আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
ঘোষণা
আবাসন সম্পর্কিত যেকোনো নিউজ পাঠাতে পারেন আমাদের এই মেইলে- abasonbarta2016@gmail.com
বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে আবাসন খাত

অনেকটা নীরবেই মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভূমিকা রাখছে দেশের আবাসন শিল্প খাত। মানুষের মৌলিক অধিকার বাসস্থান নিশ্চিত করা এ শিল্পে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে। গত কয়েক বছরের মন্দাভাব কাটিয়ে যখন আবাসন শিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখন করোনার আঘাতে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক সংকটে পড়েছে খাতটি। আবাসন ব্যবসার সঙ্গে ২৬৯টি শিল্প উপখাতে (লিংকেজ প্রতিষ্ঠান) ওতপ্রোতভাবে জড়িত প্রায় সাড়ে ১২ হাজার প্রতিষ্ঠানও পড়েছে মারাত্মক হুমকিতে। দক্ষ/অদক্ষ মিলিয়ে এ খাতে জীবিকা নির্বাহ করা ২৫-৩০ লাখ মানুষেরও বেকার হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

করোনা পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে আবাসন খাতের। এ অবস্থায় সরকারি সহযোগিতা পেতে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্টদের কাছে আবেদন করেছে আবাসন খাতের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)।

আবাসন ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এ শিল্পকে রক্ষা করতে প্লট ও ফ্ল্যাটে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো শর্ত ছাড়াই অপ্রদর্শিত আয় (কালো টাকা) বিনিয়োগের সুযোগ দিলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। তারা জানান, রিহ্যাবের সদস্য রয়েছে ১ হাজার ১টি প্রতিষ্ঠান। এর বাইরেও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এ ব্যবসায়। তবে সব মিলিয়ে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেরই কাজ করোনা পরিস্থিতির কারণে বন্ধ হয়ে আছে। করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট কারিগরি জনবল ও শ্রমিক কাজে আসছে না। আবার নির্মাণসংক্রান্ত উপকরণ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সব মিলিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া এ কাজ আবার কবে নাগাদ চালু হতে পারে তাও ঠিকমতো বলা যাচ্ছে না।

রিহ্যাবের তথ্যমতে, সংগঠনটির তালিকাভুক্ত সদস্যরা প্রতিবছর ১৫ হাজার থেকে ১৭ হাজার ফ্ল্যাট সরবরাহ করে থাকে, যার এক-তৃতীয়াংশই বিক্রি হয় প্রবাসীদের কাছে। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন হয় এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্বও বাড়ে। চলমান এই পরিস্থিতিতে প্রবাসীরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তারা এখন আর আবাসন খাতে বিনিয়োগ খুব একটা করবে না। আবার রড, সিমেন্টসহ অন্যান্য উপকরণের দাম যদি বেড়ে যায়, তাহলে ব্যবসায়ীরা আরও ক্ষতির মুখে পড়বে।

আবাসন ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো ও ঋণসুবিধা দেওয়ার পর অনেকটাই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল আবাসন খাত। ২০১৯ সালের রিহ্যাব ফেয়ারে ৪৯৮টি ফ্ল্যাট ও ১০৯টি প্লট বুকিং হয়। এর বেশিরভাগই কিস্তিতে বুকিং দেয় ক্রেতারা। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বেশকিছু ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু এ অবস্থায় কাজ থেমে থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। আবার ক্রেতাদের কাছ এ কিস্তিগুলোও ঠিকমতো আসছে না। ফলে বৈশ্বিক এ করোনা পরিস্থিতি এ ব্যবসাকে আবার কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে তা বলা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে অনেকের ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।

একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন প্রকৌশলী মো. তাজুল ইসলাম টিটু। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই মুহূর্তে ১৫টি প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে ৫টির দুয়েক মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। আর কিছু কাজ করতে পারলেই ক্রেতাদের কাছে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু এখন শ্রমিক ও নির্মাণ উপকরণ না পাওয়ায় কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত দিন লাগবে তাও বোঝা যাচ্ছে না। আর তখন শ্রমিক পাওয়া গেলও নির্মাণ উপকরণের যদি দাম বেড়ে যায়, তাহলে পড়তে হবে আরেক ঝামেলায়। ক্রেতারা তো আর বাড়তি দাম দিতে চাইবে না।’

আবাসন ব্যবসায়ীরা জানান, ১/১১-এর পর ২০০৮ সালে এ খাত বেশি সমস্যায় ছিল। তখন তারা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছিল, উন্নত আবাসন ব্যবস্থা উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অর্থনীতির সঙ্গে ১৪টি খাত সরাসরি জড়িত। এর মধ্যে আবাসনশিল্পের অবস্থান তৃতীয়। আগামী ২০ বছরে বাংলাদেশে ৪০ লাখ আবাসন দরকার হবে। তাই আবাসন খাতের সঙ্গে জড়িত ২৬৯টি শিল্প-উপখাতের সমস্যা সমাধানে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এই মুহূর্তে আবাসন ব্যবসায়ীদের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে পারলে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ভালো সমাধান আসতে পারে। এভাবে চলতে থাকলে বেশি সময় লাগবে না আবাসন শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে।

বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশনের এক নেতা বলেন, নানা কারণে আবাসন খাতে জটিলতা কাটছেই না। যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বই স্টিলে ভর্তুকি দেয়। আমাদের দেশে তা নেই। বাংলাদেশ ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা মো. আবু বকর বলেন, দেশে বর্তমানে ছয় হাজারের বেশি ইটভাটা আছে। এসব ভাটায় লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করে। দেশের আবাসন খাত সচল না থাকলে ইটভাটাও অচল হয়ে যাবে। একই কথা বলেন বাংলাদেশ পাথর ব্যবসায়ী সমিতির নেতা হাজি আবদুল আহাদ ও বাংলাদেশ পেইন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি প্রকৌশলী আবদুর রহমান। তারা বলেন, আবাসন খাত স্থবির হয়ে পড়লে রঙের বাজার থমকে যাবে। সেই সঙ্গে হাজার হাজার রংমিস্ত্রি বেকার হয়ে যাবে।

বতমান পরিস্থিতিতে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের পক্ষ থেকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর সামসুল আলামীন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, বিশ্বে করোনাভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী যে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন সেজন্য রিহ্যাবের পক্ষ থেকে স্বাগত জানাচ্ছি। বৈশ্বিক এই সংকটে সারা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় এই আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ একটি সময় উপযোগী এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রিয়েল এস্টেট খাত। কারণ এই খাতের সঙ্গে অনেকগুলো লিংকেজ শিল্প জড়িত। আবাসন শিল্পের সঙ্গে ৩৫ লাখ নাগরিকের কর্মসংস্থান জড়িত। ডেইলি বেসিস এখানে কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করে। আবাসন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য খাতেও এর প্রভাব পড়বে।’

চিঠিতে তিনি বলেন, ‘আবাসন ব্যবসায়ীদের বিদ্যমান ঋণের সুদ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত মওকুফ ও সহজ শর্তে পুনঃতফসিল করা খুবই জরুরি দরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘ মেয়াদি সংকট নিরসনে আবাসন শিল্পে ২০০৭-০৮ সালের ন্যায় হাউজিং রি-ফিন্যান্সিং স্কিম পুনঃপ্রচলন অতি আবশ্যক।  রিহ্যাব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, এফবিসিসিআই এবং এনবিআরের সমন্বয়ে গঠিত ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় বাংলাদেশের আবাসন শিল্পের সমস্যা সমাধান এবং সার্বিক উন্নয়নের নিমিত্তে গৃহীত সুপারিশসমূহ অবিলম্বে বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করছি।’

রূপায়ণ রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অপারেশন্স) মিজানুর রহমান দেওয়ান বলেন, ‘করোনার সময়ে আবাসন ব্যবসায়ীরা বেশি সংকটে পড়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পের প্রচারও করা যাচ্ছে না। আবার যেসব ক্রেতা ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী ছিলেন তাদের সাথে এই মুহূর্তে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বল্প পরিসরে কিছু কাজ করার চেষ্টা করছি। তবে তা বড় প্রকল্প শেষ করতে যথেষ্ট নয়। আশা করছি, সরকার অন্যান্য খাতের মতো আবাসন শিল্পেও প্রণোদনা ঘোষণা করবে।’

রিহ্যাবের সহসভাপতি-১ লিয়াকত আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মুহর্তে সবচেয়ে সংকটে আছে আবাসন খাত। কিস্তিতে বিক্রি করা ফ্ল্যাটগুলোর মাসিক কিস্তি আসা বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণও পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রমিক কাজে আসছে না। সময় মতো ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা নিয়েও অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে এ খাতের ব্যবসায়ীরা রয়েছে চরম বিপদে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ চেয়েছি। এ টাকা পেলে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবে।’

ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট (প্রা.) লিমিটেডের সিনিয়র উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের গোটা বিশ্ব আজ আক্রান্ত। এর প্রভাব বাংলাদেশের সব সেক্টরেই কম বেশি পড়ছে। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আবাসন খাত। বেশিরভাগ মানুষ নিজের মাসিক আয় থেকে কিছুটা সঞ্চয় করে একটি ফ্ল্যাট বা প্লটে কেনেন। এখন সেই মানুষগুলো আর বিনিয়োগ না করে নিজেদের সঞ্চয়ের টাকা দুঃসময়ের জন্য রেখে দেবেন। আবার করোনার থাবায় বিশ্ববাজারের অবস্থা ভালো নয়। আমাদের যেসব প্রবাসী আছেন তারাই এ খাতে এখন বিনিয়োগ করতে পারবে না। ফলে এ ধরনের ক্রেতাগুলো আর পাবে না আবাসন ব্যবসায়ীরা।  তিনি বলেন, এ দুর্যোগের সময়ে ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য আবাসন খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে কোনো শর্ত ছাড়াই। এখনো কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে সরকারের একটি বিশেষ সংস্থা এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কারোনার সময় আবাসন খাতে বিনিয়োগ করলে যেন সরকারের কোনো সংস্থা প্রশ্ন তুলতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই ভালো ফল পাওয়া যাবে। দেশরূপান্তর

মন্তব্য