আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
‘আবাসন খাতে স্থবিরতা কাটাতে বাজেটে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া উচিত’

ফ্ল্যাট বা প্লট কিনতে সরকারের কড়া নজরদারির কারণে দেশের অর্থ বাইরে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া ফ্ল্যাট ও প্লট কেনার সময় সরকারের অতি নজরদারির কারণে বিপুল পরিমাণ কালো টাকাও দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয় না। কালো টাকা বিনিয়োগের কোনো ধরনের ব্যবস্থা না থাকায় এসব টাকাও পাচার হয় বিদেশে। তবে আসন্ন বাজেটে আবাসন খাতের চলমান সংকট কাটবে বলে প্রত্যাশা করছেন খাতটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

আবাসন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সুপরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি নাগরিকদের বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা পূরণে আবাসন খাত সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় আসা জরুরি। দিতে হবে নীতিগত সহায়তাও। বর্তমান বাস্তবতায় কোনো ব্যক্তি ফ্ল্যাট ও প্লট বুকিং দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থের উৎসসহ নানা ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। আবাসন খাতের জন্য এটি অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা।

ফ্ল্যাট বা প্লট কিনতে অতি নজরদারির কারণে অর্থপাচারের আশঙ্কা বাড়বে। মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতেও দ্বিতীয় বাড়ি (সেকেন্ড হোম) ক্রয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার করে অনেকে। দেশে প্রায় সাত লাখ কোটি কালো টাকা রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। বিপুল এই টাকা দেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ দেওয়া না হলে সেগুলো বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবাসন ব্যবসায়ীরা আরো জানান, যুক্তরাষ্ট্রে জমি ও ফ্ল্যাট কিনতে মাত্র ১ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পায় গ্রাহকরা। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাংকঋণের অপ্রতুলতার পাশাপাশি রয়েছে হয়রানির আশঙ্কা।

ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিদ্যমান সমস্যাগুলো অনুধাবন করে আসন্ন বাজেটে একটা সমাধানের পথ বের করার উদ্যোগ নেবেন।

আবাসন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য মতে, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি খাতটির সরাসরি অবদান ৭.০৮ শতাংশ। এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পের অবদান যোগ করলে জিডিপিতে আবাসন খাতের অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ১২ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে ৩৫ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এই খাত, যাদের ওপর নির্ভরশীল প্রায় দুই কোটি মানুষ। সরকারের সঠিক নীতি সহায়তা পেলে এই খাতের আরো প্রসার ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই নতুন বাজেটে অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে আবাসন খাত।

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) একটি হিসাব বলছে, গত তিন দশকে দুই লাখের বেশি ফ্ল্যাট ও এক লাখ প্লট গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই খাতে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহ করছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকাণ্ড। সরকার এই খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে এলেও বিভিন্ন সংস্থা পরে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের প্রশ্নের মুখে ফেলছে। তাদের ব্যাংক হিসাব, টাকার উৎস জানতে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। তাই গ্রাহকদের একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য অর্থের উৎস প্রদর্শন যাতে না করতে হয় তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ জন্য আয়কর অধ্যাদেশের ১৯-এর বি পুনঃপ্রবর্তন করতে হবে। এটি করা না হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাবে। এই খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের জন্য ভবিষ্যতে যাতে কোনো সংস্থা প্রশ্ন না তুলতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে ভয় থেকে অনেকে বিদেশে সেকেন্ড হোম গ্রহণের সুযোগ নিয়ে অর্থ পাচার করছে।

সূত্র আরো বলছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে দেশে ফ্ল্যাট ও প্লট বেচাকেনার বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। এতে এই খাতে এক ধরনের বৈরী পরিবেশ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, যা বন্ধ করতে হবে। আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নথি জব্দ করছে। এখানে একটি ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হচ্ছে।

এ ছাড়া নানা রকম কারণে রাজধানীসহ দেশের অন্য শহরগুলোতে মানুষ বাড়ছে। নগরমুখী মানুষের এই স্রোত সবচেয়ে বেশি রাজধানী ঢাকায়। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার মাত্র ৯ শতাংশ নগরবাসী ছিল। ২০১১ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮ শতাংশ। বাংলাদেশের নগরায়ণের হার এই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নগরীর মধ্যে ঢাকায় জনসংখ্যা বাড়ছে সবচেয়ে বেশি হারে। বিশ্বের ক্রমবর্ধমান মেগাসিটিগুলোর মধ্যে ঢাকা এখন অন্যতম। জাতিসংঘের তৈরি ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস : দ্য ২০১৪ রিভিশন’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ঢাকা হবে বিশ্বের ষষ্ঠ জনবহুল নগরী। আর শহরমুখী মানুষের জীবন-জীবিকার প্রয়োজন মেটাতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের একটি ফ্ল্যাট বা প্লট নিয়ে থাকার আগ্রহ বাড়ছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও পরিকল্পিত বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলাই হচ্ছে বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। প্রত্যেক নাগরিক যাতে ভাড়ার টাকায় অন্তত তাদের একটি ঠিকানা খুঁজে পায় সেদিকে লক্ষ্য এবার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে নীতিনির্ধারণী কিছু সমস্যার কারণে আবাসন খাত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটময় অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে এই খাত বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ভর্তুকি দিয়ে ৫ শতাংশ সরল সুদে গৃহঋণ চালু করার পর এই খাতের স্থবিরতা থেকে বেরিয়ে আসার একটা আশা দেখা যাচ্ছে। তবে এখনো উচ্চ নিবন্ধন ব্যয়, সব নাগরিকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা না থাকা এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এই খাতের বড় প্রতিবন্ধকতা। জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখা আবাসনশিল্পে নিবন্ধন ব্যয় কমিয়ে এক অঙ্কে নামিয়ে আনা এই খাতের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি। নতুন বাজেটে এ ব্যাপারে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

১০ তলার ওপরে একটি ভবন নির্মাণ করতে রাজউক, ফায়ার সার্ভিস, ডিএমপি, পরিবেশ অধিদপ্তর, তিতাস, ডেসকো, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা, সিভিল এভিয়েশনসহ মোট ১১টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের দরকার হয়। এতগুলো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন আবাসন খাত প্রসারে বড় অন্তরায়।

ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি ওসামা তাসীর এ ব্যাপারে বলেন, আবাসন খাতের বিকাশে আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো জমি ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি। গুলশান, বারিধারাসহ ঢাকার অন্যান্য অঞ্চলে জমির মূল্য গত এক দশকে দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে। এ ছাড়া বালু, সিমেন্ট, রডসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে দুই থেকে আড়াই গুণ। ফলে জমি বেচাকেনায় অনেকে প্রকৃত মূল্য দিচ্ছে না। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

রিহ্যাবের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন এ ব্যাপারে বলেন, ‘অর্থনীতিতে আবাসন খাতের অবদান বিবেচনা করলে এই খাতে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। আগামী বাজেটে সরকার এই খাতের জন্য ভালো কোনো খবর দেবে—এমন প্রত্যাশা করি আমরা। বিশেষ একটি স্বল্প সুদে গ্রাহকরা যাতে ঋণ পায়, এটি খুবই জরুরি। পৃথিবীর অনেক দেশেই এটি রয়েছে। এ ছাড়া জমি কিংবা ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ব্যয় কমাতে হবে। কমালে গ্রাহকরা প্রকৃত মূল্য ঘোষণা দিয়ে সরকারকে আরো বেশি রাজস্ব জোগান দেবে।’ কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন