আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
ঘোষণা
আবাসন সম্পর্কিত যেকোনো নিউজ পাঠাতে পারেন আমাদের এই মেইলে- abasonbarta2016@gmail.com
‘ভূমিকম্প হলে আল্লাহ ভরসা’

‘ভূমিকম্প হলে আল্লাহ ভরসা করে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো পথ তো জানা নেই। এত উঁচু ভবনে অফিস করি, ভয় সারাক্ষণই লাগে। এই যে ভবন, তা নির্মাণে নিয়মকানুন মানা হয়েছে কি না, জানি না। ভূমিকম্প হলে ভবনটি যে ধসে যাবে না, তার তো কোনো গ্যারান্টি নেই।’
কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যানেক্স ভবন-২–এ অফিস করা এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ কর্মকর্তা জানালেন, ৩০ তলা ভবনের ১৭ তলায় তিনি অফিস করছেন কয়েক মাস হলো। তবে কর্মসূত্রে তিনি ভূমিকম্প হলে করণীয় নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলে জানালেন।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটি বড় লোকদের বস্তি বলে পরিচিতি পেয়েছে। এখানে ১৫ তলা করে ২৬টি ভবনে ১ হাজার ৮০০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ১ হাজার ৫২৩টি ফ্ল্যাট চালু আছে। এই ফ্ল্যাটগুলোতে মোট বসবাসকারীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৬৪।

জাপান গার্ডেন সিটির ২১ নম্বর ভবনের ১১ তলার একটি ফ্ল্যাটের মালিক সায়মা আক্তার জানালেন ভূমিকম্প নিয়ে তাঁর আশঙ্কার কথা। পেশায় ব্যাংকার সায়মা জাপান গার্ডেন সিটির কেন্দ্রীয় কমিটির ১৫ সদস্যের মধ্যে একমাত্র নারী সদস্য। তিনি মা ও শিশুবিষয়ক সম্পাদিকার দায়িত্ব পালন করছেন। বছরখানেক আগের ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সায়মা বলেন, ‘ভূমিকম্পের সময় পুরো ফ্ল্যাট দুলতে থাকে। যখন ভূমিকম্প হচ্ছে বুঝতে পারি, ততক্ষণে অন্যান্য ফ্ল্যাটের বেশির ভাগ বাসিন্দা হুড়োহুড়ি করে নিচে নামার সংগ্রামে ব্যস্ত। পা ভাঙাসহ প্রচণ্ডভাবে কয়েকজন আহতও হয়েছেন এ সময়। আমি আমার ছেলেমেয়েদের সব সময় বলি, হুড়মুড়িয়ে নিচে না নামার জন্য। ছাদে চলে যাওয়া বরং নিরাপদ। তবে ছাদের দরজা তালা দেওয়া থাকে। একটি বাক্সে চাবি থাকে। হাতুড়ি দিয়ে বাক্স ভেঙে চাবি বের করা যায়। তবে দুর্যোগের সময় মাথা ঠান্ডা রেখে কাজগুলো বুদ্ধি খাটিয়ে করতে হয়।’সায়মাও জানালেন, তাঁর ভবনটি ভূমিকম্প সহনশীল কি না, তা জানা নেই। একটু বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে ভবনটি ধসে যাবে না, গ্যারান্টি নেই। ছয় মাস পরপর জাপান গার্ডেন সিটিতে আগুন লাগলে ও ভূমিকম্পের সময় করণীয় নিয়ে প্রশিক্ষণ হচ্ছে। তবে প্রশিক্ষণ কাজে লাগানো যাবে কি না, তা তো জানা নেই।

জানা গেল, জাপান গার্ডেন সিটিতে প্রথম ১২টি ভবন জাপানিদের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে। এরপরের ভবনগুলো ফ্ল্যাটের মালিকেরা তৈরি করেছেন। এ সিটিতে বাচ্চাদের খেলার জায়গা রাখাসহ যা যা করার কথা ছিল, তা করা হয়নি। অর্থাৎ, ভবন তৈরির নকশা মানা হয়নি।
সায়মা তাঁর নিজের ভবনের আরেকটি সমস্যার কথা উল্লেখ করে জানালেন, ‘২১ নম্বর ভবনের নিচতলায় বিশাল আকৃতির একটি জেনারেটর বসানো হয়েছে। এ জেনারেটর কয়েকটি ভবনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। জেনারেটর চালু করলে ভবন কাঁপতে থাকে। বিকট শব্দে কানে সমস্যা হচ্ছে অনেকের। অথচ কোনো ভবনে জেনারেটর বসানো হবে না বলেই কথা ছিল। আলাদা জায়গায় জেনারেটর বসানোর কথা ছিল। তবে ২১ নম্বর ভবনসহ কয়েকটি ভবনের নিচেই বসানো হয়েছে জেনারেটর। এই জেনারেটর ভবনের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে বলেই মনে করি।’

শুধু সায়মা নন, রাজধানীর বেশির ভাগ ভবনের বাসিন্দার মনেই ভবন কতটা সুরক্ষিত, সে প্রশ্নটি উঁকি দিচ্ছে। ভবনটি পরিকল্পিতভাবে নির্মিত কি না, সে তথ্য তো নেই বাসিন্দাদের কাছে। বহুতল ভবনে বসবাসকারী একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ভূমিকম্প নিয়ে ভয় বেশি কাজ করে বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চলমান ও প্রক্রিয়াধীন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) তথ্য বিশ্লেষণ করে বহুতল ভবন নির্মাণের এই চিত্র নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ঢাকা মহানগরে ১০ বছরের ব্যবধানে ছয়তলার ওপর ভবন নির্মাণের হার বেড়েছে প্রায় ৫১৪ শতাংশ। উঁচু ভবন তৈরির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জায়গা ছাড়া হচ্ছে না।

ভূমিকম্প নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ডিজাস্টার ফোরামের গবেষণা বলছে, দেশে ১০ বছরে ৮৭ বার ভূকম্পন হয়েছে। ভূমিকম্পের সময় নিহত হয়েছে ১৫ জন। এর মধ্যে ১৩ জনই আতঙ্কিত হয়ে মারা যায়। প্রাণহানিসহ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শহরাঞ্চলেই বেশি ঘটে।
ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পে করণীয় নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির বিষয়টিতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তবে সময় এসেছে ভবন সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বললেন, ২০ সেকেন্ড স্থায়ী ভূমিকম্পের সময় করণীয় জানা থাকলেও তা প্রয়োগ করার ফুরসত পাওয়া যাবে না যদি ভূমিকম্পের সময় অবস্থানকারী ভবনটিই ধসে যায়। তাই ভূমিকম্পের সময় করণীয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করে সময় নষ্ট না করে ভবনটি ভূমিকম্প সহনশীল কি না, তা ভাবতে হবে। ভবনটি যদি ধসে না যায়, কেবল তখনই ভবনের নিচে নামবেন না ওপরে উঠবেন, তা ভাবার অবকাশ পাওয়া যাবে। ভবন মজবুত থাকলে ভূমিকম্পের সময় ৯০ শতাংশ মানুষ এমনিতেই বেঁচে যাবে।

অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বললেন, রানা প্লাজা ধসের পর বিদেশি ক্রেতাদের চাপে পোশাকশিল্প কারখানার মালিকেরা ভবন সংস্কার করতে শুরু করেছেন। বর্তমানে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান তৈরি ভবনটি কতটা ব্যবহার উপযোগী, তা যাচাই করার জন্য প্যাথলজিক্যাল টেস্টের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ভবনমালিকদের রাজউকের কাছে বসবাস বা ব্যবহার সনদ (অকুপেন্সি সার্টিফিকেট) জমা দিতে হবে। মালিকেরা সচেতন হয়ে নিজ উদ্যোগেই তো কাজটি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সদিচ্ছা থাকা জরুরি। ২০১০ সালে চিলি এবং হাইতিতে দুটি ভূমিকম্প হয়। চিলির ভূমিকম্প বেশি শক্তিশালী হলেও কম মাত্রার ভূমিকম্পেও বেশি ক্ষতি হয় হাইতিতে। এর একটিই কারণ, ভবন তৈরির নীতিমালা মেনে চিলি ভবন তৈরি করেছিল।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ভবন নির্মাণসহ নানা কারণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে ঢাকা শহরকে বসবাস অযোগ্য শহর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে ঢাকা পৃথিবীর নবম বৃহত্তম নগরী। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বাংলাদেশ প্লেট বাউন্ডারির অন্তর্ভুক্ত না হয়েও দুর্বল অবকাঠামো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রয়োজনীয় বিল্ডিং কোড মেনে না চলার কারণে এবং যত্রতত্র ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের একটি অন্যতম ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে, তা মনে রাখার উপদেশ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রায় ১২ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের একদল বিজ্ঞানীর গবেষণা প্রতিবেদনটি নেচার জিওসায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশ হয়। এই গবেষকদের মতে, বাংলাদেশসহ ভারত ও মিয়ানমারের কিছু অংশজুড়ে একটি সুবিশাল চ্যুতির (ফল্ট) অবস্থানের কারণে এই এলাকায় রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। এ রকম দুর্যোগে ঢাকাসহ বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। ২০০৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গবেষণাটি সম্পন্ন হয়।

২০১৭ সালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক প্রথম কনভেনশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) উপাচার্য ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীও সতর্ক করে বলেছিলেন, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। ভবন যদি ভূমিকম্পসহনীয় না হয়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে।

অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বললেন, ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। তখন বিমের নিচে দাঁড়াবেন না দেওয়ালের পাশে দাঁড়াবেন, সে চিন্তার চেয়েও অবকাঠামো মজবুত কি না, তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে।

ঢাকার কত ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, সে প্রশ্নের এখন পর্যন্ত সেভাবে সুরাহা হয়নি। গত বছরের ১৪ আগস্ট ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা দাখিলের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। রাজউকের পক্ষ থেকে প্রথমে ৩২১টি ভবনকে অতিঝুঁকিপূর্ণ দেখানো হলেও পরে ১৫৫টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে উল্লেখ করে। বৃহস্পতিবার রাজউকের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর পাঁচ হাজার ভবনে ঝুঁকি নিরূপণ করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে সরকারের বিভিন্ন আইন, নীতি ও পরিকল্পনায়। তবে এগুলোর প্রয়োগ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। রাজউকের ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প জোন ভবনের জন্য ভূমিকম্পের সহনশীলতার পৃথক মাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়াসহ ভূমিকম্পের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে চলতি বছরের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রাজউকের ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানের প্রস্তাবিত মেয়াদ ২০১৬-৩৫। কিন্তু মূল প্ল্যানের অনুমোদনের কাজটিই এখনো সম্পন্ন হয়নি, সে ক্ষেত্রে এর সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন, অগ্রগতি প্রশ্নসাপেক্ষ। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বর্তমানে নগর গবেষণা কেন্দ্রের সাম্মানিক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথম আলো