আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
ঘোষণা
আবাসন সম্পর্কিত যেকোনো নিউজ পাঠাতে পারেন আমাদের এই মেইলে- abasonbarta2016@gmail.com
একটি পরিবার কত ঋণ পাবে তা নির্দিষ্ট করার সময় এসেছে
ব্যাংকে টাকা নেই। বাড়ছে সুদহার। সঙ্গে খেলাপি ঋণও। এ জন্য ব্যাংক খাত এখন আলোচনায়। ব্যাংক খাতের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল হালিম চৌধুরী। আলাপকালে পূবালী ব্যাংকের ৬০ বছরের পথচলার নানা বিষয়ও উঠে আসে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সানাউল্লাহ সাকিব

প্রথম আলো: ব্যাংক খাতে হঠাৎ কেন তারল্যসংকট দেখা দিল? আমানতকারীদের আস্থায় চিড় ধরেছে, নাকি অন্য কিছু?

আবদুল হালিম চৌধুরী: ব্যাংক খাত এমনিতেই নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে ব্যাংকে তারল্য নেই, এটা ঠিক নয়। কোনো কোনো ব্যাংকের কাছে বেশি তারল্য আছে, আবার কারও কাছে নেই। এতে একটা অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। দেশে বড় বড় নির্মাণকাজ চলছে, অনেক ঋণপত্র খোলা হয়েছে। এ জন্য প্রচুর ডলার লাগছে। প্রবাসী আয় ও রপ্তানির মাধ্যমে যা ডলার আসছে, তা দিয়ে আমদানি দায় মিটছে না। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে। ফলে বাজার থেকে টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। আবার আমানত যে হারে আসছে, ঋণ যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি। এসব কারণে তারল্যসংকটে পড়েছে ব্যাংকগুলো।

তবে এটা সত্য, গ্রাহকের আস্থাতেও কিছুটা সংকট তৈরি হয়েছে। কারণ একটি ব্যাংকে সমস্যা হয়েছে, তার অনেক ভুক্তভোগী আছে। আবার অনেকেই আশঙ্কা করছে, আরও দু-একটি ব্যাংকে সমস্যা হতে পারে। ব্যাংকগুলোতে যতটা সুশাসন থাকা প্রয়োজন, তা নেই। এসব কারণেই আস্থার সংকট। তবে যারা আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারছে, তাদের জন্য তারল্যে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। যারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা পুরোপুরি মেনে চলছে, তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

 

প্রথম আলো: এক দিকে তারল্যসংকট। আবার ব্যাংক মালিকেরা সুদহার কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আদৌ সুদহার কি কমানো সম্ভব?

হালিম চৌধুরী: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির সম্প্রতি এক সভায় আমাদের বলেছেন, ঋণের সুদের হার কমানো যাবে, যদি আমানতের সুদহার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু আমানতের সুদহার নিয়ন্ত্রণে নেই। এখনো কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেশি সুদে আমানত নিচ্ছে। এসব কারণে সুদহারে অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। আবার অনেক ব্যাংক বেশি ঋণ দেওয়ার ফলে সীমা অতিক্রম করে গেছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের জরিমানা করেছে। তাই এসব ব্যাংক এখন বেশি সুদে আমানত নিচ্ছে, যার প্রভাব সব ব্যাংকের ওপর পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের মতো ব্যাংকগুলোকে নতুন আমানত পেতে নয়, পুরোনো আমানত ধরে রাখতে সুদহার বাড়াতে হয়। তবে যেসব শিল্পঋণ আছে, তাতে সবাই সুদহার কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। যদিও ব্যবসায়িক ঋণে সুদহার এখনো অনেক বেশি।

 

প্রথম আলো: আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?

হালিম চৌধুরী: আমরাও একসময় সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক ছিলাম। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ স্যারের নেতৃত্বে আমরা সে সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসি। করপোরেট সুশাসনের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। এ চর্চা সব সময় করতে হয়। আমাদের দেশে অনেক ভালো আইন আছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই। আইন মেনে চললে ব্যাংকগুলো ভালো হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা সব ব্যাংক মানতে চায় না। অনেকে সুযোগ পেলেই আগ্রাসী ব্যাংকিং করে। তখনই বিপদ হয়। সব ব্যাংকের জন্য সমস্যা তৈরি হয়। আমরা নীতিমালা মেনে চলি, এ জন্য স্বস্তিদায়ক অবস্থানে আছি। সবাইকে নীতিমালা, আইনকানুন মেনে চলতে হবে। আর খেলাপি ঋণও ব্যাংক খাতের জন্য একটা বড় সমস্যা। সময় এসেছে একটি পরিবার বা গ্রুপ কত ঋণ নিতে পারবে, তা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার।

 

প্রথম আলো: ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ এত বাড়ল কেন?

হালিম চৌধুরী: অনেক ব্যাংক একই গ্রুপকে বেশি টাকা দিয়েছে। আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তারা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না করে জমি কিনেছে। ফলে ব্যবসায়ীরা আটকে গেছেন। আবার স্বল্পমেয়াদি আমানত এনে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া হয়েছে। ভোগ্যপণ্যের দামও অনেক কমে গেছে। কিছু টাকা পাচারও হয়ে গেছে। জাহাজভাঙা শিল্পের কাঁচামাল যে দামে আনা হয়েছিল, হঠাৎ তা কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা আবার কাঁচামাল এনেছেন, আবার দাম কমে গেছে। ফলে এ চক্র থেকে কেউ বের হয়ে আসতে পারেনি। বড় ধরনের ধাক্কায় অনেক ব্যবসায়ী শেষ হয়ে গেছেন। আবার ইচ্ছাকৃত অনেক খেলাপি গ্রাহক আছে। তাদের বিরুদ্ধে যথাসময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হলে এত সমস্যা তৈরি হতো না।

 

প্রথম আলো: এটিএম সেবা, অনলাইন ব্যাংকিংয়ে বড় ধরনের জালিয়াতি হচ্ছে। এসব সেবার নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ব্যাংকগুলো সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগে কতটা আগ্রহী?

হালিম চৌধুরী: সাইবার নিরাপত্তা এখন বড় মাথাব্যথার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি মনে করি, এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা পুরোপুরি মেনে চললে ঝুঁকি অনেকটা কমবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে হালনাগাদ প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দিতে হবে। বাড়াতে হবে সচেতনতা। এখন ব্যাংকিং পুরোপুরি অনলাইননির্ভর। তাই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বের অন্যান্য দেশে মানবসম্পদের চেয়ে প্রযুক্তিতে ব্যাংকগুলো বেশি বিনিয়োগ করে। আমাদেরও তা-ই করতে হবে।

 

প্রথম আলো: এবার আসি পূবালী ব্যাংকের কথায়। সরকারি থেকে বেসরকারি খাত, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রতিষ্ঠার ৬০ বছর পূর্ণ হলো। কেমন ছিল যাত্রাপথ?

হালিম চৌধুরী: পূবালী ব্যাংক ১৯৫৯ সালে কার্যক্রম শুরু করে। তখন এর নাম ছিল ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক। বাঙালিদের প্রথম ব্যাংক পূবালী। বাঙালিরা যাতে ব্যবসা করতে পারে, সে জন্যই এ ব্যাংক গঠন করা হয়েছিল। চলতি বছরে প্রতিষ্ঠার ৬০ বছর হলো। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক সরকারের ট্রেজারি কার্যক্রম শুরু করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু এ ব্যাংকের নাম দেন পূবালী ব্যাংক। তখন এটা জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৮৩ সালে আবার এটা বেসরকারি খাতে দেওয়া হয়। আমাদের পরিচালকেরা তখন এর অংশীদার হন। ওই সময়ে ব্যাংকটির অনেক সমস্যা ছিল। নব্বইয়ের দশকে আমাদের মাত্র ১৬ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন ছিল, ওই সময়ে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৯০ কোটি টাকা। এরপর পরিচালনা পর্ষদ, কর্মকর্তা—সবার চেষ্টায় ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালে ১ হাজার কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা হয়। নিট মুনাফা হয় ৩৬২ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও আমরা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুনাফা করেছি।

 

প্রথম আলো: যখন ব্যাংক খাতে সমস্যা, তখন পূবালী ব্যাংক ভালো করছে। এর কারণটা কী?

হালিম চৌধুরী: ব্যাংক খাতের নানা সংকটের মধ্যে পূবালী ব্যাংক ভালো আছে। কারণ আমাদের পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংক পরিচালনায় কোনো হস্তক্ষেপ করে না। নিয়োগ, পদোন্নতি, ঋণ—কোনো ক্ষেত্রেই নয়। আমাদের ৪৭৩টি শাখা আছে, এ বছর আরও ৯টি খোলা হবে। এ ছাড়া ১৫টি ইসলামিক উইন্ডো খোলার অনুমতি পেয়েছি। পাশাপাশি আমরা বুথ ব্যাংকিং শুরু করেছি। সব উপজেলায় আমরা বুথ ব্যাংকিং শুরু করব। আমাদের বড় সুবিধা হলো, অনলাইন ব্যাংকিংয়ে কোনো মাশুল নেই। এ জন্য বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠান আমাদের মাধ্যমে টাকা আদায় করে। আমাদের ভিশন হলো, একজন গ্রাহক সব বয়সে আমাদের সেবা নেবে। স্কুল ব্যাংকিং থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়সেও আমাদের সেবা পাবে। সব ধরনের ঋণ পাবে। আমরা নতুন করে পাঁচ বছরের জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা নিচ্ছি। এ সময়ে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ভাবমূর্তি বাড়ানো, নতুন করে ব্র্যান্ডিং ও মানবসম্পদকে আরও দক্ষ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ থাকবে। আগামী পাঁচ বছরে আমরা এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, এটিএম সেবা বৃদ্ধি, কাগজবিহীন ব্যাংকিংসহ নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। প্রতিটি শাখাকে মাসে ১০০ হিসাব খোলার লক্ষ্য দেওয়া হবে।

প্রথম আলো: পূবালী ব্যাংকে পরিচালকেরা হস্তক্ষেপ করেন না। তাহলে কেয়া গ্রুপের কাছে এত টাকা আটকে গেল কেন। আবার মাধবদী ও চকবাজার শাখায়ও জালিয়াতি হয়েছে।

হালিম চৌধুরী: কেয়া গ্রুপ একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। তুলার দাম ওঠানামায় প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। যখন দাম কমে গেল, প্রতিষ্ঠানটির বিদেশি ক্রেতারাও দাম কমিয়ে দিল। তখন কেয়া নিজেই বিদেশে গিয়ে মার্কেটিং শুরু করল। আমাদের দেশের কারও পক্ষে ইউরোপ বা আমেরিকায় গিয়ে মার্কেটিং করে ব্যবসা করা কঠিন। এটা তাদের ভুল পদক্ষেপ ছিল। আবার কেয়া গ্রুপের করপোরেট চর্চাতেও সমস্যা ছিল। তবে তারা অর্থ অন্য খাতে স্থানান্তর করেনি। কেয়া গ্রুপকে দেওয়া পুরো টাকাই ফেরত পাব। এ জন্য পর্যাপ্ত জামানত আছে। তাদের সঙ্গে বিদেশি কয়েকটি গ্রুপের আলোচনা হচ্ছে, আশা করছি সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।

মন্তব্য