আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধঃ বিএফআইইউ-এর উদ্যোগ এবং রিহ্যাব-এর ভূমিকা

মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন

মানিলন্ডারিং-এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কার্যকলাপ থেকে উদ্ভূত আয় বৈধ করার অপচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। এ অর্থ আবার বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে ব্যবহারের আশংকা সৃষ্টি করে। মানিলন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন আপাতদৃষ্টিতে সমার্থক বা সমগোষ্ঠীর অপরাধ মনে না হলেও উভয়ের মধ্যে গভীর স¤পর্ক বিদ্যমান।

মানিলন্ডারিং একটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে সমাজে অস্থিরতা, দুর্নীতি, ড্রাগব্যবসা, চোরাকারবারি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, অবৈধ অস্ত্রব্যবসা সংঘটিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। দেশীয় গন্ডি পেড়িয়ে এ জাতীয় অপরাধ এখন আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তি পেয়েছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং আর্থিক সেবা খাতের ক্রমবর্ধমান ব্যাপকতার কারণে আর্থিক খাতে সংগঠিত অপরাধ বর্তমানে অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছে।

Financial Action Taskforce (FATF) হচ্ছে একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা, যা মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী অনুসরনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে থাকে। FATF প্রণীত ৪০টি সুপারিশ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এ লক্ষ্যে অনুসরণীয় কার্যকর পন্থা হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া এ অঞ্চলে FATF স্টাইলের আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা Asia/Pacific Group on Money Laundering (APG) রয়েছে। বাংলাদেশ Asia/Pacific Group on Money Laundering (APG) -এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে দেশের কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

 

মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশ

বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে জোরদার কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশই প্রথম দক্ষিণ-এশীয় দেশ হিসেবে ২০০২ সালে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন প্রবর্তন করেছে। এ দায়িত্ব পরিপালনের জন্য ২০০২ সালের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগ গঠন করা হয়। পরবর্তীতে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে দেশের কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট গঠন করা হয়। এ ইউনিট থেকে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সাথে সমন্বয় সাধন, প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন, রিপোর্টিং এজেন্সীসমূহের জন্য পরিপালনীয় নির্দেশনা প্রদানসহ নিয়মিতভাবে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ইন্সুরেন্স প্রতিষ্ঠান, এনজিও, মানি চেঞ্জার, রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন রিপোর্টিং এজেন্সীতে অনসাইট ও অফসাইট পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়া জারিকৃত নির্দেশনাসমূহ পরিপালনে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ওয়ার্কশপ, প্রশিক্ষণ, সভা, সেমিনারের আয়োজন করা হয়। আন্তর্জাতিক মানদন্ডের সাথে সঙ্গতি রাখতে মানিলন্ডারিং আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন সর্বশেষ যথাক্রমে ২০১৫ সালে ও ২০১৩ সালে সংশোধন করা হয়। বাংলাদেশের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রমের বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবীক্ষণের লক্ষ্যে ৩য় পর্বের মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ কমপ্লায়েন্ট দেশের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

 

মানিলন্ডারিং ও এর ধাপসমূহ

 

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী, “মানিলন্ডারিং” অর্থ –

‘অ) নিম্নবর্ণিত উদ্দেশ্যে অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত সম্পত্তি জ্ঞাতসারে স্থানান্তর বা রূপান্তর বা হস্তান্তর ঃ

(১) অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ প্রকৃতি, উৎস, অবস্থান, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ গোপন বা ছদ্মাবৃত্ত করা; অথবা

(২) সম্পৃক্ত অপরাধ সংগঠনে জড়িত কোন ব্যক্তিকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ হইতে রক্ষার উদ্দেশ্যে সহায়তা করা;

(আ) বৈধ বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বা সম্পত্তি নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিদেশে পাচার করা;

(ই) জ্ঞাতসারে অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করিবার উদ্দেশ্যে উহার হস্তান্তর, বিদেশে প্রেরণ বা বিদেশ হইতে বাংলাদেশে প্রেরণ বা আনয়ন করা;

(ঈ) কোন আর্থিক লেনদেন এইরূপভাবে সম্পন্ন করা বা সম্পন্ন করিবার চেষ্টা করা যাহাতে এই আইনের অধীন উহা রিপোর্ট করিবার প্রয়োজন হইবে না;

(উ) সম্পৃক্ত অপরাধ সংঘটনে প্ররোচিত করা বা সহায়তা করিবার অভিপ্রায়ে কোন বৈধ বা অবৈধ সম্পত্তির রূপান্তর বা স্থানান্তর বা হস্তান্তর করা;

(ঊ) সম্পৃক্ত অপরাধ হইতে অর্জিত জানা সত্ত্বেও এই ধরণের সম্পত্তি গ্রহণ, দখলে নেওয়া বা ভোগ করা;

(্ঋ) এইরূপ কোন কার্য করা যাহার দ্বারা অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করা হয়;

(এ) উপরে বর্ণিত যে কোন অপরাধ সংঘটনে অংশগ্রহণ, সম্পৃক্ত থাকা, অপরাধ সংঘটনে ষড়যন্ত্র করা, সংঘটনের প্রচেষ্টা অথবা সহায়তা করা, প্ররোচিত করা বা পরামর্শ প্রদান করা;’

 

 

এ আইন অনুযায়ী, “সম্পৃক্ত অপরাধ (Predicate offence) অর্থ ‘নিম্নে উল্লিখিত অপরাধ, যাহা দেশে বা দেশের বাহিরে সংঘটনের মাধ্যমে অর্জিত কোন অর্থ বা সম্পদ লন্ডারিং করা বা করিবার চেষ্টা করা, যথা ঃ (১) দুর্নীতি ও ঘুষ; (২) মুদ্রা জালকরণ; (৩) দলিল দস্তাবেজ জালকরণ; (৪) চাঁদাবাজি; (৫) প্রতারণা; (৬) জালিয়াতি; (৭) অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা; (৮) অবৈধ মাদক ও নেশা জাতীয় দ্রব্যের ব্যবসা; (৯) চোরাই ও অন্যান্য দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা; (১০) অপহরণ, অবৈধভাবে আটকাইয়া রাখা ও পণবন্দী করা; (১১) খুন, মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি; (১২) নারী ও শিশু পাচার; (১৩) চোরাকারবার; (১৪) দেশী ও বিদেশী মুদ্রা পাচার; (১৫) চুরি বা ডাকাতি বা দস্যুতা বা জলদস্যুতা বা বিমান দস্যুতা; (১৬) মানব পাচার; (১৭) যৌতুক; (১৮) চোরাচালানী ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধ; (১৯) কর সংক্রান্ত অপরাধ; (২০) মেধাস্বত্ব লংঘন; (২১) সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থ যোগান; (২২) ভেজাল বা স্বত্ব লংঘন করে পণ্য উৎপাদন; (২৩) পরিবেশগত অপরাধ; (২৪) যৌন নিপীড়ন (২৫) পুঁজি বাজার সম্পর্কিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে তাহার কাজে লাগাইয়া শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে বাজার সুবিধা গ্রহণ ও ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার লক্ষ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা (২৬) সংঘবদ্ধ অপরাধ বা সংঘবদ্ধ অপরাধী দলে অংশগ্রহণ; (২৭) ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায়; এবং (২৮) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কর্তৃক সরকারের অনুমোদনক্রমে গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষিত অন্য যে কোন সম্পৃক্ত অপরাধ’।

 

এছাড়া এ আইন অনুযায়ী “রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা” হচ্ছে- ‘(অ) ব্যাংক; (আ) আর্থিক প্রতিষ্ঠান; (ই) বীমাকারী; (ঈ) মানি চেঞ্জার; (উ) অর্থ অথবা অর্থমূল্য প্রেরণকারী বা স্থানান্তরকারী যে কোন কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠান; (ঊ) বাংলাদেশ ব্যাংকের অনমতিক্রমে ব্যবসা পরিচালনাকারী অন্য কোন  প্রতিষ্ঠান; (ঋ) (১) স্টক ডিলার ও স্টক ব্রোকার, (২) পোর্টফোলিও ম্যানেজার ও মার্চেন্ট ব্যাংকার, (৩) সিকিউরিটি কাস্টডিয়ান, (৪) সম্পদ ব্যবস্থাপক; (এ) (১) অলাভজনক সংস্থা/প্রতিষ্ঠান; (২) বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা  (৩) সমবায় সমিতি; (ঐ) রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার; (ও) মূল্যবান ধাতু বা পাথরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান; (ঔ) ট্রাস্ট ও কোম্পানী সেবা প্রদানকারী;  আইনজীবী, নোটারী, অন্যান্য আইন পেশাজীবী এবং একাউন্টেন্ট; সরকারের অনমোদনক্রমে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কর্তৃক, সময়ে সময়ে, বিজ্ঞপ্তি জারীর মাধ্যমে ঘোষিত অন্য কোন প্রতিষ্ঠান’।

 

সাধারনতঃ তিনটি পর্যায়ে মানিলন্ডারিং করা হয়। এগুলো হলো প্লেসমেন্ট, লেয়ারিং এবং ইন্টেগ্রেশন।

 

প্লেসমেন্টঃ এ পর্যায়ে অবৈধ অর্থ সরাসরি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করানো হয়। সাধারণত ব্যাংক/ইন্সুরেন্স/রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানে টাকা জমা দেওয়ার মাধ্যমে এটি শুরু হয়।

লেয়ারিংঃ এ পর্যায়ে অর্থকে বিভিন্ন পন্থায় এক খাত থেকে আরেক খাতে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে টাকা এক হিসাব থেকে আরেক হিসাবে, এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকের হিসাবে, এক খাত থেকে অন্য খাতে, এমনকি এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠিয়ে লেনদেনের একটা জটিল অবস্থা তৈরি করা হয়, যাতে লেনদেনগুলো অনুসরণ করা না যায়। অর্থাৎ কোনো লেনদেনের ধারাবাহিকতা নির্ধারণ করা যায় না। ফলে মূল উৎসটিও বের করা সম্ভব হয় না।

ইন্টিগ্রেশনঃ এ পর্যায়ে অর্থ আবারও মূল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। তবে এবার অবৈধ অর্থ হিসেবে নয়। বৈধ অর্থ হিসেবেই এ টাকা অর্থনীতিতে প্রবেশ করে। এক্ষেত্রে আগের প্রমাণ না থাকলে এই অর্থের উৎস বের করা প্রায় অসম্ভব। সাধারণত ব্যবসায় লাভ হিসাবে ব্যাংকে এ অর্থ জমা করা হয়।

 

মানিলন্ডারিং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-এর উদ্যোগ

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন দমনে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আলোচ্য কার্যক্রম প্রশংসিত হয়েছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০০২ জারি হবার পর এর বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগ’ ও পরবর্তী সময়ে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ২৪ ধারা অনুযায়ী গঠিত ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ আলোচ্য আইনের সার্বিক পরিপালনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কর্তৃক গৃহীত উদ্যোগগুলো হলো :

ক্স            আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা;

ক্স            সকল রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থাকে সার্কুলার ইস্যু করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান;

ক্স            এন্টি মানিলন্ডারিং গাইডেন্স নোট প্রণয়ন;

ক্স            সন্দেহজনক লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রয়োজ্য ক্ষেত্রে এ্যানালাইসিস রিপোর্ট আকারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সরবরাহ;

ক্স            রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান;

ক্স            জনসচেতনতা সৃষ্টি;

ক্স            আন্তঃএজেন্সী সহযোগিতা।

 

রিয়েল এস্টেট সেক্টরে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঝুঁকি

অবৈধ  অর্থ উর্পাজনকারী তাদের অবৈধভাবে উর্পাজিত অর্থকে বৈধ  রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টায় বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে থাকে। এ লক্ষ্যে তাদের প্রাথমিক টার্গেট থাকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমুহকে ব্যবহার করা। যখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমুহ অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করে বা সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্ট চায়, তখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমুহে অবৈধ  অর্থ জমা করা অনেকক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। তাছাড়া মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঝুঁকি মোকাবেলায় বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমুহের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকক্ষেত্রে  মানিলন্ডারাররা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমুহে অবৈধ অর্থ জমা করাকে ঝুঁকিপূর্ন মনে করে; কেননা এক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃক সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট দাখিলের সম্ভাবনা থেকে যায়। কাজেই তারা বিকল্প পথ খুঁজতে থাকে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অবৈধভাবে উর্পাজিত অর্থকে বৈধ  রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টায় রিয়েল এষ্টেট খাতকে একটি অন্যতম বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক  ন্যাশনাল রিস্ক  এসেসমেন্ট রির্পোটে মানিলন্ডারিং-এর ক্ষেত্রে রিয়েল এষ্টেট খাতকে উচ্চ ঝুঁকি সম্পন্ন খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে  অর্থাৎ এদেশেও রিয়েল এষ্টেট খাতে মানিলন্ডারিং এর উচ্চ ঝুঁকি বিদ্যমান । রিয়েল এষ্টেট বেচা কেনায় অর্থের উৎস সম্পর্কে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন  প্রশ্ন করা হয় না এবং এ সম্পর্কিত কোন তথ্য ক্রেতা জানাতে বাধ্যবাধকতা অনুভব করে না বিধায় এ খাতকে মানিলন্ডারিং সংঘঠনে নিরাপদ এভিনিউ হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।  মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইন দু’টিরর বিধিবিধান মেনে না চললে আইনগত জটিলতা সৃষ্টি, ব্যবসায়িক সুনাম নষ্ট হওয়াসহ জরিমানা ও ব্যবসায়িক লাইসেন্স হারনোর ঝুঁকি রয়েছে।

মানিলন্ডারিং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় রিয়েল এস্টেট সেক্টরের করণীয়

মানিলন্ডারিং প্রক্রিয়া শুরু হয় অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ প্লেসমেন্টের মাধ্যমে। প্লেসমেন্টের একটি অন্যতম খাত হচ্ছে নগদ অর্থের মাধ্যমে রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানসমূহ হতে প্লট বা ফ্লাট ক্রয় করা। এজন্য মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ২(ব)(ঐ) ও (ভ) এবং সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯ (সংশোধনী ২০১৩) এর ২(২০)(ঐ) ধারা মোতাবেক রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ২৫ ধারায় ও সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯ (সংশোধনী ২০১৩ সহ) এর ১৬ ধারায় রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থার দায়-দায়িত্ব বর্ণিত আছে। মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের করণীয় বিষয়ে এ ইউনিটের ২৯/১০/২০১৩ তারিখের বিএফআইইউ সাকুর্লার নং ৮-এর মাধ্যমে উল্লিখিত আইনদ্বয়ের বিধানাবলী পরিপালন সংক্রান্ত অনুসরণীয় বিষয়াবলীর উপর ‘গাইডলাইন্স ফর ডিএনএফবিপি’ জারী করা হয়েছে। এছাড়া পরবর্তীতে ০৯/০৭/২০১৫ তারিখে বিএফআইইউ সাকুর্লার নং ১৩ জারী করা হয়েছে, যাতে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে রিয়েল এস্টেট সেক্টরের করণীয় নির্দেশনাসমূহ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এর উদ্যোগে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে কর্মরত নির্বাহী/কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২, সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯ এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানসমূহের অন্যতম করণীয়সমূহ নি¤œরূপ :

ক্স            মানিলন্ডারিং এবং সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদন্ড, দেশে বিদ্যমান আইন, বিধিমালা ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর নির্দেশনাবলীর সমন্বয়ে প্রতিটি  রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব  একটি  নীতিমালা থাকবে।

ক্স            প্রতিটি রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বা উর্ধ্বতন/অভিজ্ঞ  কোন কর্মকর্তাকে পরিপালন কর্মকর্তা হিসেবে মনোনীত  করবে।  বিদ্যমান আইন, বিধিমালা ও নির্দেশনার আলোকে প্রতিষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা  পরিপালনের  জন্য  উক্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। পাশাপাশি উক্ত কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানের মনিটরিং প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করবেন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট করবেন।

ক্স            গ্রাহক নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিটি রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান-এর একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। উক্ত নীতিমালায় অন্যান্য বিষয়ের সাথে আবশ্যিকভাবে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ অন্তর্ভূক্ত থাকবে ঃ

(১)  বেনামী বা ছদ্মনামের কোন গ্রাহকের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না।

(২)  জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন রেজুলশনের আওতায় সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসীকার্যে অর্থায়নে জড়িত সন্দেহে তালিকাভূক্ত কোন ব্যক্তি বা সত্ত্বা এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তালিকাভূক্ত কোন ব্যক্তি বা নিষিদ্ধ ঘোষিত সত্ত্বার সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না।

ক্স            গ্রাহক পরিচিতির যথাযথ তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং উক্ত তথ্যের যাচাই প্রক্রিয়া সম্পাদন করতে হবে।

ক্স            গ্রাহকের অসহযোগিতাপূর্ণ আচরণের কারণে অথবা গ্রাহকের বিষয়ে সংগৃহীত তথ্য/উপাত্ত নির্ভরযোগ্য না হলে অর্থাৎ গ্রাহক পরিচিতির সন্তোষজনক তথ্য প্রাপ্তি এবং তা যাচাই করা সম্ভব না হলে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানসমূহ এরূপ গ্রাহকের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করবে না  বা তাদের সাথে স্থাপিত সম্পর্ক বন্ধ করবে এবং  ক্ষেত্রমত তাদের  বিষয়ে সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট দাখিল করবে।

ক্স            রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানসমূহ যখন  কোন গ্রাহকের সাথে  ১ (এক) দিনে  ১০(দশ) লক্ষ টাকা বা তদুর্ধ্ব পরিমাণ নগদ অর্থের লেনদেন করবে, তখন বিএফআইইউ বরাবরে নগদ লেনদেন রিপোর্ট দাখিল করবে। নগদ লেনদেন রিপোর্ট-এর তথ্যাদি বিএফআইইউ-এ দাখিলের মাস হতে কমপক্ষে ৫(পাচ) বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করবে।

ক্স            জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কোন রেজুলশনের আওতায় বা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তালিকাভূক্ত বা নিষিদ্ধ ঘোষিত কোন ব্যক্তি বা সত্তার নামে অথবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন/স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তি বা সত্ত্বার সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক  রয়েছে কিনা বা কোন লেনদেন সংঘটিত হয়েছে কিনা তা চিহ্নিত করার জন্য রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানসমূহ নিয়মিত লেনদেন মনিটর করবে এবং প্রয়োজনে লেনদেন পর্যালোচনা করবে। তালিকাভূক্ত বা নিষিদ্ধ ঘোষিত কোন ব্যক্তি বা সত্ত্বা অথবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন/স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তি বা সত্তার  সাথে  ব্যবসায়িক সম্পর্ক  বা  লেনদেন চিহ্নিত হওয়ার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান অবিলম্বে এ বিষয়ক বিস্তারিত তথ্য বিএফআইইউ বরাবরে প্রেরণ করবে।

ক্স            মানিলন্ডারিং, সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন ও ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিস্তারে অর্থায়নের ঝুঁকি নিরসনের লক্ষ্যে প্রতিটি রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান তাদের বিভিন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যথাযথ যাচাই প্রক্রিয়া (ঝপৎববহরহম গবপযধহরংস) অনুসরণ করবে, যাতে কোন স্তরের কর্মকর্তার মাধ্যমে তারা এ ধরণের ঝুঁকির সম্মুখীন না হয়।

ক্স            মানিলন্ডারিং, সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন ও ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিস্তারে অর্থায়ন প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রত্যেক রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান তাদের সকল কর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক মানদন্ড, দেশে বিদ্যমান আইন,  বিধিমালা ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর নির্দেশনা যথাযথ পরিপালন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করবে।

ক্স            রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানসমূহ গ্রাহকের পরিচিতির তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই প্রক্রিয়া সম্পাদনকালে গৃহীত সকল তথ্য ও দলিলাদি এবং লেনদেন সংক্রান্ত  তথ্য ও দলিলাদি বিএফআইইউ বা অন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের চাহিদা বা নির্দেশনা মোতাবেক সরবরাহ করবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে রিয়েল এস্টেট সেক্টরের অবদান অনস্বীকার্য। রিয়েল এস্টেট এন্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) দেশে আবাসন শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করে আসছে। একটি ব্যবসায়িক এসোসিয়েশন হওয়া সত্ত্বেও মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে রিহ্যাব বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর সাথে একযোগে কাজ করছে। মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বিষয়ক গাইডলাইন্স প্রণয়ণকালে ফোকাস গ্রুপের সদস্য হিসেবে রিহ্যাব মনোনীত প্রতিনিধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের কারিগরী সহায়তার আওতায় মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পরিচালিত সেশনসমূহে রিহ্যাব-এর অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। সর্বশেষ মিউচ্যুয়াল ইভাল্যুয়েশনে সফলতার পিছনে ফেইস টু ফেইস পর্বে রিহ্যাব-এর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। রিহ্যাব-এর নের্তৃত্বে সকল রিয়েল এস্টেট এ্যান্ড হাউজিং প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এদেশের রিয়েল এস্টেট সেক্টরে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে অচিরেই একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভবপর হবে মর্মে আশা করা যায়।

 

লেখক

॥ ভাস্কর পোদ্দার ॥

যুগ্মপরিচালক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট।

 

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন