আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
ঘোষণা
আবাসন সম্পর্কিত যেকোনো নিউজ পাঠাতে পারেন আমাদের এই মেইলে- abasonbarta2016@gmail.com
করোনায় আবাসনখাতে ধস

করোনার কারণে ধস নেমেছে দেশের আবাসনখাতে। পুঁজির সবটা বিনিয়োগ করে ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত থাকলেও গত এক মাসে দুই একটি বিক্রি হলেও অধিকাংশই পড়ে আছে। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা হিসাব কষে জানিয়েছেন, আবাসনখাতের সঙ্গে রড, বালি, সিমেন্ট থেকে প্রায় দু’শর বেশি পশ্চাদসংযোগ শিল্প জড়িত। তাই আবাসনখাত স্থবির হয়ে পড়লে সমগ্র অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আবাসনখাতে গতি আনতে এখনই ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।  

আবাসনখাতের সংগঠন রিয়েল এস্টেট এ্যান্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) এর সহ সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা বাংলাদেশে আঘাত হানার পর গত এক মাসে বাংলাদেশে কোন ফ্ল্যাট বিক্রি হয়নি বললেই চলে। কিনে এখনই বসবাস করতে পারবে এমন অনেক ফ্ল্যাট সারা দেশে প্রস্তুত আছে। এসব ফ্ল্যাট প্রস্তুত করতে গিয়ে আবাসনখাতের ব্যবসায়ীদের পুঁজির বড় অংশ বিনিয়োগ করতে হয়েছে। ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে না, বিনিয়োগও ফেরত আসছে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১২ সালে আবাসনখাতে ধ্স নামে। এ অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে প্রায় চার বছর সময় লেগেছে। করোনা ব্যাধি কবে শেষ হবে তা কেউ জানে না। তাই আবাসনখাতের বর্তমান স্থবিরতা দূর করতে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।

আবাসনখাতের ব্যবসায়ীদের লোকসান না করিয়ে কিভাবে ফ্ল্যাটের দাম কমানো যায় তা সরকারকে ভেবে দেখতে হবে এমন পরামর্শ দিয়ে অর্থনীতির এ বিশ্লেষক বলেন, আবাসনখাতের ব্যবসায়ীদের কম দামে ফ্ল্যাট বানানোর সুযোগ দিতে হবে। এজন্য সরকারকে বিভিন্ন ছাড় দিতে হবে। অর্থনীতির সূত্রানুসারে কম দামে ফ্ল্যাট পেলে সাধারণ ক্রেতারা কিনতে আগ্রহী হবে। আবাসনখাতের স্থবিরতা কেটে যাবে।   

গত কয়েক অর্থ বছর থেকে আবাসনখাতের ব্যবসায়ীরা ফ্ল্যাট-প্লট নিবন্ধন ফি ও কর কমিয়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণের দাবী জানিয়ে আসলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

চলতি অর্থ বছরের (২০১৯-২০) বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ণের আগে রিহ্যাব থেকে এনবিআরে আবেদন জানিয়ে গেইন ট্যাক্স ২ শতাংশ, ষ্ট্যাম্প ফি ১.৫ শতাংশ, নিবন্ধন ফি ১ শতাংশ, স্থানীয় সরকার কর ১ শতাংশ, মূসক ১.৫ শতাংশ এভাবে মোট ৭ শতাংশ নির্ধারণে জোরালো দাবী জানানো হয়। এ দাবীর প্রেক্ষিতে গত ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার কর ২ থেকে ১.৫ শতাংশ এবং ষ্ট্যাম্প ফি ৩ থেকে ১.৫ শতাংশ কমানো হয়। এতে ফি ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ১২ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে। 

রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, গত কয়েক বছর থেকে ফ্ল্যাট এবং জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে  অতিমাত্রার নিবন্ধন ব্যয় ধার্য আছে। আমরা এ ফি ৭ শতাংশ নির্ধারণে দাবী করলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। নিবন্ধন ফি বেশি থাকায় পুরানো ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে পুনরায় নতুন ফ্ল্যাটের সমান নিবন্ধন ব্যয় করতে হয়, যা অযৌক্তিক। করোনার কারণে আবাসনখাতের স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা এখন সময়ের দাবী।   

সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের নিবন্ধন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের নিবন্ধন ব্যয় ৪-৭ শতাংশ এর বেশি না।

আবাসন ব্যবসায়ীরা গৃহায়ণ শিল্পের উদ্যোক্তাদের আয়কর হ্রাস এবং অর্থ পাচার রোধে কোন শর্ত ছাড়া আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

গত দুই বছর থেকে আবাসন শিল্প জটিল সংকটে আবর্তিত হচ্ছে। করোনার সংকটে এ পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। করোনার আঘাতে অধিকাংশ ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। আবাসনখাতকে বাঁচাতে হলে নির্মাণ ব্যয় হ্রাস ও আনুষঙ্গিক ব্যয় কমাতে নির্দিষ্ট মূসক হ্রাস করার প্রয়োজন জানিয়ে রিহ্যাব থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ জাতীয় ব্যয় হ্রাস করা হলে স্বল্প মূল্যে ক্রেতা সাধারণকে তাদের সামর্থ্যের মধ্যে আবাসন সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে আবাসনখাত স্থবিরতা থেকে মুক্তি পাবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।

গৃহায়ণ শিল্পের উদ্যোক্তাদের আয়কর হ্রাসের বিষয়ে সংশ্লিষ্টখাতের ব্যবসায়ীরা বলেন, গৃহায়ন শিল্পের বেসরকারী বিনিয়োগকারীরা এই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। অধিকাংশ ডেভেলপাররা অতি উচ্চসুদে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে করোনা সংমক্রমণে অর্থনীতিতে নেতিবাচক আঘাত হানায় তাদের পক্ষে ব্যাংক ঋণ ও সুদ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আয়করের উচ্চ হারের কারণে ক্রেতারা আগ্রহ হারাচ্ছে। এ বিষয়গুলিও সরকারের বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রিহ্যাব এর সহ সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, করোনা ব্যাধির মহামারির সময়ে আবাসনখাতের ব্যবসায়ীরা যেহেতু ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারছে না। তাই আবাসনখাতের ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ, সুদের হার কমানো বা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে সময় বাড়ানো প্রয়োজন। ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ থাকায় যে সব ক্রেতারা কিস্তিতে ফ্ল্যাট কিনেছিল তারাও এখন আর কিস্তি দিতে পারছে না।   

বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনকে তহবিল প্রদানের মাধ্যমে আবাসন খাতের ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি করার সুপারিশ করেন ব্যবসায়ীরা। আবাসন খাতের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে এই খাতকে আরো গতিশীল এবং সত্যিকার অর্থে স্বল্প আয়ের মানুষের মাথা গোঁজার স্বপ্নকে সার্থক করতে ক্রেতা সাধারণের জন্য অন্তত একটি ফ্ল্যাট কিনতে সহজ শর্তে সর্বোচ্চ একক অংকে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণের টাকা কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা করার দাবী করেন অনেকে।  এক্ষেত্রে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনকে সরকার একটি তহবিল প্রদান করে স্বল্প সুদে দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ সরবরাহ করতে পারে বলেও মতামত জানান আবাসনখাতের ব্যবসায়ীরা।

করোনাকালিন সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে আবাসনখাতের ক্রেতা, জমির মালিক ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অসমাপ্ত প্রকল্পগুলোতে বিশেষ ঋণের প্রচলন করা, সাপ্লায়ার ভ্যাট ও উৎস কর সংগ্রহের দায়িত্ব থেকে ৫ বৎসরের জন্য ডেভেলপারদেরকে অব্যহতি দেয়া প্রয়োজন বলে অনেকে মনে করেন। ঢাকা জেলাসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটন এলাকা, ক্যান্টন্মেন্ট এলাকার মধ্যে ৫ বৎসরের জন্য এবং পৌরসভার বাইরের এলাকাতে নগরায়নকে উৎসাহিত করতে ১০ বৎসরের জন্য “ট্র্যাক্স হলিডে” ব্যবস্থা প্রবর্তন করার কথা অনেকে বলেছেন।  নামমাত্র নিবন্ধন ব্যয় নির্ধারণ করে আবাসন খাতে “সেকেন্ডারি বাজার” ব্যবস্থার প্রচলন করা প্রয়োজন বলেও আবাসনখাতের ব্যবসায়ীরা দাবী করেন। কালের কণ্ঠ

মন্তব্য