আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
ঘোষণা
আবাসন সম্পর্কিত যেকোনো নিউজ পাঠাতে পারেন আমাদের এই মেইলে- abasonbarta2016@gmail.com
পুরান ঢাকাকে নতুন ঢাকা করতে চায় রাজউক

পুনঃউন্নয়নের (আরবান রি-ডেভেলপমেন্ট) মাধ্যমে জরাজীর্ণ পুরান ঢাকাকে মডেল শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ওই এলাকার সব পুরনো ভবন ভেঙে নতুন করে গড়ে তুলবে সংস্থাটি। এজন্য ৭ সেক্টরে ভাগ করেই উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে রাজউক।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরু গলি, অপ্রশস্ত সড়ক আর জরাজীর্ণ ভবনের পরিবর্তে আধুনিক মডেল শহর হবে পুরান ঢাকা। ইতোমধ্যে সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল ওই এলাকা পরিদর্শন শেষে পুনঃউন্নয়নের খসড়া নীতিমালা প্রনয়ণ করেছেন। নীতিমালাটি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করে মে মাসে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

জানা গেছে, পুনঃউন্নয়নের অংশ হিসেবে পুরান ঢাকার একাধিক জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে নির্দিষ্ট জায়গায় বহুতল ভবন গড়ে তোলা হবে। জরাজীর্ণ ভবনের মালিকরা জমির সংখ্যানুপাতিক হারে নতুন ভবন ব্যবহার করতে পারবেন। এতে পুরান ঢাকায় একদিকে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে ভূমির উল্লম্ব (উপরের দিকে বৃদ্ধি) ব্যবহারের ফলে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা তৈরি হবে। এছাড়া বাড়ানো হবে নাগরিক সুবিধা সম্বলিত প্রশস্ত রাস্তা। সেই সঙ্গে ওই এলাকায় যেসব হেরিটেজ বা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রয়েছে সেগুলোও আধুনিকায়ন করে সংরক্ষণ করা হবে।
বিজ্ঞাপন

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভারতসহ বিশ্বের বহু অনুপযোগী ঘিঞ্জি শহরকে পুনঃউন্নয়নের মাধ্যমে বসযোগ্য এবং দৃষ্টিনন্দন শহরে পরিণত করা হয়েছে। সে তুলনায় পুনঃউন্নয়নের মাধ্যমে শহরকে বাসযোগ্য করার বিষয়টি বাংলাদেশে এটাই প্রথম হবে। তাই যদি বাস্তবায়ন সম্ভব হলে এটি ভালো উদ্যোগ।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে শঙ্কা জানিয়ে তারা বলছেন, যাদের ঘিরে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে, সেসব জমি কিংবা বাড়ির মালিকদের নিয়েই সৃষ্টি হবে নানা জটিলতা। তারা সহজে বিষয়টি নিতে চাইবে না। এর আগেও একাধিক ল্যান্ড রি-ডেভেপলমেন্ট ফর্মুলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাড়ি ও জমির মালিকরা প্রকল্পে সম্পৃক্ত হয়নি। তাই পুনঃউন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে রাজউককে ওই এলাকার জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে বলেও মনে করেন পরিকল্পনাবিদরা।

রাজউক সূত্র জানায়, চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার রিপোর্টে উঠে আসে, সরু রাস্তার কারণে যথাসময় ফায়ার সার্ভিস পৌঁছাতে পারেনি ঘটনাস্থলে। যে কারণে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। আর এর মূলে ছিল অপরিকল্পিত নগরায়ন। তাই এ থেকে উত্তরণে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজউক বংশাল ও হাজারীবাগের ট্যানারি এলাকাসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নগর পুনঃউন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের জন্য একটি অফিস আদেশ জারি করে। আদেশে আরবান রি-ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

এরপর কমিটির সদস্যরা পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে একটি খসড়া নীতিমালা ও দশটি সুপারিশ প্রণয়ন করে। খসড়া নীতিমালায় কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত, স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ, ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (২০১৬-২০৩৫) প্রকল্পের সার্ভে ডাটাবেজের ভিত্তিতে পুরান ঢাকাকে সম্ভাব্য সাতটি সেক্টরে বিভক্ত করেন।

সেক্টরগুলো ইসলামবাগের প্রায় ১৪.৯৪ একর জমি, চকবাজারে প্রায় ১.৪৭৪ একর জমি, মৌলভীবাজারে ০.৬০ একর জমি, বংশালে প্রায় ১২.১ একর জমি, হাজারীবাগে প্রায় ১১১.৩ একর জমি, কামরাঙ্গীরচরে প্রায় ৩৩.৭৬৩ একর জমি এবং লালবাগে প্রায় ৩২.৭২ একর জমি নিয়ে হবে। এসব এলাকা সেক্টর অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে পুনঃউন্নয়ন করতে খসড়া নীতিমালা তৈরি করে কমিটি।

এসব সেক্টরগুলোতে পুনঃউন্নয়নে ১০টি সুপারিশও করে কমিটি।

রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রকল্পের পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘পুরান ঢাকার পুনঃউন্নয়ন করতে প্রণীত খসড়া নীতিমালা ইতোমধ্যে বুয়েট ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়ছে। তারা এটি পর্যালোচনা করে খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করলেই আগামী মে মাসেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপরই চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পেলে হয়তো এ বছরের শেষদিকে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হবে।’

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আমরা তাদের খসড়া নীতিমালাটি পেয়েছি। সেটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পর্যালোচনা শেষ না করে এখনই এ প্রকল্প সম্পর্কে তেমন কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না। তবে মনে হচ্ছে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শহরের জন্য ভালো হবে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিবও একই কথা বলেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘নগর পুনঃউন্নয়ন নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে বিশ্বের বহু ঘিঞ্জি শহর আধুনিক ও বসবাসযোগ্য শহরে পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু এটি বাস্তবায়নে অবশ্যই পুরান ঢাকাবাসীর আস্থা অর্জন করতে হবে। অন্যথায় তা সম্ভব হবে না।’

রাজউকের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান বলেন, ‘পুরাতন ও জরাজীর্ণ ভবন, ফুটপাতবিহীন ও সংকীর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত আবাসন সমস্যা, অপর্যাপ্ত আলো বাতাস ও অতি ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে আমরা জনগণকে বাসযোগ্য শহর উপহার দিতে চাই। তাই পুনঃউন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পুরান ঢাকার সাতটি সম্ভাব্য স্থানে আমরা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’

প্রকল্প বাস্তবায়নে জনগণকে উব্ধুদ্ধ করতে আমরা এলাকাভিত্তিক সভা-সেমিনার করছি। জনগণ সাড়া দিচ্ছে। এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যদি এটিকে যাচাইবাছাই করে অনুমোদন করে তাহলে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হবে বলেও জানান তিনি।নতুনসময়