আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
ঘোষণা
আবাসন সম্পর্কিত যেকোনো নিউজ পাঠাতে পারেন আমাদের এই মেইলে- abasonbarta2016@gmail.com
সিমেন্টে অগ্রিম কর : দাম বাড়বে রডেরও

প্রস্তাবিত বাজেটে কাঁচামালে আগাম কর (ভ্যাট) আরোপ এবং অগ্রিম আয়কর সিমেন্ট ও রডের দাম বৃদ্ধি করবে। প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের দাম বাড়বে ৪২ টাকা এবং প্রতি টন রডের দাম বাড়বে প্রায় ১১ হাজার টাকা।

এতে স্থানীয় শিল্প এবং দুই খাতের সঙ্গে জড়িত লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে। ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা ঋণও খেলাপিতে পরিণত হবে। সামগ্রিকভাবে রড-সিমেন্টের মূল্যবৃদ্ধি আবাসন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যয় বাড়বে সরকারের মেগা প্রকল্পের।

সিমেন্টের দাম ব্যাগপ্রতি বাড়বে ৪২ টাকা : এদিকে সোমবার সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতি (বিসিএমএ) গুলশানের নিজস্ব কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে সিমেন্টের কাঁচামালের ওপর ৫ শতাংশ আগাম করসহ কর বাড়ানোয় প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের দাম বাড়বে ৪২ টাকা। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটকে সিমেন্ট খাতের জন্য ব্যবসাবান্ধব নয় বলে মন্তব্য করেছে সংগঠনটি।

সংগঠনের সভাপতি মো. আলমগীর কবিরের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রথম সহসভাপতি ও মেট্রোসেম সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল্লাহ ও অন্য পরিচালকরা।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশের সিমেন্ট শিল্প স্বয়ংসম্পন্ন। মোট ৪২টি কারখানা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে সিমেন্ট রপ্তানিও করছে। এই সময় অতিরিক্ত কর আরোপ করলে একদিকে যেমন এই শিল্প রুগ্ন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে সরকারের অবকাঠামো খাতের বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ব্যয়ও বাড়বে। এছাড়া আবাসন খাত ও বাজেটে চাপে থাকা মধ্যবিত্তদের ওপর খড়গ নেমে আসবে বলে মনে করেন তারা।

সংগঠনের সভাপতি তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সিমেন্ট খাতে কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ এআইটি ও ৩ শতাংশ উৎসে কর চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এটি আগের মতো সমন্বয়পূর্বক ফেরতযোগ্য কর হিসেবে গণ্য করার আহবান জানান তিনি। এতে আরও বলা হয়, নতুন ভ্যাট আইন ২০১২ বাস্তবায়নের ফলে আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ অতিরিক্ত অগ্রিম ভ্যাট চলতি হিসেবে দিতে হবে। এতে করে স্থানীয় শিল্পের চলতি মূলধনে (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর ফলে অনেক শিল্প-কারখানা রুগ্ন হয়ে পড়বে এবং ব্যাংক খাতের বিনিয়োগ হুমকির মুখোমুখি হবে।

তিনি আরও বলেন, এই শিল্পের কাঁচামাল সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। তাই আমদানি পর্যায়ে দেয়া ৫ শতাংশ রেয়াত সুবিধা না থাকলে বিক্রয় ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫৫ শতাংশ মোট মুনাফা (গ্রস প্রফিট) এবং মূল মুনাফা (নেট প্রফিট) ১৫ শতাংশ করতে হবে। এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই মূল্য নির্ধারণ বাজার সহায়ক না হলে উৎপাদন এবং বিক্রি কমে যাবে। এর ফলে শিল্পের স্থিতিশীলতা ও সক্ষমতা কমে যাবে।

রাজস্ব খাতে অগ্রিম হিসেবে এখনও কয়েকশ’ কোটি টাকা পড়ে আছে উল্লেখ করে বিসিএমএ সভাপতি বলেন, এই টাকা কবে পাওয়া যাবে এরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এরপর আরও ৫ শতাংশ হারে আগাম ভ্যাট কর্তন করলে দেশের শিল্পে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হবে। এর ফলে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হুমকিতে পড়বে। কর্মসংস্থান হারাবে কয়েক লাখ মানুষ।

প্রতি টন রড়ের দাম বাড়বে প্রায় ১১ হাজার টাকা:রড উৎপাদকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজেটে রড শিল্পের ওপর ৬৫০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। কাঁচামালে আগাম কর আরোপ এবং অগ্রিম আয়করের প্রভাবে টনপ্রতি রডের দাম বাড়বে প্রায় ১১ হাজার টাকা। আগে যেখানে স্ক্র্যাপের ওপর ৩০০ টাকা ভ্যাট দিতে হতো, সেখানে এখন টনপ্রতি স্ক্র্যাপে ১ হাজার ৭৫০ টাকা ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। তাছাড়া স্ক্র্যাপ থেকে বিলেট এবং বিলেট থেকে এমএস রড উৎপাদনে ৯০০ টাকা ট্যারিফ ভ্যালু ছিল। সেখানে প্রস্তাবিত বাজেটে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা হয়েছে ৪ হাজার টাকা। খুচরা বিক্রিতে আগে ২০০ টাকা ট্যারিফ ভ্যালু ছিল, এখন সেখানে ৫ শতাংশ হারে ৩ হাজার ৩০০ টাকা ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে শুধু ভ্যাটের কারণে টনপ্রতি রডের দাম বাড়বে ৭ হাজার ৬৫০ টাকা।

অন্যদিকে স্ক্র্যাপ ও বিলেট কেনার ওপরে ৩ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হয়েছে। এতে টনপ্রতি স্ক্র্যাপ কেনায় এক হাজার ৫০ টাকা এবং বিলেট বিক্রির ওপরে এক হাজার ৬৫০ টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হবে। এতে খরচ বাড়বে। অবশ্য রড বিক্রিতে আগের মতোই এক হাজার ৯৫০ টাকা অগ্রিম আয়কর বহাল রয়েছে। সব মিলিয়ে স্টিল শিল্পে আয়করের কারণে রডের দাম টনপ্রতি দুই হাজার ৭০০ টাকা বাড়বে। অর্থাৎ আয়কর ও ভ্যাটের কারণে টনপ্রতি রডের দাম বাড়বে ১০ হাজার ৩৫০ টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বাজেটে রডের ওপর ৬৫০ শতাংশ ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। আবার ৩ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর বসানো হয়েছে, যেটা রিফান্ড পাওয়া যাবে না। এ দুই কারণে রডের দাম টনপ্রতি ১১ হাজার টাকা বাড়তে পারে। এতে শুধু যে স্টিল শিল্প ও আবাসন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নয়, সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চলমান উন্নয়ন প্রকল্প ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। সরকারকে এসব প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, স্টিল সেক্টরের সঙ্গে ৩৬শ’ পণ্য ও আইটেম সম্পৃক্ত। একজন ব্যক্তি যখন বাড়ি নির্মাণের কথা ভাবেন, তখন সবার আগে রড কেনার চিন্তা করেন। এখন ভ্যাট-ট্যাক্সের কারণে টনপ্রতি রডের দাম ১১ হাজার টাকা বাড়লে কেউই বাড়ি নির্মাণে উৎসাহিত হবেন না। তখন বালু, ইট, তারকাঁটার মতো ছোট খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্ধিত ভ্যাট-ট্যাক্সের কারণে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা স্টিল মিল বন্ধ হয়ে যাবে। মালিকরা ঋণখেলাপিতে পরিণত হবেন। তাই শিল্পের স্বার্থে ভ্যাট-ট্যাক্স সহনীয় পর্যায়ে রাখা উচিত।

দেশের শীর্ষস্থানীয় রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে স্টিল খাতে যে হারে আয়কর ও ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, তাতে শিল্প বেঁচে থাকে কিনা সন্দেহ রয়েছে। প্রতি টন রডের দাম বাড়বে ১০ হাজার টাকার বেশি। করের কারণে এত বড় মূল্যবৃদ্ধির ফলে ক্রেতারা স্টিল প্রডাক্ট কিনতে নিরুৎসাহিত হবেন। এর প্রভাব পড়বে পুরো সেক্টরের ওপর।

আবাসন খাত ও উন্নয়ন প্রকল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের পদ্মা সেতু, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ আবাসন খাতের সব প্রকল্পে দেশের উৎপাদিত রড-সিমেন্ট সরবরাহ করা হচ্ছে। রড-সিমেন্টের দাম বাড়লে এসব বড় প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়বে। অর্থাৎ শুধু ৫ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপের কারণে রড-সিমেন্ট শিল্পের পাশাপাশি আবাসন খাত এবং সরকারের বড় প্রকল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

রড-সিমেন্টের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন যুগান্তরকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার আবাসন খাতের দিকে সুনজর দিয়েছে, এজন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। তবে আবাসন খাতের মূল উপকরণ রড, সিমেন্টের ওপর কর আরোপের কারণে ফ্ল্যাটের নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাবে। এ কারণে সরকার আবাসন খাতকে চাঙ্গা করতে যে সুবিধা দিয়েছে, সেটা কাজে আসবে না। যুগান্তর

মন্তব্য