আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
রাজধানীতে বহুতল ভবনের উচ্চতা নতুন নিয়মে
রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমণ্ডির মতো এলাকায় সর্বোচ্চ ১৪ তলা পর্যন্ত আবাসিক ভবন করা গেলেও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) তা বদলে যাচ্ছে।

জনঘনত্ব অনুযায়ী নতুন পরিকল্পনায় এসব এলাকায় সর্বোচ্চ আট তলা ভবন নির্মাণের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে জমির ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ উন্মুক্ত রাখলে ভবনের উচ্চতা বাড়ানোর সুযোগও থাকছে এতে।

রাজধানীর ওপর থেকে চাপ কমাতে নগর পরিকল্পনাবিদরা ভবনের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও তাতে আপত্তি তুলেছে আবাসন ব্যবায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব।    

গত ২ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন ড্যাপের খসড়া প্রকাশ করে। এখন নতুন ড্যাপের বিষয়ে অংশীজনদের মতামত নিচ্ছে রাজউক। অনলাইনে রাজউকের ওয়েবসাইটে ও সরাসরি রাজউক কার্যালয়ে গিয়ে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত মতামত দেওয়ার ‍সুযোগ রয়েছে।

খসড়ায় পুরো ড্যাপ অঞ্চলকে ৪৬৮টি কমিউনিটি ব্লকে ভাগ করে প্রতিটি ব্লকের জন্য সর্বোচ্চ অনুমোদনযোগ্য উচ্চতা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কমিউনিটি ব্লকে ভাগ করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এলাকার বিদ্যমান জনসংখ্যা ধারণক্ষমতা, সড়ক অবকাঠামোর ধারণক্ষমতা, নাগরিক সুবিধা, উন্নয়নের মাত্রা বা ধরণ, পুরো অঞ্চলে আবাসিক এলাকার পরিমাণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কমিউনিটি ব্লকের সর্বোচ্চ জনসংখ্যা ধরা হয়েছে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার।

জনঘনত্ব অনুযায়ী ভবনের এমন উচ্চতা নির্ধারণের পাশাপাশি জরিমানা দিয়ে অবৈধ ভবন বৈধ করা, ভূমির পুনঃউন্নয়ন, ‍ভূমি পুনর্বিন্যাস, উন্নয়ন, স্বত্ত্ব প্রতিস্থাপন পন্থা (জলাশয় রক্ষাসংক্রান্ত পরিকল্পনা) ট্রানজিটভিত্তিক (পরিবহনের স্টেশন) উন্নয়নসহ নতুন কিছু বিষয় যোগ হয়েছে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে।

রাজউকের চেয়ারম্যান মো.সাঈদ নূর আলম জানিয়েছেন, অংশীজনদের মতামত নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হবে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “প্রাথমিক শুনানির পরে আরও কিছু কাজ আছে, সেগুলো শেষ করে ডিসেম্বরে ড্যাপ চূড়ান্ত করে ফেলব। এগুলো কম্পাইল করা, কো-অর্ডিনেট করা, এগুলো সুপারিশ অনুযায়ী চূড়ান্ত করতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগবে।”

নতুন ড্যাপ কার্যকর হলে ২০১০ সালে পাস হওয়া আগের ড্যাপের কার্যকারিতা আর থাকবে না। নতুন ড্যাপের মেয়াদ হবে ২০ বছর।

কোন এলাকায় সর্বোচ্চ কত তলা?

নতুন ড্যাপের সুপারিশ অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কুড়িল, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ এলাকায় ছয়তলা, উত্তরা এলাকায় ছয়-সাত তলা, গুলশান-বনানী-বারিধারায় ছয়-আট তলা, মিরপুর এলাকায় চার-সাত তলা, মোহাম্মদপুর-লালমাটিয়া এলাকায় পাঁচ-আট তলা উচ্চতার ভবন নির্মাণ করা যাবে।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পুরান ঢাকায় চার-ছয় তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ করা যাবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজউকের আওতাধীন নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং সাভার পৌর এলাকায় আবাসিক ভবনের সর্বোচ্চ উচ্চতা হবে ছয় তলা।

রাজধানীতে ২০১০ সালের ড্যাপ ও ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসারে এখন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০০৮ সালে করা এই বিধিমালায় জমির আয়তন অনুযায়ী কত তলা বা উচ্চতার ভবন নির্মাণ করা যাবে, তা উল্লেখ আছে।

নতুন ড্যাপে জনঘনত্ব অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা নির্ধারণের গুরুত্বের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর থেকে ড্যাপ এলাকার জনঘনত্বের পরিস্থিতি নাজুক হয়ে গেছে। সবক্ষেত্রে এফএআর বা ফ্লোর এরিয়া রেশিও অনুযায়ী ভবনের উচ্চতার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬ অনুযায়ী তিন মিটার প্রশস্ত একটি সড়কের পাশে তিন কাঠা জমিতে তিন তলা ভবনের অনুমোদন পাওয়া যায়। আর ২০০৮ সালে বিধিমালায় একই প্লটে আট তলা পর্যন্ত ভবন করা যায়।

“ফলে রাজউক সীমানার ভেতরে বহুতল ভবনগুলো পরিবেশের ওপর, বিশেষ করে সরু রাস্তা বরাবর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যথাযথ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অভাবই এই পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।”

এ কারণেই জনঘনত্ব অনুযায়ী আবাসিক ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব হিসাব করে ভবনের সর্বোচ্চ উচ্চতা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে আট তলার বেশি উচ্চতার ভবন করা যাবে না বিষয়টি এমন নয়। শর্তসাপেক্ষে আরও উঁচু ভবন তৈরির সুযোগ ড্যাপে রাখা হয়েছে।

“ড্যাপের ১৪ শতাংশ জায়গাকে প্রস্তাবিত পিওডি জোন (ট্রান্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট) হিসেবে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। যেখানে মেট্রো রেলের স্টেশন হবে, সেসব স্টেশনের ৫০০ মিটার ক্যাচমেন্টের মধ্যে পিওডি জোন করা হচ্ছে। এখানে আবাসিক ভবন বহুতল করা যাবে। কোনো কোনো ব্লকে কেউ যদি ৬০ শতাংশ জায়গা ছেড়ে দেয় তাহলে সেখানে বহুতল ভবন করতে পারবে।”

জমি বেশি ছাড়লে বেশি উচ্চতা

নতুন ড্যাপে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে ব্লকভিত্তিক বা ভূমি পুনঃউন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নের সুপারিশ রয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ন্যূনতম ০.৬৬ একর আয়তনের ব্লক বা জমির ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ খোলা জায়গা রাখলে সেখানে সর্বোচ্চ ১০ তলা ভবন করা যাবে। দুই থেকে পাঁচ একর ব্লকে ৫০ শতাংশ খালি জায়গা রেখে সর্বোচ্চ ১৫ তলা ভবন করা যাবে। আর পাঁচ একরের বেশি আয়তনের ব্লকের ৬০ শতাংশ খালি রাখলে সেখানে উচ্চতা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই ব্লকের আওতাভুক্ত এলাকার জমিকে প্লট হিসেবে ভাগ করা যাবে না।

শর্ত দেওয়া হয়েছে, এসব খালি জায়গায় উন্মুক্ত স্থান, মাঠ বা পার্কের জন্য ছাড়তে হবে। সেখানে কোনো আচ্ছাদন রাখা যাবে না। উন্মুক্ত স্থান ছাড়াও ভবনের সামনে দেড় মিটার, পেছনে তিন মিটার এবং উভয় পাশে তিন মিটার জায়গা সেটব্যাক হিসেবে রাখতে হবে।

পক্ষে পরিকল্পনাবিদরা, আপত্তি রিহ্যাবের

আবাসিক ভবনের উচ্চতার নতুন নিয়মের বিরোধিতা করছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে আবাসিক ভবনের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

গত রোববার নিজেদের মতামত জানাতে ড্যাপ কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছেন রিহ্যাব নেতারা। বৈঠকে আবাসিক ভবনের সর্বোচ্চ উচ্চতাসহ কিছু বিষয়ে রিহ্যাবের সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন, নতুন ড্যাপে বেশকিছু ভালো দিকও রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, “বর্তমান বিধিমালায় চার ফুট সড়কের পাশের ভবনের নকশা অনুমোদন করত না রাজউক। নতুন ড্যাপে শর্তসাপেক্ষে বহুতল ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে পুরনো ঢাকার অনেক এলাকায় সুযোগ তৈরি হয়েছে।”

তিনি বলেন, রিহ্যাবের দাবি অনুমোদিত উচ্চতা হতে হবে জমির আকার ও সড়কের প্রশস্ততা অনুযায়ী।

“সড়ক যদি প্রশস্ত থাকে, বড় পরিসরের জমি হলে তো রেস্ট্রিক্ট করা যাবে না। এ ধরনের কিছু বিষয় নিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ দিয়েছি। আমরা উনাদের সঙ্গে আরেকটি বৈঠক করব, সেখানেও আমাদের বিশদ আলোচনা করে আরও পর্যবেক্ষণ জানাব।

“জনস্বার্থে হলে অবশ্যই ওয়েলকাম করব, জনস্বার্থবিরোধী হলে আমরা ড্যাপকে গ্রহণ করব না।”

রিহ্যাবের আপত্তির বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান মো.সাঈদ নূর আলম বলেন, “তারা বড় স্টেকহোল্ডার। তারাসহ যেসব সুপারিশ আসবে সে অনুযায়ী সংযোজন-বিয়োজনের পরই ড্যাপ চূড়ান্ত হবে।”

অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, ঢাকার বাসযোগ্যতা হারানোর অন্যতম কারণ হচ্ছে অধিক জনসংখ্যা এবং জনঘনত্ব নিয়ে কোনো পরিকল্পনা না থাকা। এ কারণে শহর ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে।

“জনঘনত্বের সঙ্গে শহরের ভবনের উচ্চতার একটা সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো এলাকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

“ড্যাপে আবাসিক ভবনের যে হাইট রেস্ট্রিকশন সেটা বৈশ্বিক অন্যান্য পরিকল্পনার সঙ্গে মিল রেখেই করা হয়েছে। এখানে যেটা নতুন করে যোগ করা প্রয়োজন, উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে প্লটভিত্তিক ডুয়েলিং ইউনিট (একটি ভবনে পরিবারের সংখ্যা), এটা সংযুক্ত করা হলে বিষয়টি পূর্ণতা পাবে।” বিডিনিউজ২৪

মন্তব্য