আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
আবাসন নয়, বিত্তবান তৈরি করছে রাজউক

ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫৬ সালে। ১৯৮৭ সালে এটি উন্নীত হয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক)। এরপর এখন পর্যন্ত তিনটি বড় আবাসন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সংস্থাটি। দুই দশক আগে নেয়া হলেও এসব প্রকল্পের কোনোটিই পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি তারা। ফলে আবাসনের ব্যবস্থা হয়নি প্লট বরাদ্দপ্রাপ্ত অধিকাংশের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগর উন্নয়ন মূল কাজ হলেও রাজউকের সেদিকে মনোযোগ কম। সংস্থাটির আবাসন প্রকল্পে লটারির মাধ্যমে ভাগ্যবান কিছু ব্যক্তি প্লট বরাদ্দ পাচ্ছেন। কম মূল্যে বরাদ্দ পাওয়া এসব প্লট তারা বিক্রি করছেন উচ্চমূল্যে। এভাবে উচ্চমূল্যে প্লট বিক্রির মাধ্যমে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষকে বিত্তবান হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে সংস্থাটি।

ক্ল্যাসিফায়েড বিজ্ঞাপনের সাইট থেকে শুরু করে দৈনিক পত্রিকাগুলোয় রাজউকের বরাদ্দপ্রাপ্ত জমি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায় প্রায়ই। এ ধরনের একাধিক বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত জমির উচ্চমূল্যের কারণে তারা জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন।

একটি বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে কথা হয় সাবেক একজন জেলা জজের সঙ্গে। নাম প্রকাশ করা হবে না, এমন শর্তে তিনি বণিক বার্তাকে জানান, পূর্বাচলের প্রথম দিকের জমি বরাদ্দপ্রাপ্তদের একজন তিনি। জমির পরিমাণ পাঁচ কাঠা। অবস্থান ২ নম্বর সেক্টরে। প্রতি কাঠা জমির মূল্য চাইছেন আড়াই কোটি টাকা।

নিজে বসবাস না করে বিক্রি করতে চাইছেন কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সন্তানদের সবাই দেশের বাইরে থাকে। তাই এখানে বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা নেই। জমি ফেলে রাখলে দখলসহ অন্যান্য হয়রানিতে পড়তে হতে পারে। এ কারণে জমি বিক্রি করে দিয়ে টাকা ব্যাংকে রাখব।

রাজউক পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের লটারিতে প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন ঊর্ধ্বতন একজন সরকারি কর্মকর্তা। বরাদ্দ থেকে লিজ দলিল পেতে তিনি ব্যয় করেন ১৫ লাখ টাকার মতো। ১৭ নম্বর সেক্টরের পাঁচ কাঠা প্লটের জমিটি তিনি বছর দুয়েক আগে কাঠাপ্রতি ৫০ লাখ টাকা দরে আড়াই কোটি টাকায় বিক্রি করে দেন।

আবাসন খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজউক সরকারি দামে জমি বরাদ্দের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে সুবিধা করে দিচ্ছে। বরাদ্দপ্রাপ্তদের সে জমিতে বসবাসের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। আবার সেখানে আবাসন প্রকল্প তৈরির সঙ্গতিও বেশির ভাগেরই থাকে না। ফলে কম মূল্যে জমি বরাদ্দ দিয়ে বরাদ্দপ্রাপ্তদের তা উচ্চমূল্যে বিক্রির সুযোগ করে দিচ্ছে রাজউক।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ তৌফিক এম সেরাজ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, এখন ঢাকা শহরের যে অবস্থা, তাতে এককভাবে সরকারি দামে প্লট বরাদ্দের মাধ্যমে একটি শ্রেণীকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। রাজউকের কাজ নগর উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সেটিতে মনোযোগ না দিয়ে তারা ভূমি উন্নয়নের মাধ্যমে বরাদ্দ দিয়ে একটি অসম শ্রেণী তৈরি করছে। এখন বাড়ি বানাতে যে পরিমাণ খরচ, তা একজনের পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব।

রাজউক ঢাকার কেরানীগঞ্জে ঝিলমিল আবাসন প্রকল্পটি হাতে নেয় ১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে। কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০০১ সালে। এরপর ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সব কাজ শেষ করতে পারেনি সংস্থাটি। একাধিকবার প্রকল্পের সময় বেড়েছে। প্রকল্প ব্যয় বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। ১৯৯৭ সালে ঝিলমিল প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১৩৬ কোটি টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৫ কোটি টাকায়।

প্রকল্পটির আওতায় ১ হাজার ৭৪০টি প্লট এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ৯ হাজার ৫০০টি অ্যাপার্টমেন্টের সংস্থান রাখা হয়েছে। প্রকল্পটি গ্রহণের সময় বলা হয়েছিল, রাজধানীর বর্ধিত এলাকার নিকটবর্তী শহরের বাসিন্দাদের বসবাসের সুযোগ সৃষ্টি করে ঢাকা শহরের জনসংখ্যার চাপ কমানো ছাড়াও ঢাকা ও কেরানীগঞ্জের মধ্যে ধীরে ধীরে নগরীকরণের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা প্রসারিত করা। প্রকল্পটি ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর দুই কিলোমিটার পশ্চিমে।

রাজধানীর অদূরে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি রাজউক হাতে নেয় ১৯৯৫ সালে। প্রকল্পটির জন্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সাড়ে চার হাজার একর ও গাজীপুরের কালীগঞ্জে দেড় হাজার একর মিলিয়ে জমি অধিগ্রহণ করা হয় ছয় হাজার একর। এখানে প্লট হবে ২৫ হাজার। অধিগ্রহণ জটিলতায় আট বছর পর ২০০৩ সালে শুরু হয় প্রকল্পের ভূমি উন্নয়নকাজ। ২৩ বছরে এ প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ৫৮ শতাংশ। একাধিকবার সময় বাড়িয়েও প্রকল্পের কাজ শেষ করতে সর্বশেষ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত।

দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প যখন হাতে নেয়া হয়, তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে এ প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। বাড়তি ব্যয়ের পুরোটাই বহন করতে হচ্ছে প্লট গ্রহীতাদের।

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটিতে ২৫ হাজার ১৬টি আবাসিক প্লটের সংস্থান রাখা হয়েছে। ৬ হাজার ২২৭ দশমিক ৩৬ একর জমির ওপর বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের বিভিন্ন ধরনের কাজের মধ্যে জরিপ, পরিকল্পনা, জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে। এখনো বাকি রয়েছে পূর্বাচল সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ, ৩২০ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ, সারফেস ড্রেন ও ক্রস ড্রেন নির্মাণ, সেন্ট্রাল আইল্যান্ড নির্মাণ, সীমানা পিলার স্থাপন ও ভেতরের রাস্তায় ৬১টি সেতু নির্মাণের কাজ। এছাড়া নদীর পাড় রক্ষার কাজও শেষ হয়নি। ৪৭৭ দশমিক ২০ একর জমি নিয়ে ৪৩ কিলোমিটার লেক নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।

সম্প্রসারিত উত্তরা আদর্শ আবাসিক শহর তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয় ১৯৯৯ সালে। প্রকল্পটির জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে ২ হাজার ৮ একরের কিছু বেশি। মূলত নতুন আবাসস্থল সৃষ্টির মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান বাসস্থান সংস্থান করার জন্য প্রকল্পটি গ্রহণ করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সে সময় বলা হয়েছিল, যথাযথ নগরায়ণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা উন্নতি করার পাশাপাশি নগরায়ণের মাধ্যমে মিরপুর থেকে ক্রমান্বয়ে টঙ্গী পর্যন্ত যাতায়াতসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হবে। এর বাইরেও ভবিষ্যতের বর্ধিষ্ণু ঢাকা শহরের আবাসিক চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখবে প্রকল্পটি। আবাসন প্রকল্পটিতে তিন কাঠা ও পাঁচ কাঠার ৮ হাজার ২৯৫টি প্লট তৈরি করা হয়। প্লট তৈরিতে অধিগ্রহণকৃত ভূমির ২৪ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০০৩ সালের জুনের মধ্যে। কিন্তু একাধিকবার সময় বাড়িয়ে তা শেষ করতে পারেনি রাজউক।

এসব ব্যর্থতার পরও নতুন করে চারটি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে রাজউক। চারটি প্রকল্পের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, দোহার, আমিনবাজার থেকে গাজীপুরের সফিপুর পর্যন্ত তুরাগ নদের দু’পাড় এবং পূর্বাচল উপশহর প্রকল্প এলাকার পূর্বদিকে ঢাকা মহানগর বাইপাসের উত্তর পাশে।

জানতে চাইলে রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, রাজধানীতে মানুষ বাড়ছে। তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করা রাজউকের দায়িত্ব। সেজন্যই নতুন নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে বাড়তি মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য।

আগের প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও আবার নতুন প্রকল্প গ্রহণ বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশেই বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হয়। আইনিসহ অন্যান্য জটিলতায় আগের প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। তবে সবগুলোর কাজই দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

মন্তব্য