বাংলাদেশে আবাসনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। রাজধানীসহ বড় শহরে অনেকেই নিজের ফ্ল্যাট কিনতে চান। ঢাকার আকাশচুম্বী ভবনগুলো এখন অনেকের স্বপ্নের ঠিকানা। পরিবারকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ওঠার আকাঙ্ক্ষা দিনের পর দিন বাড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ফ্ল্যাট কেনা জীবনের অন্যতম বড় বিনিয়োগ, আর এই বিনিয়োগে সামান্য অসাবধানতাই আজীবন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রেতারা সাধারণত কিছু মৌলিক ভুল করে থাকেন, যেগুলো এড়িয়ে চললেই নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্তভাবে ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব। তাই কেনার আগে সতর্ক হওয়া জরুরি। নিচে সেই দশটি ভুল ও তার করণীয় তুলে ধরা হলো।
১- ডকুমেন্ট যাচাই না করা
অনেক ক্রেতা কেবল সুন্দর ফ্ল্যাট দেখে মুগ্ধ হয়ে যান, অথচ জমির কাগজপত্র, দাখিলা, খতিয়ান, পর্চা, দলিল, রেজিস্ট্রি ইত্যাদি ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করেন না। রাজউকের অনুমোদন ঠিক আছে কিনা তা খতিয়ে দেখেন না। এতে ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়।
করণীয়:রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জমির মালিকানা যাচাই করুন এবং অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাহায্য নিন।
২- ডেভেলপারের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই না করা
অবিশ্বস্ত ডেভেলপার কোম্পানি থেকে ফ্ল্যাট কিনলে প্রকল্প মাঝপথে আটকে যেতে পারে।
করণীয়:-রিহ্যাব (REHAB)–এর সদস্যপদ আছে কিনা, পূর্বের প্রকল্প সময়মতো হস্তান্তর করেছে কিনা, গ্রাহক রিভিউ কেমন এসব খতিয়ে দেখুন।
৩- হস্তান্তরের তারিখ চুক্তিতে স্পষ্ট না থাকা
চুক্তিতে নির্দিষ্ট সময় না থাকলে ফ্ল্যাট পেতে ২-৩ বছর দেরি হতে পারে।
করণীয়:লিখিত চুক্তিতে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের নির্দিষ্ট তারিখ এবং দেরি হলে জরিমানার ধারা যুক্ত করুন।
৪-ব্যাংক লোন ও ফাইন্যান্স সংক্রান্ত ভুল
অনেকে আগে যাচাই না করেই ঋণের পরিকল্পনা করেন, অনেকে ব্যাংক লোন বা কিস্তির বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে না জেনেই এগিয়ে যান। পরে সুদ, শর্ত বা কিস্তি নিয়ে সমস্যায় পড়েন।
করণীয়: অগ্রিম টাকার পাশাপাশি কত শতাংশ ব্যাংক থেকে পাওয়া যাবে, সুদের হার কত, কিস্তি কেমন হবে—এসব স্পষ্ট করুন।
৫- নকশা ও অনুমোদন না দেখা
রাজউক বা সিটি করপোরেশনের অনুমোদন ছাড়া ভবন অবৈধ ঘোষিত হতে পারে।
করণীয়: অনুমোদিত নকশার কপি নিজ হাতে দেখে নিন এবং মিলিয়ে নিন।
৬-লোকেশন ও আশপাশ বিবেচনা না করা
শুধু ফ্ল্যাট সুন্দর দেখলেই হবে না। আশপাশে স্কুল, বাজার, হাসপাতাল, পরিবহন সুবিধা না থাকলে ভোগান্তি পোহাতে হবে।
করণীয়: দিন-রাত দুই সময়েই জায়গা ঘুরে দেখুন। পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ আছে কিনা যাচাই করুন।
৭- নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই না করা
ডেভেলপাররা অনেক সময় টাইলস, স্যানিটারী বা লিফটের মান কমিয়ে দেয়।
করণীয়: চুক্তিপত্রে স্পষ্টভাবে লিখিয়ে নিন কোন ব্র্যান্ড বা মানের জিনিস ব্যবহার হবে।
৮- অতিরিক্ত খরচ উপেক্ষা করা
শুধু ফ্ল্যাটের দাম ভেবে বসলে পরে রেজিস্ট্রেশন খরচ, ভ্যাট, ট্যাক্স, ট্রান্সফার ফি ইত্যাদি বড় অঙ্কে দাঁড়াবে।
করণীয়: মোট বাজেটের অন্তত ১২–১৫% বাড়তি খরচ যোগ করুন।
৯ সার্ভিস চার্জ ও মেইনটেন্যান্স উপেক্ষা
অনেকেই বুঝতে পারেন না যে ভবিষ্যতে মাসিক চার্জ (লিফট, নিরাপত্তা, জেনারেটর) কতটা হবে।
করণীয়: আগেভাগে সার্ভিস চার্জের আনুমানিক হিসাব জেনে নিন।
১০- চুক্তিপত্র ভালোভাবে না পড়া
বাংলায় বা ইংরেজিতে লেখা দীর্ঘ চুক্তিপত্র অনেকেই পড়ে না, কেবল সই করে দেন।
করণীয়: প্রতিটি ধারা মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, না বুঝলে আইনজীবী দিয়ে ব্যাখ্যা নিন।
ফ্ল্যাট কেনা শুধু একটি সম্পদ নয়—এটি জীবনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা। তাই আবেগে ভেসে গিয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সতর্কভাবে যাচাই-বাছাই করে, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে ফ্ল্যাট কিনুন। মনে রাখবেন, সামান্য ভুল এড়াতে পারলেই ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি থেকে বাঁচবেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, “একটু সতর্কতা হাজারো সমস্যার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।”
মোঃ আব্দুর রশিদ বাবু
ডিজিএম, রিহ্যাব