আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
ভবনের নকশা অনুমোদনে ১০ সংস্থাকে এড়িয়ে চলছে রাজউক

ভবনের নকশা অনুমোদনে সিটি করপোরেশনসহ ১০টির বেশি সংস্থার ছাড়পত্র বিবেচনায় নিতে হয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক)। গত মার্চ থেকে ক্ষেত্রবিশেষে কয়েকটি সংস্থা ছাড়া বাকিগুলোর ছাড়পত্র বা অনাপত্তি নেয়ার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছে না সংস্থাটি। নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলে এখন থেকে অনেকটা ‘একলা চলো’ নীতিতেই চলছে রাজউক। যদিও এতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হওয়াসহ নানা ধরনের সমস্যা বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইন অনুযায়ী, এতদিন বহুতল ভবন ও আবাসন প্রকল্পে যানবাহন প্রবেশ-নির্গমন ও চলাচল সম্পর্কিত ছাড়পত্র দিয়ে আসছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজউক গত মার্চ থেকে এ ছাড়পত্র আর মানছে না।

ছাড়পত্র না নেয়ায় অনুমোদিত ভবন ও আবাসন প্রকল্পের কারণে সড়ক নেটওয়ার্ক, পার্কিং ও যানজট সমস্যা আরো প্রকট হবে বলে মনে করছেন ডিটিসিএ কর্মকর্তারা। পাশাপাশি এ কারণে ডিটিসিএ আইনও লঙ্ঘন হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। একই ধরনের কথা বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরাও।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১২-এর ৯ (চ) উপধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্মিতব্য ভবন ও আবাসিক প্রকল্পে যানবাহনের প্রবেশ-নির্গমন ও চলাচল (ট্রাফিক সার্কুলেশন) সংক্রান্ত নকশা অনুমোদন ও তদারকির কাজ করবে ডিটিসিএ। এ অনুযায়ী সংস্থাটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট সংখ্যা ও মোট মেঝের ক্ষেত্রফল অনুযায়ী পার্কিং পরিকল্পনা, প্রবেশ-নির্গমনপথ, ভবনের ২৫০ মিটার ব্যাসার্ধে ভূমি ব্যবহার, বাস-বের স্থান, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ট্রাফিক প্রভাবগত মূল্যায়নসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে ট্রাফিক সার্কুলেশন ছাড়পত্র দিয়ে আসছে। পাশাপাশি নির্মিতব্য বহুতল ভবন ও আবাসন প্রকল্প সরকারের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) সাংঘর্ষিক কিনা, তাও বিবেচনায় নেয় ডিটিসিএ।

রাজউক বহুতল ভবন ও আবাসন প্রকল্পের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে এতদিন এ ছাড়পত্র বিবেচনায় নিলেও গত ২৮ মার্চ সংস্থাটির জারি করা এক অফিস আদেশে বলা হয়, ‘নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ডিটিসিএর ছাড়পত্র প্রয়োজন হবে না। একই অফিস আদেশে ১০ তলা বা ৩৩ মিটার পর্যন্ত উঁচু ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের অনাপত্তিপত্র প্রয়োজন হবে না বলেও উল্লেখ করা আছে। একইভাবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা/কোম্পানি, সিটি করপোরেশন, গ্যাস বিতরণ কোম্পানি, বাংলাদেশ পুলিশ, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কোনো ছাড়পত্র নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বলে জানানো হয়েছে।

রাজউকের এ সিদ্ধান্তকে একতরফা ও নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও নগর গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ভবনের পার্কিং, আবাসিক এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ের জন্য ডিটিসিএর ছাড়পত্রটা খুব জরুরি। কিন্তু নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজউক আর সেটি বিবেচনায় নিচ্ছে না। বিষয়টি দুঃখজনক। এ কারণে যানজট-বিশৃঙ্খলা আরো বাড়বে। শুধু ডিটিসিএর ছাড়পত্র নয়, নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনসহ আরো কিছু সংস্থার কাছ থেকে আগে ছাড়পত্র নেয়া হতো। সবই বাদ দেয়া হয়েছে। হোল্ডিং ট্যাক্স, আবর্জনা সংগ্রহসহ নানা কাজ সিটি করপোরেশন করে। কোথাও ভবন বা আবাসিক এলাকা হলে সিটি করপোরেশন যদি আগে থেকে সেটা জানতে না পারে, তাহলে তাদের কাজে বিঘ্ন ঘটারও একটা শঙ্কা কিন্তু রয়েই যায়।

ভবন বা আবাসন প্রকল্পের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে গিয়ে রাজউক সেটি আরো জটিল করে তুলেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, কোথাও কোনো আবাসন প্রকল্প বা বহুতল ভবন নির্মাণ করতে হলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কেমন হবে, পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে কিনা, ঠিকমতো গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ অন্যান্য সেবা সরবরাহ করা যাবে কিনা প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। আর এসব বিষয় সবচেয়ে ভালো জানে ও বোঝে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বা সংস্থা। তাই নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সেসব সংস্থা/অধিদপ্তরের কাছ থেকে ছাড়পত্র নেয়ার নিয়ম ছিল। সংস্থাগুলোর ছাড়পত্র নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া না হলে শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাই নয়, নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হওয়া, পরিবেশের ক্ষতিসহ নানা ধরনের সমস্যা বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে ‘ট্রাফিক সার্কুলেশন সম্পর্কিত ছাড়পত্র গ্রহণ ও নকশা অনুমোদন’ বিষয়ে ২৪ জুন একটি গণশুনানি আয়োজন করতে যাচ্ছে ডিটিসিএ। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সকাল সাড়ে ১০টায় এ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

ডিটিসিএ কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রাফিক সার্কুলেশন ছাড়পত্র নেয়া না হলে রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও ভবনের বা আবাসন প্রকল্পের কারণে সড়কের নেটওয়ার্ক ও পার্কিং সমস্যা আরো প্রকট হবে। পরিবহন পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার মধ্যে দূরত্ব ও সমন্বয়হীনতা তৈরি করবে। এতে ভবিষ্যতে ঢাকা মহানগরীর যানজট আরো বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন তারা। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রাকিবুর রহমান বলেন, রাজউক বহুতল ভবন ও আবাসন প্রকল্পের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে আমাদের নকশা আর বিবেচনায় নিচ্ছে না। এটা একদিকে যেমন যানজট, পার্কিংয়ের মতো সমস্যাগুলোকে বাড়িয়ে দিতে পারে, তেমনি এটা ডিটিসিএ আইনের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে। আমরা ছাড়পত্রের বিষয়টি নকশা অনুমোদনের শর্ত হিসেবে বিবেচনার জন্য এরই মধ্যে রাজউককে একটা চিঠি দিয়েছি। তার পরও রাজউক যদি আমাদের ছাড়পত্র ছাড়াই বহুতল ভবন ও আবাসন প্রকল্পের নকশা অনুমোদন দেয়, তাহলে ভবন বা আবাসন প্রকল্পের কারণে যানজট, পার্কিং সমস্যা তৈরি হলে সে দায় তাদেরই নিতে হবে।

এ বিষয়ে রাজউকের বক্তব্য জানতে গতকাল সেলফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয় রাজউকের চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদের সঙ্গে। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে সংস্থাটির একজন পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভবনের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর সিদ্ধান্তটি এসেছে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায়।

গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ‘মিট দ্য প্রেস’-এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। তিনি বলেন, নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে আগে অনেক সংস্থার কাছে দৌড়াদৌড়ি করতে হতো ভবন মালিকদের। এতে কখনো কখনো একটি ভবনের নকশা অনুমোদন করতেই দু-আড়াই বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় লাগত। নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতেই আমরা ১০টি সংস্থার ছাড়পত্র বাদ দিয়েছি। বণিক বার্তা

শেয়ার করুন