আমাদের মেইল করুন dhunatnews@gmail.com
ঘোষণা
আবাসন সম্পর্কিত যেকোনো নিউজ পাঠাতে পারেন আমাদের এই মেইলে- abasonbarta2016@gmail.com
আবাসন সমস্যা সমাধানে প্লট নয়, ফ্ল্যাট

আমাদের গ্রামাঞ্চলে এখনও যৌথ পরিবারের অস্তিত্ব থাকলেও শহরাঞ্চলে কদাচিৎ যৌথ পরিবারের সন্ধান মেলে। গ্রামাঞ্চলে একটি বাড়িতে একাধিক পরিবারের বসবাস। কিন্তু শহরাঞ্চলে প্রতিটি একান্নবর্তী পরিবারের বসবাসের জন্য পৃথক বাড়ি বা ফ্ল্যাটকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।

বাংলাদেশে গ্রাম ও শহরাঞ্চলে জনসংখ্যানুপাতে ভূমির প্রাপ্যতা খুবই কম। আমাদের দেশে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে গ্রাম ও শহরাঞ্চলে নতুন বসত গৃহ নির্মাণের আবশ্যকতা দেখা দেয়ায় ভূমির উপর চাপ বেড়ে চলেছে। ভূমির উপর এ বাড়তি চাপের কারণে প্রতিনিয়তই কৃষিজমি বসত গৃহ নির্মাণে ব্যবহার হচ্ছে, পুকুর ভরাট করে বসত গৃহ নির্মাণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, জলাভূমি, খালবিল ও নদী ভরাট করে আবাসন গড়ে তোলা হচ্ছে আবার পাহাড় কেটেও আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আমাদের শহরাঞ্চল বিশেষত ঢাকা শহরের দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানে নগরবাসীর আবাসনের জন্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রয় হয়ে আসছে। আমাদের এ দেশ ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকাকালীন ঢাকা শহরের ওয়ারীতে প্রথম নগরবাসীর আবাসনের জন্য সরকারিভাবে প্লট বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়। অতঃপর পাকিস্তান শাসনামলে ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানী প্রভৃতি নামে আবাসিক এলাকা গড়ে তুলে সরকারিভাবে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। বাংলাদেশ অভ্যুদয় পরবর্তী বারিধারা, উত্তরা, নিকুঞ্জ, ঝিলমিল, পূর্বাচল নামকরণে আবাসিক এলাকা গড়ে তুলে সরকারিভাবে নগরবাসীর জন্য প্লটের ব্যবস্থা করা হয়। সরকারি আবাসিক এলাকায় প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ করা হয় এবং এ নীতিমালার ভিত্তিতে সরকারের পদস্থ পদে নিয়োজিত ব্যক্তিরাসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিরা প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন।

সরকারি আবাসিক এলাকায় প্লটের সংখ্যার তুলনায় প্লটের আবেদন প্রত্যাশী অনেক বেশী হওয়ার কারণে আমাদের দেশে বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটেছে। বেসরকারি আবাসন প্রকল্পসমূহের অধিকাংশই নিচু কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে ঢাকার শহরের কেন্দ্রস্থল ও এর আশেপাশে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার মতো ভূমি অবশিষ্ট নেই। ঢাকা শহরের অদূরে এখন যে সকল আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে তা অবলোকন পরবর্তী দেখা যায় নিচু কৃষিজমি ও জলাশয়ের অস্তিত্ব বিপন্নের পথে। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরে সরকারের পক্ষ হতে গত বছর ঘোষণা দেয়া হয় সরকারিভাবে গড়ে ওঠা আবাসন প্রকল্পে প্লটের পরিবর্তে ফ্ল্যাট বরাদ্দের ব্যবস্থা থাকবে। সরকারের পক্ষ হতে যে মুহুর্তে এ ঘোষণাটি আসলো, একই সময়ে এটি বেসরকারী আবাসিক প্রকল্পের ক্ষেত্রেও কার্যকর করা অত্যাবশ্যক প্রতীয়মান হলেও নানা অজানা কারণে তা করা হয়নি। আর এ সুযোগে বেসরকারি আবাসন ব্যবসা লাভজনক বিবেচনায় আগের মতোই অব্যাহত আছে।

ঢাকা শহরে সরকারিভাবে গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকার কোনটিরই এখন আর আবাসিক চরিত্র অক্ষুণœ নেই। এ সকল আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠাকালীন বিধিনিষেধ দেয়া ছিল যে, এক বিঘা বা ১০ কাঠা সমন্বয়ে গঠিত প্লটে একটির অধিক দ্বিতল বা তৃতল বাড়ি নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু সে বিধিনিষেধ খুব বেশিদিন ধরে রাখা যায়নি। এখন এরূপ আবাসিক এলাকায় এক বিঘা সমন্বয়ে গঠিত প্লটসমূহে ক্ষেত্রবিশেষে ৯ তলা থেকে ২০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। এ সকল ভবন আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে। এ বাস্তবতা হতে ধারণা করা যায়, বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা যে সকল আবাসন প্রকল্পে এখনও ভবন নির্মাণ করা হয়নি, এসব আবাসন প্রকল্পের প্লটেও বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ হতে একক বাড়ির পরিবর্তে বহুতল ফ্ল্যাট গড়ে উঠবে।

বর্তমানে ধানমন্ডি, গুলশান, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, মিরপুর প্রভৃতি আবাসিক এলাকায় একক বাড়ির জন্য বরাদ্দকৃত প্লটে যেভাবে বহুতল বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে, তাতে এসকল বহুতল বাড়ির একটির সাথে আরেকটির দূরত্ব স্বল্প হওয়ার কারণে এগুলোতে বসবাসরতরা পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস হতে বঞ্চিত হচ্ছেন। সেদিন হয়তো খুব দূরে নয় যখন ধানমন্ডি গুলশানের একটির সাথে আরেকটি স্বল্প দূরত্বে নির্মিত বহুতল ভবন ভেঙ্গে বিস্তীর্ণ সবুজ চত্ত্বরের ব্যবস্থাা রেখে অধিক উচ্চতাবিশিষ্ট বহুতল ভবনের নির্মাণের প্রশ্ন উঠবে। আমাদের সন্নিকটবর্তী রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে বিস্তীর্ণ সবুজ চত্ত্বর সমন্বয়ে গড়ে তোলা আবাসিক এলাকার মধ্যখান উন্মুক্ত রেখে দু’পাশে ৪০তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণপূর্বক এক একটিতে কয়েকশ ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে নগরীর সবুজায়ন ও নির্মল বায়ু চলাচলের বিঘœতা রোধ করা হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে সিঙ্গাপুরের অনুরূপ সবুজ চত্ত্বরের ব্যবস্থা করে অনধিক ১৫তলা বিশিষ্ট বহুতল ভবন নির্মাণ করে কয়েকশ ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ঢাকা শহরে বসবাসরত সকল নাগরিকের জন্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে আপাতত পৃথক প্লট বরাদ্দের পথ একেবারেই রুদ্ধ। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের আবাসনের ক্ষেত্রে এটি কঠোরভাবে মেনে না চলার আর কোন বিকল্প নেই। যেহেতু চাহিদার তুলনায় আমাদের ভূমি স্বল্প, সে বাস্তবতায় আমরা শত চেষ্টা করলেও আমাদের সরকারি বা বেসরকারি আবাসিক এলাকাসমূহের আবাসিক চরিত্র ধরে রাখতে পারবো না। আর যদি ধরে রাখতে নাই পারি তবে বিলম্ব নয়, এখন থেকেই সিঙ্গাপুর অথবা ঢাকা সেনানিবাসের অনুকরণে নতুন আবাসন গড়ে তোলা এবং পুরাতন আবাসনসমূহ সেভাবে বিনির্মাণ করা হোক।

লেখক : ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন