আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙায় গড়িমসি, দায়িত্ব নিতে রাজী নয় কোনো সংস্থা

ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আছে কিন্তু ভাঙার উদ্যোগ নেই কোনো সংস্থার। একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে নিজের দায় এড়িয়ে চলছে সংস্থাগুলো। রাজউক বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মানদণ্ড নির্ধারণ করে তালিকা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং দুই সিটি কর্পোরেশনকে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশন বলছে, সুনির্দিষ্ট করে রাজউক কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা দিতে পারেনি। তালিকা তৈরির জন্য আবারো রাজউককে বলা হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা হাতে পেলেই যৌথভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এককভাবে সিটি কর্পোরেশন ভবন ভাঙতে পারবে না। কারণ ভবন নির্মাণ ও ভাঙার দায়-দায়িত্ব রাজউকের। সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙতে সিটি কর্পোরেশনের ওপর কেন চাপানো হচ্ছে? নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো বিশেষ লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করে সাইনবোর্ড ঝোলানোর নির্দেশনা থাকার পরও রাজউক এবং ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করেনি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্ভাব্য করণীয় ঠিক করতে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছে রাজউকসহ কয়েকটি সেবা সংস্থা। কিন্তু এসব বৈঠকে আলোচনা অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। বাস্তবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে- নগরীর প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি, আমলা, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের একাধিক ভবন থাকায় লাল ফিতায় বন্দি বাড়িগুলো ভাঙার পদক্ষেপ নিতে গড়িমসি করছে সংস্থাগুলো। তথ্যমতে, রাজউক ৩২১টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করেছে। এরমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ২১৩টি এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ১০৮টি ভবন।

এরপর থেকে জরিপ চালানো হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মানদ- নির্ধারণ করে আবারো তালিকা করা হলে এই সংখ্যা বাড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। রাজউকের কর্মকর্তারা মনে করেন, দেশে সুনির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্ণয়ের কোনো মাপকাঠি নেই। এজন্য শুধু রাজউক নয় জননিরাপত্তার স্বার্থে ভবন ঝুঁকিপূর্ণ নিরূপণে সিটি কর্পোরেশন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগ এবং ফায়ার সার্ভিসের সমন্বিত জরিপের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল আমার সংবাদকে বলেন, ভবন ঝুঁকিপূর্ণের বিষয়টি রাজউক দেখে। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে বিষয়টি আপাততভাবে জানালেও সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানায়নি। ভবন ভাঙার ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন একা পারবে না রাজউককে সহযোগিতা করতে হবে। রাজউক সার্ভে করে সুনির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা জানাবে। তিনি আরও বলেন, ভবন ভাঙার দায়িত্ব কার সেটি ঠেলাঠেলির বিষয় নয়, কনস্ট্রাকশনের কাজ কে দেখে সিটি কর্পোরেশন নাকি রাজউক? ভবনের প্ল্যান কে পাস করে? কেউ যদি বাড়ি করতে চান, কার কাছে যান? সুতরাং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, অবৈধ ভবন সবকিছু রাজউক দেখবে। রাজউকের সৃষ্টি ১৯৫২ সালে। ৫২ সালে বহু ভবন নির্মাণ হয়েছে। সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। সুতরাং নিয়ম অনুযায়ী ভবন ভাঙার দায়িত্ব কার, সেটি আইনেই বলা আছে।

ভবন ভাঙার ব্যাপারে রাজউক সিটি কর্পোরেশনকে বলতে পারে? নাগরিক স্বার্থ যেখানে আছে সেখানে অবশ্যই সিটি কর্পোরেশন যাবে বলে মনে করেন এই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়ে রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) যুগ্ম সচিব মোশাররফ হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, রাজউকের আওতাধীন যেসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে তা টেকনিক্যাল লোকজন দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ২০১৬ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত ফাইল পাঠিয়েছি। তখনই মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর আর কোনো উদ্যোগ কাজে আসেনি। মূলত গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ফাইলটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। এরপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ফাইল দুই সিটি কর্পোরেশনকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার নির্দেশনা দেবে। রাজউক শুধু ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করার ক্ষমতা রাখে ভাঙার এখতিয়ার সিটি কর্পোরেশনের। রাজউকের পরিচালক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার অলিউর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ফিল্ড পর্যায়ে যখন অবৈধ ভবন ভাঙতে যাই তখন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে আমরা হাত দেই না। কারণ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা হয়েছে। সেই তালিকা সিটি কর্পোরেশনকে বুঝে দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার দায়-দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমার সংবাদকে বলেন, রানাপ্লাজা ধসের পর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ ও ভাঙার উদ্যোগ নেয়া হয়। রাজউক ভবনের তালিকাও তৈরি করেছিল। সেই তালিকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা কমতে কমতে অর্ধেকে নেমে আসে। এরপরও ভবনগুলো ভাঙার উদ্যোগ কার্যকর করা হয়নি। সুশাসন ও রাজনৈতি হস্তক্ষেপের কারণে ভবনগুলো ভাঙা হচ্ছে না।

এসব রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ভবন মালিকদের কাছে রাজউক ও সিটি কর্পোরেশন অসহায়। তিনি বলেন, নগরীতে যখন বড় ধরনের ভবন ধসের ঘটনা ঘটে তখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, রাজউক ও সিটি কর্পোরেশন নড়েচড়ে বসে। কয়েকদিন না যেতেই আবারও নিশ্চুপ হয়ে পড়ে সংশ্লিষ্টরা। আবারো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করা হবে। কিন্তু কোনো কাজ হবে না। রাজউক তার মৌলিক দায়িত্বের দিক থেকে নজর সরিয়ে ফ্ল্যাট-প্ল্যাট ব্যবসার দিকে নজর দিচ্ছে। দিন শেষে রানাপ্লাজার মতো ঘটনা ঘটলে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উল্লেখ, গত বছরের এপ্রিল মাসে রাজউক চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ, পানির লাইন বন্ধ করতে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও ওয়াসাকে নির্দেশনা দেওয়া হলেও এখনও অধিকাংশ ভবনে লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়নি।

মন্তব্য