আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
ঋণ দেওয়ার চেয়ে ঋণ আদায়ে ব্যাংকারদের অনাগ্রহ বেশী
  • অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন
  • অর্থমন্ত্রীসহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সমস্যা চিহ্নিত
  • তিন মেয়াদি পরিকল্পনা করে সমস্যা সমাধানের সুপারিশ

রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়াতেই গলদ রয়েছে। অসৎ ঋণগ্রহীতারা একই জমি বিভিন্ন ব্যাংকে জামানত রাখে। আবার জামানত ছাড়াও শুধু বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হয়। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের সময়ও চলতি মূলধন দেওয়া হয় না। আবার ব্যাংকারদের মধ্যে ঋণ আদায়ের চেয়ে ঋণ দেওয়ার প্রবণতাই থাকে বেশি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সম্প্রতি দেশের ব্যাংক খাতে এ ধরনের মোট ২৭টি সমস্যা চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। প্রতিবেদনে চিহ্নিত সমস্যাগুলো ব্যাংকের ঋণ প্রস্তাব মূল্যায়ন; ঋণ প্রদান; খেলাপি ঋণ আদায়; কর্মচারী নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি এবং পর্ষদ সদস্যদের নিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ—এই তিন মেয়াদি পরিকল্পনা করে এসব সমস্যা সমাধানের সুপারিশ করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এ ক্ষেত্রে তিন মাস থেকে এক বছর সময়কে স্বল্পমেয়াদি, এক বছর থেকে দুই বছরকে মধ্যমেয়াদি এবং দুই বছরের বেশি সময়কে দীর্ঘমেয়াদি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সুপারিশ বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নাম। এ ছাড়া কিছু সমস্যা বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ যৌথভাবে, আর কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই বাস্তবায়ন করবে এমন মত দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনমতে, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমানসহ ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য ও মতামতের ওপর ভিত্তি করে। শুধু সমস্যা চিহ্নিতই নয়, এগুলো সমাধানের উপায়সংবলিত সুপারিশও করা হয়েছে।

সুপারিশমালায় মোট সমস্যার মধ্যে ১৪টি স্বল্প মেয়াদে মেটানোর কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অহেতুক দেরি হওয়া। বলা হয়েছে, এই দেরির কারণে ঋণের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া হতে পারে বড়জোর তিন ধাপের। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তিন মাসের মধ্যে এ বিষয়ে বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধন করে নতুন নীতিমালা জারি করবে।

প্রতিবেদনে জামানত হিসেবে জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য জালিয়াতি রোধের লক্ষ্যে তথ্যকোষ গঠন এবং ছয় মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, শুধু লোন অ্যাগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিপ্টস (এলটিআর) বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে দেওয়া জামানত ছাড়া ঋণগুলো খেলাপি হয়ে যাচ্ছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান বলেন, ‘সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের সুপারিশ করা হয়েছে। আশা করছি, তিন মেয়াদে এগুলো বাস্তবায়িত হবে। বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া এখনই শুরু করা উচিত।’

ঋণখেলাপিদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণখেলাপিরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। নাম-ঠিকানাসহ বড় ঋণখেলাপিদের হালনাগাদ তালিকা ব্যাংকের ওয়েবসাইট, নোটিশ বোর্ড বা দৃশ্যমান স্থানে প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। জনসমক্ষে প্রকাশ পেলে বিব্রত হওয়ার ভয়ে তাঁরা টাকা পরিশোধে এগিয়ে আসবেন। এটা বাস্তবায়ন করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সরকারি ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে থাকা শাখাসহ করপোরেট-১ মানের শাখাগুলোতে খেলাপি ঋণ বেশি থাকে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাস্তবে সব ঋণ কেস এক রকম নয়। তা সত্ত্বেও আদায় কার্যক্রমে শুধু পরিমাণগত লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখ করে ব্যাংকারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। উচিত হবে ব্যাংকারদের বিভিন্ন সূচকের লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে তিন মাস পরপর সূচকগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি মূল্যায়ন করা এবং এ ব্যাপারে তাঁদের সাফল্য-ব্যর্থতার বিষয়টি বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) প্রতিফলন ঘটানো।

এ ছাড়া উচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে বড় ঋণখেলাপিরা টাকা পরিশোধ প্রক্রিয়া বিলম্বিত করেন। অনেক ক্ষেত্রে আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করায় হাজার হাজার কোটি টাকা অনাদায়ি পড়ে থাকে। তাই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে আলাদা বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। খেলাপি ঋণের সিংহভাগ গুটিকয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ১০০ কোটি টাকা বা তার চেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের ঘটনাগুলো তদারকির জন্য প্রতিটি ব্যাংকের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও আলাদা সেল থাকা জরুরি।

ঋণ আদায়ে ব্যাংকারদের অনাগ্রহ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণ দেওয়ার চেয়ে আদায় কষ্টসাধ্য বলে ব্যাংকারদের মধ্যে এ কাজে অনাগ্রহ দেখা যায়। তাই আদায়ের জন্য প্রণোদনা ও ব্যর্থতার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা চালু করে নীতিমালা করতে হবে। পার্বত্য, হাওর বা দ্বীপাঞ্চলের শাখাগুলোতে জনবলসংকট রয়েছে। প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের অভাবে সময়মতো পদোন্নতিও পান না প্রত্যন্ত এলাকার ব্যাংকাররা। পদোন্নতিতে তাঁদের জন্য আলাদা নম্বর দেওয়া এবং আজীবন ঢাকায় থাকলে নম্বর কাটার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে পদোন্নতি নীতিমালা করতে হবে।

অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং তুলনামূলক কম দক্ষতাসম্পন্ন জনবল নিয়োগ দেওয়া হয় ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাকাজে। আবার নিরীক্ষা কমিটি স্বাধীনভাবে কাজ করারও সুযোগ পায় না। এটি রোধ করতে হবে। বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইনে ব্যাংক অধিগ্রহণ বা একীভূতকরণের বিষয়ে একটি ধারা থাকলেও তা বিস্তারিত নয়। অথচ অল্প সময়ে অনেক ব্যাংক হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে ব্যাংক অধিগ্রহণ বা একীভূতকরণের দরকার হতে পারে। দরকার এখন আইন সংশোধনের।

‘আপনার গ্রাহককে জানুন’ বা কেওয়াইসি ফরম ঠিকভাবে মূল্যায়ন হলে ভুয়া গ্রাহক কমতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে কেন্দ্রীয় কেওয়াইসি (সি-কেওয়াইসি) ব্যবস্থা করতে হবে।

বর্তমানে ঋণ প্রস্তাব মূল্যায়নের সময় প্রকল্পের প্রকৃতি, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঋণমান (ক্রেডিট রেটিং) এবং নগদ অর্থপ্রবাহ যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয় না। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকর তদারক ব্যবস্থা চালু করতে পারে।

সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা থেকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালক নিয়োগ হলেও তাঁদের বড় অংশেরই ব্যাংক পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকে না। তাঁদের জন্য মৌলিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

এ ছাড়া জমির মূল্যমান নির্ধারণে জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য নীতিমালা তৈরি, ব্যাংকের এমডিদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে দক্ষ জনবল নিয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দেওয়া সেবার বিনিময়ে ব্যাংকগুলোর জন্য মাশুলের ব্যবস্থা করা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পরিধি বৃদ্ধি ইত্যাদি সুপারিশ করা হয়। প্রথম আলো

শেয়ার করুন