আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
ঘুরে দাঁড়াচ্ছে আবাসন খাত

ছয় মাস ধরে আবাসন ব্যবসায় ইতিবাচক ধারা ফিরতে শুরু করেছে
• প্রতিষ্ঠানভেদে ব্যবসা বেড়েছে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ।
• ব্যবসায়ীদের দাবি রয়েছে কয়েকটি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়টুকু বাদ দিলে ছয় মাস ধরে আবাসন ব্যবসায় ইতিবাচক ধারা ফিরতে শুরু করেছে। ক্রেতারা ফ্ল্যাটের খোঁজখবর নিচ্ছেন। বুকিং দিচ্ছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানভেদে ব্যবসা বেড়েছে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ।

আবাসন খাতের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানের ইতিবাচক ধারাটি অব্যাহত থাকলে চলতি বছর আবাসন খাত ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। সে জন্য অবশ্য ফ্ল্যাটের নিবন্ধন খরচ কমানোর পাশাপাশি স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের ব্যবস্থা ও সেকেন্ডারি বাজার গড়ে তুলতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। এসব ব্যবস্থা করা গেলে ফ্ল্যাট কিনতে সাধারণ মানুষ আরও বেশি আগ্রহী হবেন। সেটি হলেই দেশের আবাসন খাতে সুদিন ফিরবে। পাশাপাশি আবাসন খাতের সঙ্গে রড, সিমেন্ট, কেব্‌লস, পেইন্টস, টাইলস, স্যানিটারিসহ ২৬৯টি খাতের ব্যবসাও বাড়বে।

২০১২ সালে আবাসন খাতে মন্দা শুরু হয়। পরের বছর টানা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেটি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সে সময় ফ্ল্যাটের মূল্য কমিয়েও ক্রেতা খুঁজে পায়নি অনেক প্রতিষ্ঠান। কিস্তি দিতে না পারায় অনেক ফ্ল্যাটের ক্রেতা বুকিং বাতিলও করেছেন। সেই অস্থির সময় পার করে ২০১৬ সালের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও সংকট কাটেনি। তবে গত বছরের মাঝামাঝি সরকারি কর্মচারীদের ৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেওয়ার ঘোষণা আসে। তারপরই ব্যবসা বাড়তে থাকে।

এ বিষয়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহসভাপতি কামাল মাহমুদ  বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৫ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণার পর থেকে রেডি ফ্ল্যাটের চাহিদা বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে গত ছয় মাসে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ২০-২৫ শতাংশ বেড়েছে। তিনি বলেন, মাঝে দীর্ঘদিন বাজে সময় যাওয়ার কারণে ফ্ল্যাটের দাম সংশোধন হয়েছে। ফ্ল্যাটের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে চলে এসেছে। এতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন।

দেশের স্বনামধন্য আবাসন প্রতিষ্ঠানের একটি কনকর্ড। গত বছরের জুন থেকে ব্যবসা ভালো যাচ্ছে তাদের। এই সময়ে বেশ কয়েকটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেসব প্রকল্পের ফ্ল্যাট বুকিং নেওয়াও শুরু হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তারেকুল আলম গত বৃহস্পতিবার বলেন, সংসদ নির্বাচনের সময়টি বাদ দিলে গত ছয় মাসে ফ্ল্যাট বিক্রি ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। রড, সিমেন্টসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ফ্ল্যাটের দাম ৫-১০ শতাংশ বেড়েছে বলেও জানান তিনি।

আবাসন প্রতিষ্ঠান র‌্যাংগসের ব্যবসাও গত কয়েক মাসে বেড়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটির বিপণন বিভাগের উপব্যবস্থাপক সাফাকাত রহমান  বলেন, ‘আমাদের সারা বছরই কিছু না-কিছু ফ্ল্যাট বিক্রি হয়। তবে গত দু-তিন মাসে সেটি আরও বেড়েছে। সামনের দিনগুলোতে ব্যবসা আরও বাড়বে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।’

সাফাকাত রহমান আরও বলেন, গৃহঋণ নিয়ে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। ১ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গৃহঋণ দেয় না। তবে ভালো ফ্ল্যাট কিনতে চাইলে এই টাকায় হচ্ছে না। তা ছাড়া দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও পূর্বাচল প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি রাজউক। প্রকল্পটি শেষ হলে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নতুন প্রকল্প নিতে পারত। তাতে অনেক মানুষের জন্য আবাসন নিশ্চিত করা অনেকটা সহজ হতো। এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

আবাসন খাতের কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, রাজধানীতে একটি আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন নিতে গেলে ১৬টি সরকারি সংস্থার ছাড়পত্র নিতে হয়। প্রতিটি দপ্তরে ঘুরে একটি প্রকল্প অনুমোদনে এক থেকে দেড় বছর লেগে যায়। দীর্ঘদিন ধরে রাজউকে একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেল করার দাবি করে আসছে রিহ্যাব। মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার এ বিষয়ে বৈঠক হলেও এখনো কাজের কাজ কিছু হয়নি।

জানতে চাইলে রিহ্যাবের সহসভাপতি কামাল মাহমুদ বলেন, ‘ছয় বছর ধরে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের জন্য আমরা চেষ্টা করছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। প্রকল্প অনুমোদনের জন্য ১৬টি ছাড়পত্র নিতে বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে কয়েক বছর লেগে যায়। টাকাপয়সাও লাগে। তাতে করে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে, যা কিনা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়ে গিয়ে চাপে। কিন্তু ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হলে আবাসন ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ভোক্তারাও স্বস্তি পেতেন।’

এদিকে ছয় মাস ধরে ব্যবসা ভালো হলেও স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ না পেলে আবাসন খাত কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন রিহ্যাবের আরেক সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ৫-৭ শতাংশ সুদে ২০-২৫ বছরের জন্য গৃহঋণ পেলে সাধারণ মানুষ ভাড়ার টাকায় ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এমন সুবিধা আছে। তা ছাড়া সরকার তো বিভিন্ন খাতেই কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের আবাসন সমস্যা নিরসনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ দিতে পারে সরকার।

রিহ্যাবের সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া আরও বলেন, আবাসন খাতে সুদিন ফিরিয়ে আনতে হলে রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন ব্যয় ১৬ শতাংশ থেকে ৬-৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এটি হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমবে, অনেকেই ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন। সরকারের রাজস্বও বাড়বে। তিনি আরও বলেন, পুরোনো ফ্ল্যাটের বেচাকেনাকে উৎসাহিত করতে আবাসন খাতে সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে তোলা দরকার। সে জন্য সরকারকে একটি কাজ করতে হবে। সেটি হলো, পুরোনো ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন খরচ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। প্রথম আলো

মন্তব্য