আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
ঘোষণা
আবাসন সম্পর্কিত যেকোনো নিউজ পাঠাতে পারেন আমাদের এই মেইলে- abasonbarta2016@gmail.com
ঋণখেলাপিদের জন্য নজিরবিহীন সুবিধা

ঋণখেলাপিদের স্মরণকালের সর্বোচ্চ সুবিধা দিয়ে নীতিমালা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মাত্র ২ শতাংশ এককালীন নগদ জমা (ডাউন পেমেন্ট) দিয়ে ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট বা সম্পূর্ণরূপে পরিশোধের বিশেষ সুবিধা পাবেন খেলাপিরা। এ ক্ষেত্রে তাদের ঋণের সুদহার হবে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ৩ শতাংশ, তবে তা কোনোমতেই ৯ শতাংশের বেশি হবে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে ‘ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা’ জারি করে সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের পাঠানো হয়। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের অনারোপিত সুদ মওকুফ সুবিধা ছাড়াও খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের দায়ের করা মামলাও স্থগিত রাখা হবে। গতকালই পৃথক আরেক সার্কুলার জারি করে যারা ঋণ নিয়ে নিয়মিত পরিশোধ করেন, তাদের সুদে ১০ শতাংশ রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতেও নিয়মিত গ্রাহকদের ঋণখেলাপিদের চেয়ে বেশি হারে সুদ পরিশোধ করতে হবে। বর্তমানে নিয়মিত গ্রাহকদের ঋণের বিপরীতে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হচ্ছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি হলে তা পুনঃতফসিল সুবিধা পেতে ১০ শতাংশ অর্থ এককালীন পরিশোধ করার নিয়ম রয়েছে।

সাবেক ব্যাংকার ও বিশেষজ্ঞরা এ নীতিমালার সমালোচনা করে বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে দেশের ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময় ঋণ পুনর্গঠন সুবিধাসহ খেলাপিদের নানা সুবিধা দেওয়া হলেও তারা আবারও খেলাপি হয়েছে। তাই নতুন করে দেওয়া এ সুবিধায় খেলাপি ঋণ কমবে না বলে মনে করছেন তারা।

ঋণখেলাপিদের বিশেষ এই সুবিধা দেওয়ার যুক্তি তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কারণে ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাংকের ঋণ অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিতভাবে পরিশোধিত হচ্ছে না। ওইসব ঋণ বিরূপভাবে খেলাপি হয়ে পড়ায় ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদনশীল খাতসহ অন্যান্য খাতে স্বাভাবিক ঋণ প্রবাহ বজায় রাখাসহ ব্যাংকিং খাতের বিরূপ শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ নিয়মিতভাবে আদায়ের জন্য এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ঋণখেলাপিদের এত বেশি সুবিধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ গত রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই নীতিমালা ব্যাংকিং সেক্টরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে। কারণ, যত সুবিধাই দেওয়া হোক, খেলাপি ঋণ থেকেই যাবে। বরং যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন, তারাও খেলাপি হবেন। ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি এই নীতিমালা জারির মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কারণ, খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকা প্রভিশনিং রাখতে হতো, যা এখন আর লাগবে না।’

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কোনো সুফল আসবে না। এর আগেও বিভিন্ন সময় ঋণখেলাপিদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে কোনো সুফল আসেনি।

বিশেষ এই সুবিধা কোন ধরনের ঋণখেলাপিরা পাবে, তা স্পষ্ট করে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নীতিমালায় বলা হয়েছে, ট্রেডিং খাত (গম, খাদ্যদ্রব্য, ভোজ্যতেল ও রিফাইনারি), জাহাজ শিল্প (শিপব্রেকিং ও শিপবিল্ডিং) এবং লৌহ ও ইস্পাত শিল্প। এসব শিল্পে ব্যাংকগুলোর বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ রয়েছে। বিশেষায়িত ব্যাংকের অকৃষি খাতের আমদানি-রপ্তানি সম্পৃক্ত শিল্প ঋণ এবং অন্যান্য খাতে ব্যাংকের বিশেষ নিরীক্ষার মাধ্যমে চিহ্নিত প্রকৃত ব্যবসায়ী, যাদের ঋণ নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কারণে মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত বা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে তারা এসব সুবিধা পাবেন। ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে পুনঃতফসিল বা এক্সিট সুবিধা দেওয়া যাবে। এই খাত বা উপখাতগুলোর যেসব ঋণ গত বছর ৩১ ডিসেম্বর তারিখে মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত ছিল সেই ঋণগুলো এই সুবিধার আওতায় আসবে।

ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ঋণ পুনঃতফসিল বা এক্সিট সুবিধা নিতে চাইলে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে হবে। এরপর আর কোনো আবেদন নেওয়া হবে না। কেইস টু কেইস বিবেচনায় ঋণ পরিশোধের সময়কাল সর্বোচ্চ এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছর হবে। অর্থাৎ, প্রথম এক বছর ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। পরের নয় বছর ধরে তা পরিশোধ করার সুযোগ পাবে। আবেদন পাওয়ার পর ব্যাংককে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখ ভিত্তিক হিসাব করা স্থিতি অনুযায়ী কার্যক্রম নিতে হবে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, পুনঃতফসিল সুবিধার ক্ষেত্রে অনারোপিত সুদের সম্পূর্ণ অংশ এবং ইন্টারেস্ট সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে রক্ষিত সুদ মওকুফ করা যাবে। তবে মওকুফ করা সুদ ব্লকড হিসেবে স্থানান্তর করে রাখতে হবে। পুনঃতফসিলের শর্ত অনুযায়ী সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধের পর ব্লকড হিসেবে রাখা সুদ চূড়ান্তভাবে মওকুফ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এ ক্ষেত্রে ঋণ স্থিতির (মওকুফের পর) ওপর ব্যাংকের তহবিল খরচের সঙ্গে ৩ শতাংশ সুদ যোগ করা যাবে। তবে মোট সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখতে হবে। চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে এই সুদ কার্যকর হবে। ঋণ স্থিতির ন্যূনতম ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নগদে গ্রহণ করতে হবে। ইতোপূর্বে সংশ্লিষ্ট ঋণের বিপরীতে আদায় করা কিস্তির অর্থ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে বিবেচিত হবে না।

ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে মাসিক অথবা ত্রৈমাসিক কিস্তি নির্ধারণ করা যাবে। প্রচলিত নিয়মে আনুপাতিক হারে আসল এবং সুদ বিবেচনায় নিয়ে কিস্তির পরিমাণ নির্ধারিত হবে। ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নয়টি মাসিক কিস্তির মধ্যে ছয়টি এবং তিনটি ত্রৈমাসিক কিস্তির মধ্যে দুটি কিস্তি অনাদায়ী হলে এ সুবিধা বাতিল হবে। পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে সোলেনামার মাধ্যমে চলমান মামলা স্থগিতের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গ্রাহক এই সুবিধার কোনো শর্ত ভঙ্গ করলে স্থগিত মামলা পুনরুজ্জীবিত হবে। পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট গ্রাহক নতুন ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবে। তবে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

এক্সিট সুবিধার ক্ষেত্রে নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঋণ স্থিতির ওপর কস্ট অফ ফান্ড বা তহবিল খরচের হারে সুদ প্রযোজ্য হবে। ১ জানুয়ারি থেকে ওই হার কার্যকর হবে। এককালীন এক্সিট সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক যেদিন এ সুবিধা দেবে সেদিন থেকে সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনের মধ্যে ঋণগ্রহীতাকে পরিশোধযোগ্য ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ওই সময় সীমার মধ্যে সমুদয় পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে এ সুবিধা বাতিল বলে গণ্য হবে এবং ঋণটিকে মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আরও বলেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য কস্ট অফ ফান্ড আদায় নিশ্চিত করা বা ঘাটতি বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বলবৎ থাকলেও এই নীতিমালার আওতায় পুনঃতফসিল বা এককালীন এক্সিট সুবিধা দেওয়া যাবে। এতে আরও বলা হয়, ঋণগ্রহীতার আবেদন পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে ব্যাংককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে যেসব ক্ষেত্রে বিশেষ নিরীক্ষার প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে প্রতিবেদন পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আরও বলেছে, জারি করা নীতিমালার আওতায় পুনঃতফসিল বা এককালীন এক্সিট সুবিধা পাওয়া ঋণগুলো বিশেষ উল্লিখিত হিসাব (এসএমএ) মানে শ্রেণিকৃত করতে হবে। ওই ঋণের বিপরীতে ১ শতাংশ প্রভিশন রাখতে হবে। পুনঃতফসিল করা ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) বিশেষ আরএসডিএল এবং এক্সিট সুবিধা পাওয়া ঋণগুলো সিআইবিতে বিশেষ এক্সিট হিসেবে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। এই সুবিধার আওতায় সংশ্লিষ্ট ঋণগুলোর বিপরীতে আরোপিত সুদ প্রকৃত আদায় ছাড়া আয় খাতে স্থানান্তর করা যাবে না। সার্কুলার জারির পর থেকেই এটা কার্যকর বলে গণ্য হবে।

এই সুবিধা প্রদানের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংক যুক্তি দিয়েছে, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কারণে ব্যবসায়ী বা শিল্প উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাংক ঋণ অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিতভাবে পরিশোধ হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ঋণ বিরূপভাবে শ্রেণিকৃত হয়ে পড়ায় ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে শ্রেণিকৃত ঋণ নিয়মিতভাবে আদায়ের লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

একই দিন বিআরপিডি থেকে জারি করা অন্য এক সার্কুলারে বলা হয়, চলমান, তলবি, মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাস শেষে বিগত ১২ মাসে (গত বছর ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) ভালো ঋণগ্রহীতার সংশ্লিষ্ট ঋণের বিপরীতে আদায় করা সুদ বা মুনাফার কমপক্ষে ১০ শতাংশ রেয়াত সুবিধা দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে প্রতি বছর গ্রাহক ভালো ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত হলে একইরকম সুবিধা অব্যাহত থাকবে। এছাড়াও ভালো ঋণগ্রহীতার প্রয়োজনীয়তার নিরিখে বর্ধিত ঋণ সুবিধাও দেওয়া যাবে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ঋণখেলাপিদের এ ধরনের সুবিধা দেওয়ার কথা গত মাসে বলার পর সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা এর সমালোচনা করেছেন। তারা বলেছেন, ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এতবেশি সুবিধা দেওয়া হলে যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছেন, তারাও বাড়তি সুবিধার আশায় খেলাপি হয়ে যাবেন। এতে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। প্রকৃত খেলাপিদের এসব সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে সমর্থন দিলেও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের এসব সুবিধা না দেওয়ার কথা বলেছিলেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের নেতারা। দেশরূপান্তর