আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
জমিহারাদের স্বপ্নের আবাসন

সব মিলিয়ে দুই থেকে আড়াই বছর হলো নিজের গ্রাম মধুপাড়া ছেড়ে যান জাকির হোসেন। পায়রা তাপবিদ্যুত কেন্দ্রর অধিগ্রহণে নিজের ৬৪ বিঘা জমির সঙ্গে বসতবাড়িও ছেড়েছেন। যেখানে নাড়ি পোঁতা ছিল সেই গ্রাম, চেনা মানুষের মুখ সবকিছুই পেছনে ফেলে চলে যেতে হয়। ভেবে ছিলেন চলে যাবেন, এই যাওয়াই বুঝি শেষ। একসঙ্গে বেড়ে ওঠা বাল্যবন্ধুটির সঙ্গে রোজ সন্ধ্যায় আড্ডা দেয়া হবে না। দেখতে ইচ্ছা হলেই পাশের বাড়ির প্রিয় মুখটিকে দেখা যাবে না। সাধারণত সরকারী উন্নয়ন প্রকল্পের অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের চাষের জমি, ভিটে-মাটি সবই যায়। এর বদলে মোটা অঙ্কের অর্থ দেয়া হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম এক উদাহরণ তৈরি করেছে পায়রা তাপ বিদ্যুত কেন্দ্র। জাকির হোসেনকে ফিরিয়ে দিয়েছেন তার গ্রাম। তবে মধুপাড়া নয় স্বপ্নের ঠিকানা হয়ে ফিরছেন জাকির হোসেন আবার চেনাগ-িতে। মাত্র আজকের দিনটি। কাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বপ্নের ঠিকানার চাবি তুলে দেবেন ১৩০ পরিবারের হাতে। জাকির হোসেনের চোখে এখন সেই চেনা পরিচিত মুখগুলো ভাসছে। হয়তো এক সপ্তাহ তারপর চেনা সব মুখ এক জায়গাতে। আবার ঠিক আগের মতো সকালে আলো ফুটলে যেমন দেখা হবে, দেখা হবে সন্ধ্যেতে। আপদে-বিপদে সুখে-দুঃখে মধুপাড়ার মানুষেরা এক হবে স্বপ্নের ঠিকানায়।

মধুপাড়ার সেই সময় আর এখন নিজের চোখে কি পার্থক্য দেখছেন, এমন প্রশ্নে জাকির হোসেনই বলেন, আগে এখানে পাকা রাস্তা ছিল না। বিদ্যুত তো কারও আশাই করার কথা নয়। একটি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। এর উপরে যারা পড়া লেখা করতে চাই তো তাদের কলাপাড়ায় যেতে হতো। কিন্তু বিপত্তি ঘটত বৃষ্টিতে। সাত-আট কিলোমিটার রাস্তার পুরোটাই কাদায় মাখামাখি। এত এত প্রতিবন্ধকতা ঠেলে মানুষ খুবই কমই এগুতে পেরেছে। ফলে কৃষকের ছেলে আবার কৃষক হয়েছে, জেলে জেলেই রয়ে গেছে। সেই কৃষক আর জেলেদের জমিতে একদিন শহুরে বড় বড় শিক্ষিত মানুষ এলো, ভারি ভারি যন্ত্রপাতি এলো। এখন কেন্দ্রর কাজের অর্ধেক শেষ হয়েছে কিন্তু এরমধ্যেই সেই মধুপাড়া বদলে গেছে। কালো পিচের রাস্তায়, বিদ্যুতের ঝলমলে আলোতে সে বদল টের পাওয়া যায়। এই তো আর কটা দিন এরপর মধুপাড়ার মানুষকে আর বাইরে পড়তে যেতে হবে না। মধুপাড়ায় ছুটে আসবে এলাকার মেধাবীরা। হয় তো আরও দূর-দূরান্ত থেকে।

নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএম খোরশেদুল আলম বলেন, এখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য আমরা যে স্কুলটি নির্মাণ করেছি সেখানে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা হবে। সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে স্কুলটি। আমরা এমনভাবে শিক্ষার্থীদের তৈরি করতে চাই যেন চাকরির জন্য তাদের অপেক্ষা করতে না হয়। চাকরি যেন তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। বিদ্যুত খাতে প্রশিক্ষিত দক্ষ কর্মীর অভাব রয়েছে। আমরা শিক্ষার্থীদের সেভাবেই তৈরি করব। সঙ্গে সঙ্গে তাদের পাঁচটি ভাষা শেখানো হবে। যাতে করে দেশের চাহিদা পূরণ হলে ওই শিক্ষার্থী দেশের বাইরে কোথাও কাজ পায়। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা বন্দর উদ্বোধনের পর এখানে বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরে এখানে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। শনিবার প্রধানমন্ত্রী আসছেন পায়রাবাসীর মতো বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানির কর্মীরাও দারুণ উচ্ছ্বসিত বলে জানান তিনি।

সঙ্গত কারণে মধুপাড়া বা স্বপ্নের ঠিকানা যাই হোক না কেন এখানে মেধাবীরা এখন ছুটে আসবেই। নিশ্চিত নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্যই। যেখানে এক সময় সাগরের প্রতিকূলতা, ঝড়-ঝঞ্ঝাকে সঙ্গে করেই মানুষ বাস করত। নিত্য তাদের দুর্ভাগা বলা হতো। এই মানুষগুলোর কাছেই ভাগ্যের সন্ধানে ছুটে আসবেন অনেকে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে মাহফুজা আক্তার তো পরিকল্পনা করেই বসে আছেন। তার ছেলেটি এসএসসি পাস করেছে। এখন তাকে এই স্কুলে দেবেন। এরপর এই কেন্দ্রে নিশ্চয়ই চাকরি হবে। দুই সন্তানের বড়টির চাকরি হলে ছোটটিও তিনি এভাবে মানুষ করতে পারবেন।

বৃহস্পতিবার পায়রা তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রর আবাসন প্রকল্পে ঢুকতেই চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন এক মসজিদ। পাশেই স্কুল, বাজার, কমিউনিটি সেন্টার। স্কুলের মাঠেই প্রধানমন্ত্রীর শুভাগমনের জন্য মঞ্চ নির্মাণ করা হচ্ছে। সেই মঞ্চেই শনিবার প্রধানমন্ত্রী দশজনের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে চাবি তুলে দেবেন। ওইদিনই চাবি বুঝিয়ে দেয়া হবে আরও ১২০ জনের হাতে। সব মিলিয়ে ১৩০ পরিবার ওইদিনই আবাসন প্রকল্পে উঠতে পারবেন।

৪৮ বিঘা জমির ওপর এই পুনর্বাসন পল্লীর সব ঘরের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে বেশ আগেই। দুটি ডিজাইনে সেমিপাকা ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। যেসব পরিবারের ২০ শতকের বেশি জমির বসতি নষ্ট হয়েছে তাদের জন্য সাড়ে সাত শতক জমিতে ১২শ’ বর্গফুট আয়তনের ৮২টি এবং যাদের কম ক্ষতি হয়েছে তাদের জন্য সাড়ে পাঁচ শতক জমিতে এক হাজার বর্গফুট আয়তনের ৪৮টি ঘর করা হয়েছে। সব ঘরগুলো এল টাইপের। দক্ষিণমুখো। এই ঘরের প্রত্যেকটিতে ১৫ দশমিক সাত ফুট আয়তনে বাথরুমসহ একটি মাস্টার বেডরুম ছাড়াও আরও দুইটি ১৫ ফুট আয়তনের বেডরুম রয়েছে। ১০ দশমিক চার ফুট আয়তনের একটি ডাইনিংরুম। ১২ দশমিক দুই ফুটের রান্নাঘর। এছাড়া একটি কমন বাথরুম রয়েছে। সামনের বারান্দা লোহার গ্রিল দিয়ে আটকানো রয়েছে। প্রত্যেকটি ঘরের সামনে একটি খালি জায়গা থাকছে। পরিবারগুলো ঘরে ওঠার আগে সেখানে সবুজ গাছও লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।

যেখানে শাক-সবজির আবাদ কিংবা গবাদিপশুসহ হাঁস-মুরগি পালনের সুযোগ থাকছে। পুনর্বাসন পল্লীতে ৩৬ হাজার ৯২৯ এবং ২৪ হাজার ৫৫৪ বর্গফুট আয়তনের দুটি পুকুর খনন করা হয়েছে। যার উত্তর-দক্ষিণ দিকে প্রশস্থ সান বাঁধানো ঘাট রয়েছে। পাশে রাখা হয়েছে বেঞ্চ। এই পল্লীতে নিরাপদ পানির জন্য ৪৮টি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। আধুনিক দ্বিতল মসজিদের কাজ শেষ হয়েছে। ২৩ শতক জমিতে করা হয়েছে মসজিদটি। দ্বিতল কমিউনিটি সেন্টারের নির্মাণ কাজও শেষ হয়েছে। এর নিচতলায় থাকবে ক্লিনিক। রাখা হয়েছে খেলার মাঠ। চারটি দোকান করার মতো স্পেস নিয়ে একটি শপিং সেন্টার করা হয়েছে। রয়েছে ঈদগা মাঠ। একটি স্কুল ভবন করা হয়েছে। যেখানে কারিগরি শাখার অগ্রাধিকার থাকছে। ভেতরের পানি নিষ্কাশনের সাড়ে চার কিমি. ড্রেনসহ ভেতরের ১২ ফুট প্রস্থ দুই দশমিক সড়ক করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট কবরস্থান করা হয়েছে। দূর থেকে দেখা এই পল্লী এখন নজর কাড়ে অন্যদেরও। সার্বক্ষণিক বিদ্যুত সুবিধা থাকছে। ইতোমধ্যে বিদ্যুত সংযোগ দেয়া হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্য ওয়ালিউর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের পর আমাদের বলা হয়েছে আমরা আবাসন প্রকল্পে উঠে পড়তে পারব। হয় তো আগামী শনিবার সন্ধ্যায় এখানে আমার সব ঘরে এক সঙ্গে আলো জ্বেলে ফিরে আসার উৎসব করতে পারব। হারানোর বেদনাকে প্রাপ্তির আনন্দে ভুলে যেতে পারব।

এই উচ্ছ্বাস এই আনন্দে আত্মহারা মধুপাড়ার রুনা বেগম, সাজিদা বেগম আর পিয়ারা বেগমের। সেদিন যেমন ব্যথা বুকে নিয়ে চলে যেতে হয়েছে আজ আবার সেখানেই ফিরতে পারার প্রহর গুনার দেন শেষ হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি আর চীনের সিএমসির যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি বিদ্যুত কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে। বিদ্যুত কেন্দ্ররটির অর্ধেক মালিকানা থাকছে বাংলাদেশ সরকারের। এখানেই আগামী ডিসেম্বরে নির্মাণ কাজ শুরু হচ্ছে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও একটি বিদ্যুত কেন্দ্রর। যার অর্ধেক মালিকানাও থাকছে বাংলাদেশ সরকারের। এছাড়াও নির্মাণ করা হবে দেশের সব থেকে বড় তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াট এলএনজিভিত্তিক সরকারী বিদ্যুত কেন্দ্র। যে প্রকল্পটির ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষ হয়েছে। জার্মান সিমেন্সের সঙ্গে নর্থ ওয়েস্ট যৌথ উন্নয়ন চুক্তি সই করেছে।

মন্তব্য