আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
গৃহ কর নিয়ে ক্রমেই অসন্তোষ বাড়ছে চট্টগ্রামে

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ। প্রতিষ্ঠানটির ২৭ হাজার স্কয়ার ফিটের দুটো ফ্লোরের বিপরীতে পাঁচ বছর পূর্বে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ধার্যকৃত গৃহকরের ‘ভ্যালু’ ছিল ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে সম্প্রতি শেষ হওয়া এসেসমেন্টে শেষে এ ‘ভ্যালু’ উন্নীত হয়েছে ৭২ লাখ টাকায়। এমন পরিস্থিতিতে চসিকের নতুন প্রস্তাবিত ‘ভ্যালু’র বিপরীতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী দুলাল চন্দ্র শীল।
এদিকে নগরীর অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, পৌরকর আদায়ের লক্ষ্যে সম্প্রতি শেষ হওয়া চসিকের এসেসমেন্টে করের পরিমাণ পূর্বের চেয়ে ‘অস্বাভাবিকহারে’ বাড়ানো হয়েছে।
ভবন মালিকরা বলছেন, ৫ বছর পূর্বে এসেসমেন্ট করার সময় বর্গফুটের মূল্যায়নভিত্তিক জেনারেল এসেসমেন্টের মাধ্যমে করের যে আওতা বাড়িয়েছিলেন সাবেক মেয়রগণ নতুন মূল্যায়নে তা ফলো করা হয় নি। নতুন মূল্যায়নে ভবন ভাড়া দিলে কত আয় হতো সে হিসেব করে কর ধার্য করা হয়েছে। মূলত এই কারণেই করের পরিমাণ পূর্বের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।
তবে চসিকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দাবি, ইচ্ছে করে কর বাড়ানোর সুযোগ কর্পোরেশনের নেই। আইন মেনেই কর ধার্য্য করা হয়েছে। এসেসমেন্ট শেষে প্রস্তাবিত ‘ভ্যালু’র বিষয়ে কারো আপত্তি থাকলে আপিল করার সুযোগ আছে।
চসিকের রাজস্ব শাখা সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চবার্ষিকী কর পুর্নমূল্যায়ন শেষে তা গত ৩১ আগস্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে প্রস্তাবিত ভ্যালু নিয়ে কারো আপত্তি থাকলে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত করদাতাদের আপিল করার আহবান করা হয়। এই সময় সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে করবিধি ১৯৮৬ সালের ভিত্তিতে। এর প্রেক্ষিতে গত ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চসিকের ৮টি রাজস্ব সার্কেলের বিপরীতে ১২ হাজার ৪৯৬টি আপিল আবেদন জমা পরে।
এদিকে নগরবাসীর কথা বিবেচনায় নিয়ে করদাতাদের আপিল করার সময় ৩ মাস পর্যন্ত বৃদ্ধির অনুমতি চেয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে চসিক। চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত চিঠিটি গত রোববার পাঠানো হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডে কর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ৪১টি ওয়ার্ডের বর্তমানে সরকারি–বেসরকারি ১ লাখ ৮৫ হাজার ২৪৮টি হোল্ডিং রয়েছে। যার বিপরীতে ৮৫১ কোটি ৩০ লাখ ৬৪ হাজার ৫৫৯ টাকা কর ও রেইটস নির্ধারণ করা হয়েছে।’
ওই চিঠিতে আরো বলা হয়, আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম কোয়ার্টারের আপিল করার সময় আছে। ইতোমধ্যে প্রকাশিত তারিখের পর পবিত্র ইদুল আজহা উদযাপিত হয় এবং সরকারি অফিস বন্ধ ছিল। হিন্দু ধর্মবলাম্বীদের সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব এবং পবিত্র আশুরা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে করদাতাগণ আপিল করতে সক্ষম নাও হতে পারে। তাই জনস্বার্থে করবিধি ১৯৮৬ এর ৭ ধারা মতে তিন মাস সময় বৃদ্ধির অনুমোদন চাওয়া হয় ওই চিঠিতে।’
কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, নগরবাসীর স্বার্থেই সময় বৃদ্ধির অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। ইদের ছুটি ও পূজার কারণে অনেকে আবেদন করতে পারবেন না। তাই তাদের কথা বিবেচনায় নিয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। মেয়র বলেন, ‘আইন মেনেই এসেসমেন্ট করা হয়েছে। এখন প্রস্তাবিত ভ্যালু নিয়ে কারো আপত্তি থাকলে আপিল করতে পারবেন। আপিলে যৌক্তিক ব্যাখা দিতে পারলে নিশ্চয় পাপ্য কর ধার্য্য করা হবে।’
কর নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে:
এদিকে এসেসমেন্ট শুরুর পর থেকেই কর বাড়ানোর অভিযোগ ওঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীও অভিযোগ করেছিলেন। সর্বশেষ এসেসমেন্ট শেষে হোল্ডিং মালিকদেরকে নোটিশ দেয় চসিক। এরপর অসন্তোষের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। আগামী শুক্রবার কর সুরক্ষা পরিশোধের ব্যানারে নগরীর রেল স্টেশন এলাকায় কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে একটি সমাবেশ হওয়ারও কথা রয়েছে।
পাঠানটুলী এলাকার বাসিন্দা হাসান মারুফ রুমি বলেন, আড়াই শতক জায়গার উপর আমাদের পৈতৃক বাড়ি। তিন তলায় তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে। পরিবার নিয়ে তিনি একটিতে, তার ভাইয়েরা একটিতে এবং বোন অন্য ফ্ল্যাটে থাকেন। এতদিন স্থাপনার ভিত্তিতে সিটি কর্পোরেশনকে ২ হাজার ২৪০ টাকা কর দিতাম। এখন নতুন নিয়মে কর ধার্য্য করা হয়েছে ২২ হাজার টাকা। সিটি কর্পোরেশন বর্গফুটের পরিবর্তে ভাড়া দিলে কত টাকা ভাড়া পাওয়া যেত সে হিসাব করে তার ভিত্তিতে কর ধার্য্য করায় টাকার পরিমাণ বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
করিম নামে এক ভবন মালিক জানান, বর্তমনান মেয়র আইন মেনে কর ধার্য্যের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু সাবেক মেয়ররা কেন আইন মেনে করেন নি। কারণ এখানে জনস্বার্থের বিষয়টি জড়িত। অর্থাৎ জনগণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কর ধার্যের সময় কিছুটা ছাড় দিয়েছিলেন সাবেক মেয়রগণ।
এদিকে সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে দেয়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সিটি কর্পোরেশন (কর) বিধি ১৯৮৬ এর ১৯ এবং ২০ বিধিমূলে সিটি কর্পোরেশনের ভূমি ও ইমারতসমূহের বার্ষিক মূল্য নির্ধারণ (এসেসমেন্ট) এর বিধান রয়েছে। উক্ত বিধিমালার বিধি ২১ অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর অন্তর এ এসেসমেন্ট হালনাগাদের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর্দশ কর তফসিল, ২০১৬ অনুযায়ী এসেসমেন্টের ভিত্তিতেই হোল্ডিং ট্যাক্স ও অন্যান্য ফি সমূহ আরোপ করা হয়ে থাকে, যা সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব আয়ের প্রদান উৎস। ফলে নিয়মিত এসেমেন্ট এর সিটি কর্পোরেশনের আর্থিক সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা অর্জন প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।’
মন্ত্রণালয় নির্দেশিত বিধি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিধি ১৯ এ বলা হয়েছে, ভবন ও ভূমির উপর কর এবং বিদ্যুতায়ন রেইট এবং আর্বজনা অপসারণ রেইট আদায় করতে পারবে কর্পোরেশন। বিধি ২০ এ বলা হয়েছে, ‘বাৎসরিক মোট ভাড়া হতে রক্ষনাবেক্ষনের জন্য দুই মাসের ভাড়া বাদ দিয়ে বার্ষিক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। ভবন নির্মাণ বা ক্রয় করার সময় সরকার, বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন, তফসিলি ব্যাংক বা কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বন্ধক রেকে ঋণ গ্রহণ করা হলে উক্ত ঋণের সুদ বার্ষিক মূল্য হতে বাদ যাবে’।
চসিকের রাজস্ব শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ প্রথম দফায় নগরীর ১১টি ওয়ার্ডে ‘এসেসমেন্ট’ শুরু হয়ে চলতি বছরের ২০ জুন শেষ হয়। দ্বিতীয় দফায় ২০১৬ সালের ১৮ অক্টোবর অবশিষ্ট ৩০টি ওয়ার্ডে ‘এসেসমেন্ট’ শুরু হয়েছিল এবং তা শেষ হয়েছে গত ১৫ জানুয়ারি। ‘এসেসমেন্ট’ শেষে দেখা গেছে, নগরীতে মোট ‘হোল্ডিং’ রয়েছে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ২৪৮টি। যা পূর্বের তুলনায় ২৮ হাজার ৭০২টি বেশি। এসেসমেন্টভুক্ত হোল্ডিংগুলোর মধ্যে সরকারি হোল্ডিং হচ্ছে ২ হাজার ৫৪৭টি এবং বেসরকারি হোল্ডিং রয়েছে ১ লক্ষ ৮২ হাজার ৭শ টি।
এদিকে হোল্ডিংগুলোর বিপরীতে কর্পোরেশন অ্যাক্ট ২০০৯ প্রদত্ত মতাবলে পৌরকর আদায় করবে চসিক। এসেসমেন্টে হোল্ডিংগুলোর বিপরীতে চলতি অর্থ বছরে ৮৫১ কোটি ৩০ লাখ ৬৪ হাজার ৫৫৯ টাকা পৌরকর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২০১৬–২০১৭ অর্থ বছরে আদায় হয়েছিল ১০৩ কোটি ৪৪ লাখ ১৮ হাজার ৫৩৭ টাকা।
উল্লেখ্য, চসিক মোট ১৭ শতাংশ পৌরকর আদায় করে থাকে। অথচ ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি সরকার যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে তাতে কর আরো বেশি আদায়ের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে চসিক যে ১৭ শতাংশ পৌরকর আদায় করে তার মধ্যে ৭ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স, ৩ শতাংশ বিদ্যুতায়ন রেইট এবং ৭ শতাংশ আবর্জনা অপসারণ রেইট রয়েছে। ২০১৬ সালের গেজেট অনুযায়ী ৭ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্সের পাশাপাশি ৭ শতাংশ আবর্জনা অপসারণ রেইট, ৫ শতাংশ বিদ্যুতায়ন বা সড়কবাতি রেইট এবং ৮ শতাংশ স্বাস্থ্য রেইট আদায় করতে পারবে।

মন্তব্য