আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় টেকসই আবাসন

বাংলাদেশ এমন এক ভৌগোলিক সীমারেখায় অবস্থিত, যার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হওয়া একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব প্রাকৃতিকুর্যোগের মধ্যে রয়েছে কালবৈশাখী ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো; এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয় জলোচ্ছাস ও বন্যা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর বহু মানুষ মারা যায়, সেই সঙ্গে শের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।

কিন্তু আমরা যদি উন্নত দেশের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় ঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও প্রাণহানির সংখ্যা বাংলাশের তুলনায় খুবই কম। এর প্রধান কারণ তাদের শক্তিশালী আবাসন ব্যবস্থা ও দুর্যোগপরবর্তী দ্রুত পক্ষেপ।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিকট অতীতের প্রাকৃতিক দুর্যোগের খতিয়ানটা দেখে নেওয়া যাক। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৬ জন প্রাণ হারায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১ কোটি ৫৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪৯ মানুষ। মোট ক্ষতির পরিমাণ ১.৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এরপর ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে ৪ হাজার ২৩৪ জন প্রাণ হারায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৮৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪১ জন এবং মোট ক্ষতির পরিমাণ ২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯ সালে আইলার আঘাতে ১৯০ জন প্রাণ হারায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৩৯ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ জন; মোট ক্ষতি ২৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (সূত্র: এডিআরসি)।

২০১৬ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড রোয়ানুতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৫ লাখ মানুষ, ধ্বংস হয় ৮০ হাজার বাড়ি-ঘর এবং মারা যায় ২৭ জন। সরকার যদিও ৫ লাখ মানুষকে ৩,৫০০ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় দিয়েছিল (সূত্র : এডিআরসি)।
এ ছাড়া ২০১৭ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় মোরা’য় প্রাথমিক হিসাবে ২ লাখ ৮৬ হাজার ২৪৫ মানুষ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় (সূত্র : কালের কণ্ঠ)।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে। এসব সত্ত্বেও শের উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো, যেমন-যোগাযোগ, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে। ১৯৭১ সালে মাথাপিছু জিডিপি ছিল ১৩১.৭৭ মার্কিন ডলার ও প্রবৃদি ছিল ৫.৪৮ (সূত্র : ইনডেক্সমুন্ডি); যা বর্তমানে জিডিপি ১,৪৬৬ মার্কিন ডলার এবং প্রবৃদি ৭.২ (সূত্র : ডেইলি স্টার, ৬ এপ্রিল, ২০১৬)। এটা দৃশ্যম্যান যে শে উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে।

কিন্তু উন্নয়ন হলেও দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের প্রাণহানি ঘটে চলেছে। প্রতি বছর প্রাকৃতিকুর্যোগে মৃত্যুর খবর বিভিন্ন পত্রিকায় বা টিভি চ্যানেলে বড় শিরোনামেই প্রকাশিত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের পাশে সরকার গিয়ে দাঁড়ায়ও; সেইসঙ্গে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ত্রাণ হিসেবে চাল, গম, আটা, পোশাক কিংবা নগদ অর্থ প্রদান করে। কেউ কেউ টিন বা টিনের ঘরও পান। কিন্তু পরের বছর নতুন ঝড় এসে সেগুলো আবার লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায়। আবার ঝড়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। এভাবেই চলতে থাকে বছরের পর বছর। এটা প্রতীয়মান যে ঝড় মোকাবেলায় টেকসই বাড়ি-ঘরের অভাবও মানুষ মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও উন্নত শেগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় খুব কম। এর প্রধান কারণ শতভাগ বাড়ি পাকা ও ঝড়ের পরে দ্রুত পক্ষেপ। আগামী দিনে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত দেশ, সে প্রচেষ্টাকে সমুন্নত রাখতে হলে এখন থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি ঘটে গ্রামাঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকায়। শহরে প্রাণহানি খুব কম। কারণ শহরের ঘরবাড়ি টেকসই ও ইটের তৈরি; অন্যকে গ্রামে এখনও অনেক কাঁচা ঘর বা টিনের ঘর রয়েছে।

উল্লেখ্য, ৭৫ ভাগ মানুষ গ্রামে আর ২৫ ভাগ মানুষ শহরে বাস করে। এটা প্রতীয়মান যে স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য। এক্ষেত্রে বাংলাশে ৩০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। পরিকল্পনার মধ্যে থাকতে পারে-

প্রথমত, পুরো দেশকে তিন ভাগে ভাগ করতে হবে। যেমন- ১) উচ্চ ঝুঁকি এলাকা ২) মধ্যম ঝুঁকি এলাকা ও ৩) কম ঝুঁকি এলাকা।

দ্বিতীয়ত, সমস্ত উচ্চ ঝুঁকি, মধ্যম ঝুঁকি ও কম ঝুঁকি এলাকার মানুষদেরকে চার ভাগে ভাগ করতে হবে। যথা- ১) অতি গরিব ২) গরিব ৩) মধ্যবিত্ত ও ৪) উচ্চবিত্ত।

তৃতীয়ত, প্রথম ১৫ বছর সকল উচ্চ ঝুঁকি এলাকার মানুষের জন্য স্থায়ী আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। সরকারি বা সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে এটি করা যেতে পারে। এটি বাস্তবায়নের জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে-

১. সকল অতি গরিব মানুষের জন্য একতলা বিশিষ্ট পাকা বাড়ি তৈরি করা। একটি লিখিত চুক্তির মাধ্যমে ওই মানুষগুলো প্রতিমাসে কিস্তি দেবে আগামী ৩০ বছর পর্যন্ত (যেমন- ২০০০ টাকা মাসিক কিস্তি দিলে ৩০ বছরে দাঁড়ায় ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা)।

২. যারা মধ্যবিত্ত তারা টেকসই আবাসনের জন্য ৫০ ভাগ টাকা নিজেদের তহবিল থেকে এবং বাকি ৫০ ভাগ সরকার বা যৌথ কোম্পানি দিবে। একটি লিখিত চুক্তির মাধ্যমে ওই মানুষগুলো প্রতিমাসে কিস্তি দেবে ১৫ বছর পর্যন্ত (মাসিক দুই হাজার টাকা কিস্তি লে ১৫ বছরে দাঁড়ায় তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা)।

৩) উচ্চবিত্ত মানুষগুলো বাধ্যতামূলক নিজেদের অর্থায়নে টেকসই আবাসন তৈরি করবে।

পরে ১০ বছর একই প্রকল্প ও পদক্ষেপ নেওয়া হবে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জন্য। শেষ ৫ বছরে ঠিক একই ভাবে প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জন্য।

এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে শত ভাগ বাড়ি পাকা হবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে, প্রাণহানি অনেক কমে আসবে এবং উন্নত শে হিসেবে আমরা পরিচিতি লাভ করব বিশ্ববাসীর কাছে।
অনেকের কাছে এ প্রকল্প অবাস্তব ও আকাশ কুসুম কল্পনা বলে মনে হতে পারে। কারণ মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, অর্থ যোগান কে দিবে? আমাদের বাজেটের দিকে তাকালেই এর উত্তর মিলবে। আর বেসরকারি আবাসন কোম্পানিগুলোও এর অন্যতম উত্তরক।

তিনটি উত্স থেকে অর্থ যোগান হতে পারে-
১. নিজস্ব যোগান, জাতীয় বাজেট থেকে একটা অংশ বরাদ্দ, বাংলাদেশ ব্যাংকে ১ ট্রিলিয়ন অলস টাকা ও ৩১.৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রিজার্ভ আছে। তার একটা অংশ ব্যবহার করা যায়।

২. বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি ও আইডিবি থেকে ঋণ গ্রহণ কিংবা অনুদান নেওয়া।

৩. যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ কিংবা অনুদান নেওয়া। কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন