ড. আলী আফজাল
প্রেসিডেন্ট, রিহ্যাব
বাংলাদেশ আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে উন্নয়ন আর কেবল সড়ক, সেতু কিংবা ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হয়ে উঠেছে সেই উন্নয়নকে ধারণ ও পরিচালনা করার মতো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। গত কয়েক দশকে দেশের আবাসন, নির্মাণ, অবকাঠামো এবং নগরায়ন খাতে যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে এসেছে—এই বিশাল খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জনশক্তি আমরা কোথায় তৈরি করছি?
বর্তমানে দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডিগ্রিধারী তরুণের সংখ্যা বাড়লেও শিল্পখাতের প্রয়োজনীয় দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে আবাসন, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, বিল্ডিং প্রযুক্তি, স্মার্ট অবকাঠামো, রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট, ফ্যাসিলিটি ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল কনস্ট্রাকশন, বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং, সম্পদ মূল্যায়ন এবং টেকসই নগর উন্নয়নের মতো বিষয়ে বিশেষজ্ঞের অভাব দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশি পরামর্শক ও বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অথবা প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় ও সময় ব্যয় হচ্ছে।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) গত প্রায় চার দশক ধরে দেশের আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, একটি দেশের পরিকল্পিত নগরায়ন, নিরাপদ আবাসন, আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শুধু বিনিয়োগ বা অবকাঠামো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত এবং দায়িত্বশীল পেশাজীবী। আজকের পৃথিবীতে একটি ভবন শুধু ইট, বালু, সিমেন্ট এবং রডের সমন্বয় নয়। এটি প্রযুক্তি, পরিবেশ, জ্বালানি দক্ষতা, নিরাপত্তা, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং মানবকল্যাণের একটি সমন্বিত কাঠামো। সেই বাস্তবতায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে রিহ্যাব একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ধারণা নিয়ে ভাবছে। এটি কোনো সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নয়। বরং এমন একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চিন্তা করা হচ্ছে, যা আবাসন, নির্মাণ, নগর উন্নয়ন, স্মার্ট বিল্ডিং প্রযুক্তি এবং টেকসই অবকাঠামো খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করবে। আমাদের লক্ষ্য আরেকটি ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান তৈরি করা নয়; বরং এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষা সরাসরি শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে এবং শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি বাস্তব প্রকল্প, প্রযুক্তি ও কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে দ্রুত নগরায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে আবাসন ও অবকাঠামোর চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো এবং আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হবে নতুন প্রজন্মের বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবী। প্রশ্ন হলো, এই মানবসম্পদ কোথায় তৈরি হবে? প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কি সেই চাহিদা পূরণে যথেষ্ট? আমাদের বিশ্বাস, এখন সময় এসেছে ভবিষ্যতের প্রয়োজনকে সামনে রেখে বিশেষায়িত শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অনেক আগেই বুঝতে পেরেছে যে, উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু ডিগ্রি প্রদান নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করা। সে কারণেই বিভিন্ন দেশে নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, রিয়েল এস্টেট, বিল্ট এনভায়রনমেন্ট, স্মার্ট সিটি, ফ্যাসিলিটি ম্যানেজমেন্ট এবং বিল্ডিং প্রযুক্তি-কেন্দ্রিক বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরি খোঁজে না; বরং তারা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দেয়, উদ্ভাবন সৃষ্টি করে এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করে। বাংলাদেশকেও সেই পথে এগোতে হবে।
রিহ্যাব-এর প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হবে শিল্পখাতের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। দেশের আবাসন ও নির্মাণ খাতের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশলী, স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ এবং পেশাজীবীর অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের শেখার অংশ হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব দক্ষতাও অর্জন করবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের সুযোগও পাবে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। রিহ্যাব এই উদ্যোগকে কোনো ব্যবসায়িক প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে না। আবাসন খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চিন্তার পেছনে আর্থিক লাভের উদ্দেশ্য নেই। বরং এটি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় দায়িত্ববোধের অংশ। আমরা বিশ্বাস করি, একটি খাত শুধু ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে নয়, জ্ঞান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ গঠনের মাধ্যমেও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। আবাসন খাতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমরা উপলব্ধি করেছি যে, আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিকল্প নেই।
সরকারের কাছেও এই উদ্যোগের গুরুত্ব বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ এটি শুধু একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয় নয়; বরং দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, নগরায়ন, আবাসন নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি উদ্যোগ। যদি সরকার, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা এ ধরনের একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন, তাহলে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করি, যেখানে বাংলাদেশের তরুণরা শুধু ডিগ্রিধারী হবে না, বরং দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে দেশের উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে। আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখি, যা পরিকল্পিত নগরায়ন, নিরাপদ আবাসন, টেকসই নির্মাণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের জন্য নেতৃত্ব তৈরি করবে। সেই স্বপ্ন থেকেই REHAB University of Building & Technology (RUBT) প্রতিষ্ঠার চিন্তা। এটি কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক বিনিয়োগ, যা দেশের উন্নয়ন, সমাজের অগ্রগতি এবং আগামী প্রজন্মের সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করবে।