আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
নকশা পরিবর্তন করে সরু সিঁড়ি একাধিক ফ্লোরে

প্রায় তিন হাজার বহুতল ভবনের নির্মাণকাঠামো ও ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সরেজমিন পরিদর্শন করছে। মঙ্গলবার রাজউকের ২৪টি দল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বেশকিছু বহুতল ভবন পরিদর্শন করে।

এ সময় ১০ তলা ও তার অধিক তলাবিশিষ্ট ভবন পরিদর্শন করা হয়। কিছু কিছু ভবন সব নিয়ম-কানুন অনুসরণে নির্মিত হলেও অনেক ভবনেই রাজউক অনুমোদিত নকশা অবজ্ঞা করা হয়েছে। পরিদর্শক দল জানতে পেরেছে, অনেক ক্ষেত্রে বহুতল ভবনের নকশা পবিরর্তন করে সরু সিঁড়ি এবং অতিরিক্ত এক বা একাধিক ফ্লোর নির্মাণ করা হয়েছে।

ধানমণ্ডি এলাকায় রাজউকের জোন-৫ এর পরিচালক শাহ আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে দেখা যায়, ধানমণ্ডির রোড ৯/৩ এর প্লট-৪৬-এ রূপায়ন জেআর প্লাজায় (রূপায়ন হাউজিং) অফিস, রেস্টুরেন্ট ও ব্যাংক রয়েছে।

১৩ তলাবিশিষ্ট অনাবাসিক ভবনের ১৪ তলার ছাদের ওপর কমিউনিটি হল নির্মাণ করা হয়েছে। রাজউক বলছে, নকশাবহির্ভূতভাবে কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা থাকলেও তা সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার অনুপযোগী। একই সঙ্গে ভবনের বেজমেন্টে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকার কথা, সেখানে অতিরিক্ত সিঁড়ি ব্যবহার করে রেস্টুরেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে।

ধানমণ্ডির সাতমসজিদ রোডের পাশে নির্মিত বি-স্কয়ার বহুতল ভবনের বেজমেন্টে লিফটের দরজা বন্ধ করে ফায়ার স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের ১০ তলায় গুহা রেস্টুরেন্টে কংক্রিটের অতিরিক্ত দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। এটি খবুই ঝুঁকিপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে রাজউকের জোন-৫ এর পরিচালক মো. শাহ আলম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, অভিযানে আমরা পুরোপুরি সহযোগিতা পাচ্ছি এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এর ফলে ভবন মালিকরা আরও সতর্ক হচ্ছেন। প্রয়োজনে ভবনের অগ্নিনির্বাপণ সুবিধা ও সরঞ্জাম পুনর্নির্মাণ করছেন। তিনি আরও বলেন, আগামীকাল থেকে সকাল ৯টায় আমরা অভিযান শুরু করব এবং প্রয়োজনে বন্ধের দিনও অভিযান চালানো হবে।

বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউতে বহুতল ভবনের ক্রুটি-বিচ্যুতি যাচাই টিমের নেতৃত্ব দেন রাজউকের জোন-৪ এর পরিচালক মামুন মিয়া। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বেশির ভাগ বহুতল ভবনই নিয়ম-কানুন না মেনে নির্মাণ করেছে। যেখানে লিফট থাকার কথা, সেখানে সেসব ঠিকঠাকমতো পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করে রাজউকের একজন পরিচালক বলেন, রাজউকের দলগুলো কোনো একটি ভবনে গিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভবনের নকশা চেয়ে নিচ্ছেন। এরপর নকশার সঙ্গে বাস্তবে অমিল আছে কিনা সেটা পর্যবেক্ষণ করছেন। এ জন্য প্রথমে তারা ভবনটির ছাদে উঠছেন। নকশা অনুযায়ী ছাদ মাপা হচ্ছে। এরপর প্রতিটি তলায় যাচ্ছেন এবং দেখছেন যেভাবে ভবনটি ব্যবহার হওয়ার কথা সেটা হচ্ছে কিনা। যেসব অগ্নিনির্বাপক সামগ্রী রাখার কথা সেগুলো আছে কিনা।

নিয়মের ব্যত্যয় থাকলে ভবন মালিককে নিজ উদ্যোগে ছোটখাটো ত্রুটিগুলো সংশোধন করতে বলছেন এবং এ জন্য কিছু সময় দিচ্ছেন। বড় ধরনের ত্রুটিগুলো পরিদর্শক দল টুকে নিচ্ছেন।

পরিদর্শক দলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, একটি ভবনের সবকিছু দেখতে বেশ সময় ব্যয় হচ্ছে। প্রতিদিন একেকটি পরিদর্শক দল ৪-৫টার বেশি ভবন পরিদর্শন করতে পারছেন না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিদর্শক দলগুলো কাজ করছে।

রাজউকের জোন-৮ এর পরিচালক একেএম মকসুদুল আরেফিনের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার ১৪টি ভবন পরিদর্শন করা হয়। এ সময় ভবনের নকশা যাচাই করা হয়। যেসব ভবনের ক্রুটি-বিচ্যুতি ও অগ্নিঝুঁকি রয়েছে সেসব কর্তৃপক্ষকে তারা জানান।

রাজধানীর ৯৯ ভাগ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ : অগ্নিব্যবস্থাপনার দিক দিয়ে রাজধানী ঢাকার ৯৯ ভাগ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। অর্ধেকের বেশি ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সালাউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের পর রাজধানীজুড়ে ভবনগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়টি জোরালোভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সোমবার থেকে ফায়ার সার্ভিসের পৃথক টিম রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ভবনগুলো পরিদর্শন শুরু করেছে। দু’দিনের পরিদর্শনে এমন চিত্র উঠে এসেছে বলে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা সালাউদ্দিন আহমেদ জানান।

ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিব্যবস্থাপনা পরিদর্শক টিমগুলোর সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, মঙ্গলবার আমাদের সাতটি টিম গুলশান, বনানী ও পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকার ভবন পরিদর্শন করে। এর আগেও অনেক ভবন পরিদর্শন করা হয়েছে।

তখন ভবনগুলোর কর্তৃপক্ষকে অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদি রাখার পরামর্শ দেয়া হলেও কেউই তা তোয়াক্কা করেনি। এ কারণে প্রতিনিয়ত অগ্নিদুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। মাঝে মধ্যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু লোক হতাহত হয়েছে। তিনি জানান, ফায়ার সার্ভিসের জনবল খুবই কম।

এ জনবল দিয়ে যতটুকু সম্ভব মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এবার ভবন পরিদর্শনে সদর দফতর ছাড়াও বিভিন্ন ফায়ার স্টেশনের কর্তকর্তাদেরও সংযুক্ত করা হয়েছে। কোনো কোনো ভবনের সামনে ‘ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ’ উল্লেখ করে সাইনবোর্ডও টানিয়ে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া রেডমার্ক করে আসা হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মোস্তফা মহসিন জানান, সোমবার রাজধানীর সদরঘাটে ১০৬টি মার্কেট-শপিংমল পরিদর্শন করা হয়েছে। এসবের মধ্যে ৫৪টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাকিগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। সদরঘাট এলাকার ৭৭টি বহুতল ভবনও অগ্নিনির্বাপণের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তিনি জানান, ইস্ট বেঙ্গল সুপার মার্কেটের সামনে ‘অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ’ চিহ্নিত করে ব্যানার টানানো হয়েছে। মার্কেট কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সুবিধা সংযুক্ত করলে ব্যানারটি সরানো হবে। যুগান্তর

শেয়ার করুন