আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
রাসায়নিক নীতিমালা, নিরাপদ আবাসন চান ব্যবসায়ীরাও

সম্পূর্ণ নিরাপদ আবাসন ও রাসায়নিক অবকাঠামোর নীতিমালা চায় পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সে সময় সরকারের টনক নড়লে হবে না। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কেমিক্যাল ব্যবসা নির্দিষ্ট অঞ্চলে বা রাসায়নিকপল্লীতে স্থানান্তরের দাবি জানায় তারা। তারা জানায়, আবাসনব্যবস্থা হতে হবে নিশ্চিত ও পরিকল্পিত। গতকাল শনিবার চুড়িহাট্টায় গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

সরেজমিনে চুড়িহাট্টার গলিতে ঢুকতেই কথা হয় নাসির আলী নামের এক ক্রোকারিজ ব্যবসায়ীর সঙ্গে। গত বুধবারের দুর্ঘটনায় তাঁর ব্যবসার কোনো ক্ষতি না হলেও মায়ের জন্য পানি আনতে গিয়ে অকালে মারা যান তাঁর ২৩ বছরের ছেলে ওয়াসি উদ্দিন মাহিদ। তিনি পুরান ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য আর আবাসনের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘অনিরাপদ গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের জন্য আমার ছেলে মারা গেল।’

নাসির উদ্দিন বলেন, ‘হোটেলগুলোতে নিরাপদ ও উন্নত মানের গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হোক। নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হলে এ ধরনের ঘটনাই ঘটবে।’ নিরাপদ আবাসনের জন্য সরকারকে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাড়িওয়ালা তখন আর কেমিক্যালওয়ালাদের বাড়ি ভাড়া দেবে না। ফ্ল্যাটবাড়ি ভাড়া দিয়ে তারা ভালোভাবে বেঁচে থাকবে। এ ছাড়া আমরা চাই না, যেখানে মানুষ তার পরিবারকে নিয়ে থাকে; এসব এলাকায় কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হোক।’

পুরান ঢাকা ব্যবসায়ী ঐক্য ফোরামের সভাপতি হাজি আব্দুস সালাম বলেন, পুরান ঢাকাবাসীর সমস্যা সমাধানে সরকারপ্রধান আন্তরিক হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে না। তিনি বলেন, ২০১০ সালে রাজধানীর নিমতলীর অগ্নিদুর্ঘটনায় নারী, শিশুসহ ১১৭ জন মারা যায়। পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালপল্লী সরানোর তোড়জোড় শুরু হলেও দু-এক বছরের মধ্যে তা থেমে যায়।

ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে রোহিতপুরের সোনকান্দায় ৬০ বিঘা জমি বরাদ্দ দেওয়ার সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তিও হয়। কিন্তু এরপর তা আর আলোর মুখ দেখেনি। পুরান ঢাকার জীবনমান উন্নয়নে যানজট নিরসন করার দাবি জানিয়ে সালাম বলেন, ‘পুরান ঢাকার ছোট ছোট গলিতে অনেক মানুষ, রিকশা, সাইকেল, ট্রাক ও ঠেলা চলে। আর এই যানজটের জন্য অনেক মানুষও মারা যায়। এর জীবন্ত সাক্ষী আমি। সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারায় আমার কোলে মানুষ মারা গেছে।’

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি মো. গোলাম মাওলা বলেন, নিমতলী ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ থাকার পরও শিল্প মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশন পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানান্তরের উদ্যোগ না নেওয়ায় গত বুধবার ফের পুরান ঢাকাবাসী মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। তবে আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী আবারও জোরালোভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, পুরান ঢাকায় কোনো কেমিক্যালের দোকান থাকবে না। তিনি বলেন, এই ব্যবসা এক দিনে গড়ে ওঠেনি। এই এলাকায় প্লাস্টিক ও কেমিক্যালের দোকান রয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুসারে দ্রুত পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের দোকান সরিয়ে নিতে হবে। তাঁর দাবি, পরিবেশবান্ধব উপায়ে কেরানীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীর পারে এসব দোকান দ্রুত স্থানান্তর করা হোক। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের জানমাল এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকেও সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, এখানে অলিগলিতে হোটেল-রেস্টুরেন্ট হয়েছে। এগুলোতে বড় বড় গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বলছে আগুনের চুলা। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড ডিফেন্সেরও কিছু দায়িত্ব আছে।

ব্যবসায়ী মো. আলাউদ্দিন মালিক বলেন, কেমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনকে কিছু জায়গা দেওয়ার কথা থাকলেও পরে সরকারের সেই উদ্যোগ থেমে যায়। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে রাস্তাঘাট বড় করতে হবে। আর কেমিক্যাল ব্যবসা সরিয়ে নিতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম রাখতে হবে। তিনি বলেন, সরকার পোশাক খাতের দিকে বেশি নজর দেওয়ার ফলে দুর্ঘটনা কমাতে পেরেছে, এখানেও পারবে। রাসায়নিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে দুর্ঘটনা বাড়বে। তাই পুরান ঢাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাসায়নিক নীতিমালা জরুরি। নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপত্তার মান নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানায়, কেমিক্যালের কারণে যে দুর্ঘটনার কথা বলা হচ্ছে, সেটা আসলে ঠিক না। দুর্ঘটনা ঘটেছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে। তবে সরকার হঠাৎ করে এই পুরনো ব্যবসা বন্ধ করে দিলে অনেককে পথে বসতে হবে। সব কিছু হতে হবে পরিকল্পনামাফিক। ব্যবসায়ীদের সুযোগ দিতে হবে, স্থান ঠিক করতে হবে কোথায় তারা ব্যবসা করবে।

ব্যবসায়ী ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। নিম্নমানের সিলিন্ডারই ঘটনার কারণ। আর সরকার চাইলেই তো ব্যবসা বন্ধ করতে পারে না। সঠিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে তবেই বন্ধ করতে হবে। নইলে তো আমরা পথে বসে যাব।’ কালের কণ্ঠ

মন্তব্য