আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
ঘোষণা
আবাসন সম্পর্কিত যেকোনো নিউজ পাঠাতে পারেন আমাদের এই মেইলে- abasonbarta2016@gmail.com
বিজিএমইএ ভবন ভাঙা নিয়ে নতুন জটিলতা

‘নিয়মবহির্ভূতভাবে’ ভবনের মালামাল সরিয়ে নেওয়ায় ভবন ভাঙার কাজ এখন করতে চাচ্ছে না ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজ। এ বিষয়ে রাজউকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজধানীর হাতিরঝিলে জলাশয়ের ওপর আড়াআড়িভাবে গড়ে ওঠা ১৫তলা বিজিএমইএ ভবন ভাঙতে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর ভবনটি ভাঙতে যাচ্ছে রাজউক।

গত ১৫ অক্টোবর বিজিএমইএ ভবন ভাঙা ও অপসারণ কাজের দরপত্র অনুমোদন করে ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজকে চিঠি দেওয়া হয়। ১৬ অক্টোবর জামানত হিসেবে রাজউকে ১৬ লাখ টাকা জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। তবে ভবন ভাঙার কাজ শুরুর আগে ২১ অক্টোবর আবার মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করে বিজিএমইএ। এ অবস্থায় ২২ অক্টোবর রাজউকের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে আপত্তি জানায় ফোর স্টার।

চিঠিতে বলা হয়, বিজিএমইএ ভবন থেকে লিফট, এয়ার কন্ডিশনের কমপ্রেসার, সাব-স্টেশন প্যানেল বোর্ড, তামার তারসহ মূল্যবান মালামাল রাজউকের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিজিএমইএর লোকজন নিয়ে যাচ্ছে।

মালামাল যেন সরিয়ে নিতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।

তবে ঠিকাদারের আবেদনের পর ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি রাজউক।

এ অবস্থায় ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজ এ ভবন ভাঙার কাজ থেকে সরে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. নছরুলস্নাহ খান রাশেদ।

তিনি শনিবার বলেন, বিষয়টি নিয়ে রাজউকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও পারেননি তারা।

তিনি বলেন, ‘আমরা বুধবার, বৃহস্পতিবার রাজউকের চেয়ারম্যান মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি দেখা করেননি। প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলি। তিনি চেয়ারম্যান বা মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। এগুলো নাকি ওপরের মহলের নির্দেশে করা হচ্ছে।’

এই দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবন ভাঙার জন্য আলাদা কোনো অর্থ পাবে না। দুটি বেইজমেন্টসহ ১৫ তলা বিজিএমইএ ভবন ভাঙার পর ব্যবহারযোগ্য মালামাল বিক্রি করে তারা তাদের খরচ ও লাভ উঠিয়ে নেবে।

নছরুলস্নাহর বক্তব্য, তারা মালামাল দেখে দরপ্রস্তাব করেছিলেন, এখন সব সরিয়ে নেওয়া হলে তাদের লাভ থাকবে না বলে তারা অনাগ্রহী।

‘লিফট, পাইপ এসব তো বিল্ডিংয়ের অংশ। নিলাম হওয়ার সময় এসব মালামাল তো ভবনে ছিল।’

সোমবার রাজউক চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বলব আমাদের জামানতের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য। আর বিজিএমইএ যেসব মালামাল নিয়ে গেছে, সেসব বাদ দিয়ে যেন নতুন করে অ্যাসেসমেন্ট করে। নইলে আমরা আইনের আশ্রয় নেব।’

এ বিষয়ে কথা বলতে রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী এবং হাতিরঝিল প্রকল্পের পরিচালক এ এস এম রায়হানুল ফেরদৌসের মোবাইলে ফোন দিলে তিনি প্রথমে ধরেননি। বিষয়টি জানিয়ে এসএমএস পাঠানোর পর আবার ফোন দিলে তিনি ধরেন; তবে ‘ব্যস্ত আছি’ বলে লাইন কেটে দেন।

রাজউক কর্মকর্তারা জানান, নিলামের আগে বিজিএমইএ ভবনের নিলাম মূল্য প্রাক্কলন করে মালমালের বিক্রয়লব্ধ অর্থের পরিমাণ পাঁচ কোটি ৮৮ লাখ ৩১ হাজার ৮৫৫ টাকা ধরা হয়।

ভবনের রড, ইট, বাইরের গস্নাস, গস্নাসের ফ্রেম, এমএস পাইপ, সিআই শিট, স্টিলের এঙ্গেল, বাউন্ডারি গ্রিল, বৈদু্যতিক মোটর, জেনারেটর, এয়ার কুলিং কমপ্রেসার, লিফট, চেয়ার, ফলস সিলিং, স্যানিটারি পণ্য এবং অগ্নিনির্গমন দরজা বিক্রি করে এ টাকা পাওয়া যাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়।

গত এপ্রিলে ভবনটি ভাঙা এবং ব্যবহারযোগ্য মালামাল কিনতে আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। আগ্রহীদের ২৪ এপ্রিল বিকাল ৪টার মধ্যে রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করতে বলা হয়।

তিন মাসের মধ্যে ভবন ভাঙার শর্ত দিয়ে ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বহুতল ভবন ভাঙার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। ভাঙার ব্যাপারে ক্রেতাকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভবন ভাঙার জন্য আলাদা কোনো অর্থ দেওয়া হবে না।

রাজউকের ওই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর পাঁচটি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব জমা দেয়।

এর মধ্যে মেসার্স সালাম অ্যান্ড ব্রাদার্স এক কোটি ৭০ লাখ টাকা, পিএনএস এন্টারপ্রাইজ ৫৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মেসার্স চন্দ্রপুরী এন্টারপ্রাইজ এক কোটি টাকা, ফোর স্টার এক কোটি ৫৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং মেসার্স সামিরা এন্টারপ্রাইজ ৩০ লাখ টাকা দর প্রস্তাব করে।

প্রথমে সর্বোচ্চ দরদাতা মেসার্স সালাম অ্যান্ড ব্রাদার্সকে কাজটি দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা অপারগতা জানালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে চট্টগ্রামের ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজ পায় কাজটি।

বিজিএমইএ ভবনকে হাতিরঝিল প্রকল্পের ‘ক্যান্সার’ আখ্যায়িত করে হাইকোর্ট ২০১১ সালে এক রায়ে ইমারতটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। পরে আপিল বিভাগেও তা বহাল থাকে।

সর্বোচ্চ আদালত বিজিএমইএ ভবন ভাঙার রায় দেওয়ার পর কয়েক দফায় সময় নিয়েছিল তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা। সর্বশেষ আদালতের দেওয়া সাত মাস সময়সীমা গত ১২ এপ্রিল শেষ হয়।

এরপর ১৫ এপ্রিল বিজিএমইএ ভবনের মালামাল সরিয়ে নিতে এক দিন সময় বেঁধে দেয় রাজউক। পরে সময় বাড়ানো হয় আরও। ভবনে থাকা ১৯টি প্রতিষ্ঠান তাদের মালামাল সরিয়ে নিলে বিজিএমএইএ ভবন বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দেয় রাজউক।

বিজিএমইএকে এত ছাড়!

বিজিএমইএ ভবন ভাঙতে সর্বোচ্চ আদালতে দেওয়া সময়সীমা শেষ হয় এ বছরের ১২ এপ্রিল। পরে ১৫ এপ্রিল বিজিএমইএ ভবনের মালামাল সরিয়ে নিতে এক দিন সময় বেঁধে দেয় রাজউক।

পরে সময় বাড়ানো হয় আরও এক দিন। ১৬ এপ্রিল ভবনে থাকা ১৯টি প্রতিষ্ঠান তাদের মালামাল সরিয়ে নিলে বিজিএমএইএ ভবন বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দেয় রাজউক।

মাঝে এক দিন ১৭ এপ্রিল মালামাল সরিয়ে নেওয়ার কাজ বন্ধ থাকে। ১৮ এপ্রিল থেকে আবার মালামাল সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করে বিজিএমইএ। বিজিএমইএর আবেদনে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত মালামাল সরিয়ে নিতে সময় দেয় রাউজক।

ভবন ভাঙার নিলামের পর এ মাসের ১৫ এপ্রিল ফোর স্টার এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয় রাজউক। গত সপ্তাহে রাজউক কর্মকর্তারা জানান, এক সপ্তাহের মধ্যে ভবন ভাঙার কাজ শুরু হবে।

তবে ভবন ভাঙার কাজ শুরুর আগে ২১ অক্টোবর আবার ভবনে থাকা মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করে বিজিএমইএর কর্মীরা।

এর পরদিন ২২ অক্টোবর বিজিএমইএর সভাপতিকে আরেকটি চিঠি পাঠায় হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক।

চিঠিতে বিজিএমইএর জিনিসপত্র থাকলে ২২ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে ‘অতি অল্প’ সময়ের মধ্যে তা সরিয়ে নিতে অনুরোধ জানানো হয়। তা না হলে ভবন ভাঙার সময় ভবনে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না বলে জানানো হয় চিঠিতে।

তবে রাজউকের দেওয়ার ‘অতি অল্প’ সময় ২৬ অক্টোবরও চলতে দেখা যায়।

শনিবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বিজিএমইএ ভবনের সামনে কয়েকটি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ভবনের নিচতলায় ট্রাকে মালামাল তোলা হচ্ছে। দরজায় পাহারা দিচ্ছে বিজিএমইএর নিরাপত্তাকর্মীরা। সেখানে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না তারা।

মালামাল সরিয়ে নেওয়ার কাজ তদারক করছিলেন বিজিএমইএর সদস্য মোহাম্মদ মঞ্জু মিয়া। তিনি বলেন, মালামাল সরিয়ে নিতে তাদের আরও সময় লাগবে।

সময়সীমা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের আগামী মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত টার্গেট।’

এর আগেও সময় দেওয়া হয়েছিল, এখন আবার এত সময় পাবেন কি না- প্রশ্নে মঞ্জু মিয়া বলেন, ‘ওনারা এক দিন সময় দিয়েছেন। আমরা ৩০ দিন সময় চেয়েছি। আমরা ৩০ দিনের টার্গেট নিয়েই কাজ করছি। আশা করছি, রাজউক অ্যাপ্রুভ করবে। অ্যাপ্রুভ না করলে তো আমরা কাজ করতে পারতাম না।’

মন্তব্য