আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
প্রবাসীর প্লট প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে দিল রাজউক!

এক প্রবাসীর প্লট বাতিল করে সেটা আবার একজন প্রতিমন্ত্রীকে বরাদ্দ দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের ৩০০ ফুট প্রশস্ত সড়ক ঘেঁষেই প্লটটির অবস্থান। ১০ কাঠা আয়তনের ওই প্লটটির বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। ভুক্তভোগী প্রবাসী এখন রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তার প্লটটি পেয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সমকালকে বলেন, তার বাবা নামি ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কিন্তু তিনি প্লট নেননি। তিনি নিজেও প্লট নিতে চাননি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি রাজউকে প্লটের জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে রাজউকের কাউকে তিনি বলেননি অন্যের প্লট বাতিল করে তাকে প্লট দিতে।
ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমি এটাও রাজউকের কাউকে বলিনি যে ৩০০ ফুট রাস্তার পাশে ভালো লোকেশনে আমাকে প্লট দিতে হবে। ১০ কাঠার প্লট দিতে হবে- এটাও বলিনি। রাজউক এভাবে আরেকজনের প্লট বাতিল করে আমাকে দেবে জানলে আমি আবেদনই করতাম না। আসলে রাজউকের লোকজন খুব দুষ্ট। এ কাহিনি করে ওরা আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। এ বিষয়ে আমি রাজউকের সঙ্গে প্রয়োজনে কথা বলব।’
এ প্রসঙ্গে রাজউকের চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্যরা কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। চেয়ারম্যান সাঈদ নূর আলমের দপ্তরে গিয়ে কথা বলতে চাইলেও তিনি দেখা দেননি। মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি। খুদেবার্তা পাঠালেও তার কোনো জবাব দেননি। তবে রাজউক পরিচালনা বোর্ডের সদস্য (সম্পত্তি ও ভূমি) মুনির হোসেন খান সমকালকে বলেন, গত বোর্ড মিটিংয়ে প্রতিমন্ত্রীকে একটা প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু কোন প্লটটা দেওয়া হয়েছে, সেটা কাগজপত্র না দেখে কিছু বলা যাবে না। কারও প্লট বাতিল করে যদি দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে প্রয়োজনে ওই ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা হবে, যাতে তিনি বঞ্চিত না হন।
জানা যায়, রাজধানীর খ-১২/২ খিলক্ষেতের বাসিন্দা আবুল কাশেম মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ডাকোটায় প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। রাজউকে আবেদনের ভিত্তিতে ২০০২ সালে তিনি পূর্বাচল উপশহরের ৫ নম্বর সেক্টরের ১০৩ নম্বর রোডের ৩৫ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ পান। ইতোমধ্যে তিনি কিস্তির সব টাকাও পরিশোধ করেছেন। সম্প্রতি দেশে ফিরে প্লটটি রেজিস্ট্রি করে বুঝে নিতে চাইলে তাকে জানানো হয়, প্লটটির ফাইল গায়েব হয়ে গেছে। পরে পাভেল নামের এক পিয়নকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে গায়েব ফাইলটি উদ্ধার করেন তিনি। তখন রেজিস্ট্রি করে নিতে চাইলে তাকে বলা হয়, পুরো টাকা পরিশোধ করা হলেও একটা কিস্তি দিতে একটু দেরি হয়েছিল। এ জন্য হিসাব শাখার মতামত প্রয়োজন। এরপর হঠাৎ করেই রাজউকের ০৪/২০২০তম বোর্ড সভায় প্লটটি বাতিল করে দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তির অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর আবুল কাশেমকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়।
প্লট বাতিলের খবর জানার পর আবুল কাশেম তার সপক্ষে যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান-বোর্ড সদস্যদের কাছে যান। তারা তাকে আশ্বাস দেন একটা ভুল হয়ে গেছে। এটা ঠিক করে দেওয়া হবে। কিন্তু রাজউকের লোকজন ঠিক করতে গড়িমসি শুরু করেন। একপর্যায়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন আবুল কাশেম। রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আবুল কাশেম মোহাম্মদ সাইফুল্লাহকে প্লটটি বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশ হাতে হাতে রাজউকে নিয়ে তিনি জমা দিতে যান। কিন্তু রাজউক সেই আদেশনামা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। জানিয়ে দেয়, ডাকযোগে আদালত থেকে এলে তখনই সেটা ফাইলে সংযুক্ত করা হবে। এরপর ডাকযোগে আদালতের আদেশনামা রাজউকে পৌঁছলেও সেটা ফাইলে যুক্ত না করে ফেলে রাখে রাজউক।

নেপথ্যে প্রতিমন্ত্রীকে বরাদ্দ :এদিকে বেশ আগেই রাজউকের কাছে প্লট প্রাপ্তির আবেদন করেছিলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। তাকে একটি ভালো লোকেশনের বড় প্লট দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন রাজউকের চেয়ারম্যানসহ বোর্ড সদস্যরা। প্রতিমন্ত্রীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ০৬/২০২০তম বোর্ড সভায় রাজউক প্লট বরাদ্দ বিধিমালার ১৩/ক ধারায় ফরহাদ হোসেনকে সেই প্লটটি বরাদ্দ দেন। এ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজউক গুণী ব্যক্তিদের প্লট বরাদ্দ দিতে পারে, যদি তার ঢাকায় বসবাসের মতো কোনো জমি বা ফ্ল্যাট না থাকে। ওই বোর্ড সভায়ই রাজউক চেয়ারম্যান সাইদ নূর আলম উত্তরা তৃতীয় পর্বে নিজেও পাঁচ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ নেন। এরপরই আদালতের আদেশনামা ফাইলে যুক্ত করে রাজউক।

সমুদয় অর্থ পরিশোধের পরও বরাদ্দ বাতিল :আবুল কাশেম মোহাম্মদ সাইফুল্লাহর প্লটের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্লটের মোট দাম ৩৪ হাজার ৫৭৫ মার্কিন ডলার ২৫ সেন্ট। এর মধ্যে ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট তিনি ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন বাবদ জমা দেন তিন হাজার ১০ ডলার। ২০০৩ সালের ২২ মে প্রথম কিস্তি বাবদ জমা দেন এক হাজার ৫০০ ডলার। ২০০৫ সালের ১৯ অক্টোবর জমা দেন দ্বিতীয় কিস্তির সাত হাজার ৬৬৭ ডলার। কিন্তু রাজউক ওই টাকা গ্রহণ করেনি। কেন করেনি, তার কোনো সদুত্তর কেউ দিতে পারেননি। পরে সেটা সমন্বয় করে রাজউক বাকি টাকা গ্রহণ করে। ২০০৬ সালের ২৮ জুন জমা দেন আট হাজার ৮৯৮ ডলার। ২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বাকি ডলার জমা দেন।
আবুল কাশেম সাইফুল্লাহ বলেন, ‘সঠিকভাবে কিস্তির টাকা জমা দিলেও কেন দ্বিতীয় কিস্তির টাকা ফেরত গেল, সেটা আমি ব্যাংক ও রাজউকের কর্মকর্তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করেও কোনো সদুত্তর পাইনি। আমার কোনো ভুলত্রুটি হয়েছিল কিনা, তাও তারা বলতে পারেননি। পরবর্তী কিস্তিতে রাজউক সেটা সমন্বয় করে নেয়। অথচ আমার কোনো ত্রুটি না থাকলেও রাজউক কিস্তির টাকা জমা না নিয়ে সেই অজুহাতে আজ আমার প্লট বাতিল করল।’
অনুরূপ কারণ থাকলেও অন্যরা ঠিকই প্লট পেয়েছেন :একই সঙ্গে ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ পাওয়া আরও সাতজনেরও কিস্তির চেক গ্রহণ করেনি রাজউক। কিন্তু সেই সাতজনের প্রত্যেককেই প্লট বুঝিয়ে দিয়েছে রাজউক। তারা হলেন আবুল ফজল (কোড ২৮৬০), মজিবুর রহমান (কোড ২৮২৫), আফজাল এইচ খান (কোড ৩০৪৮), মাহবুবুল আলম (কোড ৩১৯৪), শাহ আলম (কোড ৩১৯৬), জাহান আক্তার (কোড ৩০২৫), দিলরুবা নাসরিন (কোড ২৯২৪)। কিন্তু আবুল কাশেমের প্লট বাতিল করেছে রাজউক।
সূত্র জানায়, অন্যদের প্লটের লোকেশন আবুল কাশেমের মতো এত ভালো ছিল না। যে কারণে রাজউক তাদের প্লট বাতিল করেনি। কিন্তু ভালো লোকেশনই আবুল কাশেমের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্লট পেতে হলে দিতে হবে উৎকোচ :ভুক্তভোগী আবুল কাশেম এই প্লট নিয়ে রাজউকের বিভিন্ন কর্মকর্তার দ্বারস্থ হচ্ছেন। এ অবস্থায় আইন শাখার অফিস সহকারী আবু সালেক শিকদার মন্টু তাকে আশ্বাস দেন, কিছু টাকা খরচ করলে রাজউক আর আপিল করবে না। তাহলে আপনাকে একটা প্লট দিয়ে দেবে। যদি আপিল করেন, তাহলে আপনি জীবনেও আর প্লট পাবেন না। কিন্তু কত টাকা দিতে হবে জানতে চাইলে মন্টু আপাতত তিন লাখ টাকা দাবি করেন। সেই টাকা দিতে হবে আইন কর্মকর্তা মাহমুদুল করিম ও পূর্বাচল প্রকল্পের উপপরিচালককে। এ বিষয়ে আবু সালেক শিকদার মন্টু সমকালকে বলেন, তাদের বলেছিলাম কিছু টাকা খরচ করলে প্লট পাবেন। কিন্তু তাদের যে কাজ করে দিয়েছি, সেই টাকা এখনও আমাকে দেননি। ফোন দিলে ফোনও ধরেন না। আর রাজউক কী রকম জায়গা তা তো আপনি জানেন। এ বিষয়ে আইন কর্মকর্তা মাহমুদুল করিমের দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। সমকাল

মন্তব্য