস ও ব্যবসা করতে গিয়ে জিম্মি হয়ে পড়েছে সুলতানের কাছে।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সেখানকার কয়েকজন বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে জানায়, সুলতানের ছোট ভাই টুটুল একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ নিয়ে বাজার পাহারা দেন। আর সুলতানের নিজেরও রয়েছে ক্যাডার বাহিনী। এই ক্যাডার বাহিনীকে কিনে দেওয়া হয়েছে সাত-আটটি মোটরসাইকেল। তারা দিনভর ওই মোটরসাইকেলে এলাকায় চক্কর দিতে থাকে। প্রতিদিন এই ক্যাডার বাহিনীকে দিতে হয় কয়েক হাজার টাকা। গত কয়েক বছরে মিরপুরে পাঁচটি চায়নিজ রেস্টুরেন্ট ও কনফারেন্স হলের মালিক হয়েছেন সুলতান। এর মধ্যে রয়েছে মিরপুর ১২ নম্বরে সিসিলিয়ান চায়নিজ রেস্টুরেন্ট ও কনফারেন্স হল। আর মিরপুর ১২ নম্বরের ‘বি’ ব্লকে রয়েছে ‘খাবার হোটেল’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট। এসবে বিনিয়োগ করা অর্থের উৎস নিয়েও দেখা দিয়েছে রহস্য।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের ‘বি’ ব্লকের তিন কাঠার ৮৭টি প্লট ও ‘বি’ ব্লকের মাঠ নিয়ে চাকুলী বৃন্দাবনের অবস্থান। সেখানকার বেশির ভাগ বাসিন্দা হিন্দু সম্প্রদায়ের। তারা আগে মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন চাকুলী গ্রামে বাস করত। ওই গ্রামটি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড অধিগ্রহণ করার পর ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ্ তাদের অস্থায়ীভাবে চাকুলী বৃন্দাবনে বসবাসের জায়গা করে দেন। ওই বাসিন্দাদের কাছ থেকেও সুলতান ঘরপ্রতি এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা আদায় করেন। বিদ্যুতের পয়েন্টপ্রতি আদায় করেন ২০০ টাকা। টিভিপ্রতি ডিশের বিল ২৫০ টাকা। অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট থেকে আদায় করেন দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা করে। চাকুলীতে দোকান রয়েছে ৩০টি। প্রতিটি দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। ঘরের কক্ষ ভাড়া দেওয়া হয়েছে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা। এখান থেকে ভাড়ার টাকা তোলেন সুলতানের মা ফরিদা বেগম।

ভুক্তভোগীরা জানায়, উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের ‘ডি’ ব্লকের মাঠে ২৫ থেকে ৩০টি ঘর রয়েছে। এসব ঘরের প্রতিটি কক্ষ থেকে আদায় করা হচ্ছে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা। ‘ই’ ব্লকের মাঠে রয়েছে ৩৯টি ঘর। সেখান থেকেও একই হারে টাকা আদায় করা হয়। সুলতান নিজে প্রতি মাসে পাঁচ লাখ থেকে ছয় লাখ এবং তাঁর মা ফরিদা বেগম প্রতি মাসে এক লাখ টাকা আদায় করেন।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, নিজেকে যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন সুলতান। তবে তিনি সংগঠনের কোনো কমিটির পদে নেই। সুলতান ও তাঁর মামা রহিম বাদশা আগে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বছর তিনেক আগে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তারের পর কিছুকাল কারাগারে ছিলেন রহিম বাদশা। ২০১২ সালের পর নিজের ভোল পাল্টে যুবলীগকর্মী পরিচয় দিতে শুরু করেন সুলতান। আর বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তরের তুরাগ থানার যুবলীগের নেতার পদ পেতে প্রভাবশালীদের কাছে ছোটাছুটি করছেন। সুলতান সব সময় ক্যাডার বাহিনী নিয়ে চলাচল করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন যুবলীগ নেতা বলেন, ‘রহিম বাদশা বিএনপির লোক হয়েও পিডিকে (প্রকল্প পরিচালক) টাকা দিয়ে প্রকল্পের সব কাজ করেন। প্রতি মাসে বালু ভরাট, সড়কের কাজ এবং প্লটের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ থেকে আয় করছেন সাত-আট লাখ টাকা। আর তাঁর হাত ধরে প্লট দখল করে বাণিজ্য করছে সুলতান। নেতা না হতেই এই অবস্থা। নেতা হলে তো গোটা এলাকা গিলে ফেলবে।’

জানতে চাইলে রহিম বাদশা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে দখল কই দেখলেন? ঘর উঠিয়ে লোকজন ভাড়া দেয়। যারা ডিওএইচএস এলাকায় আছিল, সেই সব গরিব লোক উচ্ছেদের পর এইখানে থাকে। আমারও ছয়-সাতটা ঘর আছে। রাজউক এইগুলা ভেঙে দিবে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো দল করি না। রাজউকের স্যাররা কাজ দেয় বলে করি।’

সুলতানের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাইলে তুরাগ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও হরিরামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাশেম বলেন, ‘এই ছেলেকে তো আমি চিনি না। আর আমাদের দল করে কি না, তা-ও বলতে পারব না।’

জানতে চাইলে তুরাগ থানা যুবলীগের আহ্বায়ক নিত্য চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘এটা কোন সুলতান, বুঝতে পারতেছি না।’ তিনি নিজের মোবাইল ফোনে যুগ্ম আহ্বায়ক নাসির উদ্দিনের সঙ্গে এ প্রতিবেদককে কথা বলিয়ে দেন। নাসির বলেন, ‘হ্যাঁ, সুলতান পদ পাওয়ার চেষ্টা করছে। দলে নতুন এসেছে বলছে অনেকে। আমরা তুরাগ থানা যুবলীগ ক্লিন ইমেজের রাজনীতি করি। অভিযোগ থাকলে কেউ পদ পাবে না।’ কালের কণ্ঠ

মন্তব্য