আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
আসন্ন জাতীয় বাজেট, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং আবাসন শিল্প: কামাল মাহমুদ

অনেকটা ভঙ্গুর অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল দেশের আবাসন শিল্প। কিন্তু গত বছর করোনার প্রথম ধাক্কায় একেবারে বিপর্যস্ত করে দেয় এই শিল্পকে। এরপর গত বছর জাতীয় বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থের বিনাপ্রশ্নে ব্যবহারের সুয়োগ এবং নিবন্ধন ব্যয় কমানো সহ বেশ কিছু পদক্ষেপে অনেকটা আশার আলো দেখে আবাসন খাত। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এর প্রভাবে আবারও বিপদের সম্মুখীন এই শিল্প।

আমাদের জাতীয় বাজেট আসন্ন। জুনের প্রথম দিকে ঘোষিত হবে ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেট। বাজেট এর আগে প্রায় এপ্রিল-মে দুই মাস জুড়ে চলছে লকডাউন। করোনার দ্বিতীয় ঢেই এর এই লকডাউনে স্থবির হয়ে পড়েছে ছোট বড় সকল ব্যবসা এবং নাগরিকদের জনজীবন। করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ঘোষিত লকডাউনের প্রভাবে আবারও স্থবির হয়ে গেছে আবাসন ব্যবসায়। থমকে গেছে গ্রাহকদের সঙ্গে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেন আর নতুন-পুরনো সব কর্মযজ্ঞ। গত বছর করোনার প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার দ্বিতীয় ধাক্কা।

এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে প্লট-ফ্ল্যাটের বিক্রি নতুন করে নেই বললেই চলে। বিক্রি হওয়া ফ্ল্যাট-প্লটের কিস্তি পরিশোধ করছেন না অনেক ক্রেতা। আবার অনেকে যারা বুকিং দিয়েছিলেন তারা অর্থ কষ্টে টাকা ফেরত নিচ্ছেন। এছাড়া প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রি বন্ধ হওয়ায় চরম উদ্বিগ্ন রিয়েল এস্টেট শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা। কঠোর লকডাউনের জন্যে বেশিরভাগ রিয়েল প্রতিষ্ঠানেরই কাজ করোনা পরিস্থিতির কারণে বন্ধ হয়ে ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কাজ আবার শুরু হলেও এই ধাক্কা সামলাতে কত দিন সময় লাগে তা নিয়ে সবাই চিন্তিত। করোনার প্রভাব বাংলাদেশের সব সেক্টরেই কম বেশি পড়েছে। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আবাসন খাত। বেশিরভাগ মানুষ নিজের মাসিক আয় থেকে কিছুটা সঞ্চয় করে একটি ফ্ল্যাট বা প্লট কেনেন। এখন সেই মানুষগুলো আর বিনিয়োগ না করে নিজেদের সঞ্চয়ের টাকা ভেঙে খাচ্ছেন। ফলে টাকার সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান নতুন করে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বর্তমান অবস্থায় অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা গুঠিয়ে নিতে বাধ্য হবেন।

গত বছরের করোনার ধাক্কায় অনেকগুলো রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ব্যবসায় টিকতে না পেরে ঝরে পড়েছেন। আবাসনশিল্পের উপর যে আঘাত এসেছে, তার প্রভাব পড়েছে নির্মাণ সংশ্লিষ্ট আড়াই শতাধিক শিল্পের উপর। ইতিমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন নির্মাণ সংশ্লিষ্ট উপখাতগুলোর স্থবিরতা নিয়ে। টাইলস, সিরামিক্স, আসবাবপত্র, কেবলস, গ্ল্যাস সহ বিভিন্ন শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন আবাসন খাতের কার্যক্রম স্থবির থাকায় তাদের পণ্যের চাহিদা কমে গেছে এবং ক্ষেত্র বিশেষ বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ তাদের পণ্যের একমাত্র ক্রেতা হচ্ছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। জিডিপিতে ১৫ শতাংশ অবদান রাখা এই খাতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর নজর দিতে হবে। আবাসন খাত থেকে সরকার ট্যাক্স, ভ্যাট, রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ প্রচুর রাজস্ব পায়। এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থনীতিতে গতি আনতে হলে অবশ্যই আবাসন খাতে গতি আনতে হবে। সমগ্র নির্মাণ খাতে প্রায় ৫০ লক্ষ শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত আছেন। তাদের উপর নির্ভর করেই প্রায় আড়াই কোটি নাগরিকের অন্ন-বস্ত্র চাহিদা পূরণ হয়। দেশের অনেনেই এখনও বলেন, আবাসন খাত হচ্ছে অনুতপাদনশীল খাত।

আবার কেউ কেউ বলেন আগে অন্নের ব্যবস্থা করতে হবে তারপর বাসস্থানের বিষয়টা ভেবে দেখা যাবে। আমরা তাদের বলতে চাই নিমার্ণ খাত বাসস্থান তৈরির সাথে সাথে এই আড়াই কোটি লোকের খাবারের ব্যবস্থা আগে করে তারপর স্থায়ী সম্পদ হিসেবে বাসস্থান তৈরি করে। এই খাত কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় বিশাল কর্মযজ্ঞ। এই আবাসন শিল্প শুধু বাসস্থানই সরবরাহ করছে না, অন্ন বস্ত্র সহ অন্য মৌলিক চাহিদাও পুরন করে চলেছে। এই খাতের জনশক্তির কর্মসংস্থানের স্বার্থেই এই খাতের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। বিশাল অর্থনীতি আবর্তিত হয় আবাসন খাততে ঘীরেই। এজন্য অর্থনীতিকে সচল করতে আবাসন খাতের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তাই আসন্ন জাতীয় বাজেটে বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থের ব্যবহার অব্যাহত রাখতে হবে। এছাড়া আবাসন শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। বলা চলে গতবছর প্রণোদনা প্যাকেজ এর বিশেষ কোন সুবিধা আবাসন ব্যবসায়ীরা পায়নি। এবছর এই বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সংকট নিরসনে আবাসন খাতে ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ, স্বল্প সুদে গৃহ ঋণ এবং বাংকে ঋণ পরিশোদের সময় বাড়াতে হবে।

ব্যবসায়ীরা এ খাতে যে পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন, তা সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে করেছেন। এখানে সরকার কিংবা অন্য কারো কোনো উদ্যোগ নেই। কবে নাগাদ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটবে তার কোন উপায় দেখতে পাচ্ছেননা উদ্যোক্তারা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারের নীতিগত সহযোগিতা বড় প্রয়োজন। এই খাতকে সচল করতে নিবন্ধন ব্যয় সব মিলিয়ে ৭ শতাংশে নিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে অনেক পুরাতন ফ্ল্যাট কম দামে বিক্রি হচ্ছে পরিস্থিতির কারণে। কিন্তু এই পুরাতন ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ব্যয় নতুন ফ্ল্যাটের সমান। যা অগ্রহণযোগ্য। পুরাতন ফ্ল্যাটে নিবন্ধন ব্যয় ২-৩ শতাংশে নামিয়ে আসলে অনেক নাগরিক তাদের মাথা গোজার ঠাঁই যেমন পাবে তেমনি এখানে নতুন কর্মসংস্থান হবে। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নাগরিকদের জন্য ফ্ল্যাট ক্রয় করার জন্য একটি চক্রাকার তহবিল গঠন। আসন্ন জাতীয় বাজেটে সরকার এই বিষয়গুলোর দিকে গুরুত্বের সাথে নজর দিবে সেই প্রত্যাশা করছে আবাসন শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা।

কামাল মাহমুদ ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিহ্যাব

মন্তব্য