আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
নিয়ম বহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না রাজউক
নিয়ম লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণনিয়ম বহির্ভূত নির্মাণাধীন ভবনে অনিয়ম ধরিয়ে দিলেও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ নগরবাসীর। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা বেআইনি অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দিচ্ছে। নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নিয়ে নকশা অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেন তারা। তবে বিশেষজ্ঞরা রাজউকের লোকবল সংকটের দাবিকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন না। তারা বলছেন, সদিচ্ছা থাকলে সীমিত লোকবল দিয়েই পর্যাপ্ত কাজ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির নজির স্থাপন করা গেলে নকশার ব্যত্যয় হওয়ার ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।
রাজউকের নিয়ম অনুযায়ী ভবন নির্মাণের সময় রাস্তার জন্য ২০ ফুট জায়গা রাখার কথা। উত্তর গোড়ান এলাকার এক বাড়ির মালিক এই নিয়ম অনুসরণ না করায় গত বছরের ২০ জানুয়ারি রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করে  স্থানীয় আদর্শবাগ সমাজ কল্যাণ সংসদ। লিখিত ওই অভিযোগে ৩৩৮/২ উত্তর গোড়ান আদর্শবাগ এলাকার আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ভঙ্গের অভিযোগ করা হয়। অভিযোগের এক বছর পার হতে চললেও ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।
একই এলাকার ৩৫১ হোল্ডিংয়ে রূপসী বিল্ডার্স নামে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দা পারভেজ আহাম্মদ। ওই বছরের ২৮ জুলাই রাজউক চেয়ারম্যান বরাবরে তিনি অভিযোগ করেন রাজউক ৭ তলা বাড়ির নকশা অনুমোদন দিলেও ৮ তলার নির্মাণ শেষে ৯ম তলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগ দায়েরের দেড় বছর পার হলেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কয়েক মাস আগে রাজউকের কর্মকর্তারা ওই ভবনের কিছু অংশ ভেঙে দিলেও পরে তা মেরামত করেই চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে ভবন নির্মাণের কাজ। শুধু এ দুটি ভবন নয়, রাজউক অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নগর জুড়ে এমন শতশত ভবন উঠছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসবের পেছনে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই দায়ী।
জানতে চাইলে রাজউকের সদস্য আসমা উল হোসেন (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) বলেন, ‘রাজউকে কেউ কোনও অভিযোগ করলে আমরা সেগুলোকে গুরুত্বসহ বিবেচনায় নেই।  তবে কিছু সীমাবদ্ধও আছে। অনেক সময় উচ্ছেদ করতে গেলে পুলিশ পাওয়া যায় না। আমরা উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিমাসে ফোর্স চেয়ে পুলিশের কাছে একটা চাহিদাপত্র দিই। কিন্তু যে পরিমাণ চাহিদা দেওয়া হয় তার চার ভাগের একভাগও পাওয়া যায় না। প্রতিমাসে ১৫-২০ দিনের চাহিদা দিলে ৪-৫ দিনের অনুমোদন দেয় তারা। এটা আসলেই পর্যাপ্ত নয়।’
তবে রাষ্ট্রীয় কাজের ব্যস্ততা স্বীকার করে নিয়ে পুলিশ বলছে, চাহিদাপত্র দিয়ে সে অনুযায়ী পুলিশ পেতে অনেকই সময়ই আর কোনও যোগাযোগ রক্ষা করে না রাজউক।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় প্রায় ৭২ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এর বেশিরভাগই অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করেই নির্মিত। এছাড়া ২০১১ সালের দিকে জাইকার সহযোগিতায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদফতর পরিচালিত চার বছর মেয়াদি এক জরিপে দেখা গেছে, গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে ঢাকায় নির্মাণ করা ২ হাজার ১৯৩টি সরকারি ভবনের ৫৯ শতাংশই ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অধিকতর ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০ বছরের বেশি বয়সি ইটের গাঁথুনিতে তৈরি এসব ভবন নির্মাণেও নানা অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। ২০১৩ সালের দিকে পরিচালিত আরেক জরিপে নগরীর ৩২১টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়।
নগরীতে শত শত অনুনোমদিত ভবন থাকলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ উচ্ছেদ অভিযান চালাতে রাজউকের সদিচ্ছা নেই। উপরন্তু উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বাড়িমালিক থেকে উৎকোচ আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘রাজউকের অবস্থান কঠোর থাকলে কোনও ভবন নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ হতে পারে না।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও যেসব শর্ত মানার কথা তা পূরণ করা হয় না।’ তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে এখন পর্যন্ত একটিও পূর্ণাঙ্গ জরিপ করেনি সংস্থাটি। নগরীতে ৭২ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কথা বলা হয়ে থাকলেও এর মধ্যে ৭২টিরও পূর্ণাঙ্গ নাম ঠিকানা দিতে পারবে না রাজউক।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আইনের দিক থেকে কোনও ঘাটিত নেই। রাজউকের লোকজন একেবারেই অপর্যাপ্ত সেটাও না। এখন যথেষ্ট লোকবল রয়েছে রাজউকের। সদিচ্ছা থাকলে কম লোকবল দিয়েও ভালো কিছু করা যায়।’ আইন লঙ্ঘনকারীদের মধ্যে দু-একটাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে বাকিরা সচেতন হয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন। দেশসংবাদ

মন্তব্য