আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
আজ কাল করতে করতে পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের ২৫ বছর পার

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের কাজ গত ২৫ বছরেও শেষ করতে পারেনি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক। এতে এ প্রকল্পের গ্রাহকরা হতাশায় দিন কাটছে। রাজউক থেকেও তাদের নির্দিষ্ট করে কিছু বলছে না। তবে প্রকল্পটির প্রায় ২৮ শতাংশ জমি এখন অন্যের দখলে থাকলেও তা উদ্ধার করছে না রাজউক। আজ না কাল করতে করতে ২৫ বছর পার করায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছে সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৫ রাজউক পূর্বাচল নতুন শহর নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়। ২০০৫ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও গত ২৫ বছরে প্রকল্পটির ৭৫ থেকে ৮০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ কবে শেষ হবে তার সঠিক জবাব দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। 
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের কালীগঞ্জ এলাকায় মোট ৬ হাজার ২৭৭ একর জমিতে পূর্বাচল নতুন শহর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। 
এ ছাড়া খিলক্ষেত এলাকার ১৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে কুড়িল-পূর্বাচল’ ৩০০ ফুট সংযোগ সড়ক তৈরি করা হয়েছে।  প্রকল্পের মোট জমির ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আবাসন খাতে। ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বাণিজ্যিক প্লট, প্রশাসনিক কর্মকান্ডে ব্যবহারের জন্য ১ দশমিক ৯ শতাংশ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ২ শতাংশ এবং গবেষণা ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য ২ দশমিক ৩ শতাংশ জায়গা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। 
এর বাইরে সড়ক যোগাযোগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ, বাণিজ্য ও সামাজিক অবকাঠামোর জন্য ৯ দশমিক ১, লেক ৬ দশমিক ৬, বন, বাস্তু উদ্যান ও সবুজ নগরায়ণের জন্য ৫ দশমিক ৯ এবং খেলাধুলার জন্য ২ দশমিক ৮ শতাংশ জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর একটি। যে কারণে সবাই আশা করেছিল নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে; কিন্তু সংশ্লিষ্টরা জানান, নানা কারণে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে। জমি অধিগ্রহণ, মামলাতেই চলে যায় প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত মেয়াদের বড় অংশ। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ অংশের জমি অধিগ্রহণ ২০০৩ সালে শেষ হলেও গাজীপুর অংশের জমি অধিগ্রহণ করতে ২০০৯ সাল পর্যন্ত লেগে যায়। 
এ ছাড়া, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার বড় কারণ। যে কারণে বারবার সময় বাড়িয়েও কাজ শেষ হয়নি। সর্বশেষ নতুন সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২০ সালের জুন।  তবে এ সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ হওয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে রাজউক।  
এদিকে, প্রকল্পের ২৮ শতাংশ জমি এখনো স্থানীয়দের দখলে রয়েছে। এরমধ্যে গাজীপুর অংশে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ও রূপগঞ্জে ১০ শতাংশ জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৫ হাজার লোকের অবস্থান রয়েছে। তারা এখানে বসবাসের পাশাপাশি চাষাবাদ করেন। অথচ এসব জায়গা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।  প্রকল্পের কালীগঞ্জ (গাজীপুর) অংশে পরিবার নিয়ে বাস করেন রহিম। তিনি বলেন, প্রকল্পে তাদের জমি পড়ায় সরকার তাদের ৫ কাঠার একটি প্লট দিয়েছে। কিন্তু কবে সে প্লট তারা বুঝে পাবেন জানেন না। তিনি বলেন, প্লট বুঝে না পেলে তিনি প্রকল্পের এ জায়গা ছেড়ে যাবেন না। এভাবে অনেকেই জমি দখল করে আছে।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে ও প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও সূত্রের কাছে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা রীতিমতো হতাশাজনক। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় বাড়ছে ব্যয়। শুরুতে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। 
গত দুই দশকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। বাড়তি ব্যয়ের পুরোটাই বহন করতে হচ্ছে প্লট গ্রহীতাদের; কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে কেন এই দীর্ঘসূত্রতা এ নিয়ে যেন অভিযোগের শেষ নেই। 
অন্যদিকে, দেশের সর্ববৃহৎ ১৪২ তলা ভবন নির্মাণ হওয়ার কথা এ পূর্বাচলেই। কিন্তু যখন পুরো প্রকল্পই ধীরগতি সেখানে এ ভবন নির্মাণের কি অবস্থা তা এমনিতেই বুঝা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভবন নির্মাণে ভাটা পড়েছে। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এখনো সিভিল এভিয়েশনের ছাড়পত্র পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া পূর্বাচলের মাটি এত উঁচু ভবন নির্মাণের উপযুক্ত কি না সে বিষয়ে বুয়েটের পরামর্শ চাওয়া হয়েছে।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের এক কর্মকর্তা বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এখনো সিভিল এভিয়েশনের ছাড়পত্র পাওয়া যায়নি। আশা করছি, খুব শিগগির ছাড়পত্র পাওয়া যাবে। 
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পূর্বাচল প্রকল্পের ৫৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। মোট ২৭ হাজার প্লটের মধ্যে ১৩ হাজার প্লট গ্রহীতাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া নক্শা অনুমোদন দেওয়া শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ৫/৭টি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। 
স্থপতি ও সেক্টর কমান্ডার ফোরামের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোবাশ্বের হোসেন বলেন, এ প্রকল্পটি নিয়ে আমরা কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। প্রকল্প গত ২৫ বছরেও কেন বাস্তবায়ন হয়নি তার জবাব কেউ দিচ্ছে না। 
তিনি বলেন, পৃথিবীর কোথাও প্লট বিক্রি হয় না, ফ্ল্যাট বিক্রি হয়। তিনি বলেন, একজনকে একটা প্লট দেওয়া মানে তাকে ২০টা ফ্ল্যাট দেওয়া। কিন্তু একজনেরতো একটি ফ্ল্যাট দরকার। আমরা বহুতল ভবন নির্মাণ করে বাকি জায়গায় গাছপালা লাগাতে পারি।  ভোরের ডাক

মন্তব্য