আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
৩২ মাসের ভবনের নকশাতেই ৩৬ মাস

রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে আগারগাঁওয়ের দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার। প্রায় একই সময়ে দুই এলাকায় ১২ তলাবিশিষ্ট দুটি সরকারি ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর মধ্যে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজ তিন বছরের মধ্যে শেষ হয়েছে। অথচ নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শনী ও বিক্রির সুবিধা দেওয়ার ধানমন্ডিতে এক বিঘা জমির ওপর জয়িতা টাওয়ার নামের যে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেখানে এখন পর্যন্ত একটি ইটের গাঁথুনিও পড়েনি।

সরকার নারীর ক্ষমতায়ন বাড়ানোর জন্য ২০১৮ সালের এপ্রিলে ধানমন্ডিতে ১২ তলাবিশিষ্ট জয়িতা টাওয়ার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী উদ্যোক্তারা সেখানে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য এনে প্রদর্শন ও বিক্রি করবেন। ভবনটি নির্মাণে খরচ ধরা হয় ১৫৪ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই ভবন নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই সময়ে ১ শতাংশ কাজও হয়নি।

একই সময়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবন নির্মাণের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছিল। ২০২ কোটি টাকা ব্যয়ে সেটির নির্মাণকাজ শেষ। তিন বছরের ব্যবধানে একটি ভবনের কাজ শেষ, অন্যটি কেন শুরুই হলো না, সেই কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, জয়িতা টাওয়ারের নকশা চূড়ান্ত করতে করতেই তিন বছর পার করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জয়িতা টাওয়ার নির্মাণের জন্য তিন বছর আগে একনেক সভায় যে নকশা অনুমোদন করা হয়েছিল, সেটি বাতিল করা হয়েছে। প্রথম নকশায় জয়িতা টাওয়ারে পাঁচটা বেসমেন্টের অনুমোদন হয়েছিল। তাতে নারী উদ্যোক্তাদের বিনোদনের জন্য দুটি সিনেপ্লেক্স ও একটি থিয়েটার হলও রাখা হয়েছিল। সংশোধিত নকশায় পাঁচটির পরিবর্তে দুটি বেসমেন্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সিনেপ্লেক্স ও থিয়েটার হল সংশোধিত নকশা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

নকশার কাজটি করেছে সিস্টেম আর্কিটেক্ট। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর প্রথম আলোকে বলেন, ‘জয়িতা টাওয়ারের নকশাটি আমরা নারী উদ্যোক্তাদের উপযোগী করে তৈরি করেছিলাম। পণ্য বিক্রির পাশাপাশি বিনোদনের অংশ হিসেবে নারীরা যাতে সিনেমা ও নাটক দেখতে পারেন, সে জন্য দুটি সিনেপ্লেক্স ও একটি থিয়েটারের ব্যবস্থা রেখেছিলাম। ধানমন্ডির মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যাতে বেশি গাড়ি পার্ক করা যায়, সে জন্য পাঁচটি বেসমেন্ট রাখা হয়েছিল। সব মিলিয়ে জয়িতা টাওয়ারকে দৃষ্টিনন্দন ও ব্যতিক্রমী একটি ভবন করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু একপর্যায়ে গিয়ে আমাদের নকশার প্রস্তাবটি আটকে গেল।’

এনামুল করিম আরও বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ভালো কিছু করতে চেয়েছি। কিন্তু নতুন করে নকশা করতে হয়েছে।’ নকশা পরিবর্তনের কারণে টাওয়ারের কাজ শুরু হয়নি বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম নকশার আলোকে পাঁচটি বেসমেন্ট রেখে জয়িতা টাওয়ার করতে গেলে ৫০ ফুট পর্যন্ত মাটি খনন করতে হবে। অথচ পাশে যেসব ভবন আছে, সেখানে সর্বোচ্চ ৩৮ ফুট পর্যন্ত মাটি খনন করা হয়েছে। এখন ৫০ ফুট পর্যন্ত মাটি খনন হলে পাশের ভবন ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে রাস্তা দেবে যাওয়ার ঝুঁকিও দেখা দেবে।

আতিকুল ইসলাম বলেন, জয়িতা টাওয়ার করা হচ্ছে সারা দেশের নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বিক্রির জন্য। তাই সিনেমা হল ও থিয়েটার হল বাদ দিয়ে সেখানে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা হবে। এসব কারণে প্রথম নকশা বাদ দেওয়া হয়েছে।

জয়িতা এক বিজয়ী নারীর প্রতীকী নাম। নারীমুক্তির একটি মহৎ স্বপ্নের নামও জয়িতা। নারীমুক্তির স্বপ্ন সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে ২০১১ সালে ঢাকায় জয়িতা নামে একটি অলাভজনক ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠন করে সরকার। পরবর্তীকালে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গঠন করা হয় জয়িতা ফাউন্ডেশন। গত এক দশকে প্রতিষ্ঠানটির কলেবর বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটির জন্য ‘জয়িতা টাওয়ার নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার।

১৪ ফেব্রুয়ারি জয়িতা টাওয়ার নির্মাণসংক্রান্ত প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে এক আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জানানো হয়, নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে না পারায় বেশ কিছু উপকরণের দাম বেড়ে গেছে। তাই প্রকল্পের ব্যয় ১৫৪ কোটি থেকে ১৯ কোটি বাড়িয়ে ১৭৩ কোটি টাকা করা হয়েছে। আর প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৩ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে। এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, রেট শিডিউল পরিবর্তন হলে এই প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়তে পারে। সংশোধিত প্রস্তাবটি এখন পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে জয়িতা টাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবনটি হলে সেখানে জয়িতা ফাউন্ডেশনের সদর দপ্তর হবে। নারীরা তাঁদের পণ্য প্রদর্শনী ও বিক্রির সুবিধা পাবেন। এর ফলে দেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়বে। প্রথম আলো

মন্তব্য