দেশের আবাসন ও নির্মাণখাত দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা স্থবির। ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে। বেড়েছে নির্মাণব্যয়। সার্বিকভাবে অর্থনীতির অবস্থাও ভালো নয়। রয়েছে শুল্ক-কর-সুদ নিয়ে অসন্তোষ। সবমিলিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত খাতসংশ্লিষ্টরা।
আবাসন ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমে যাওয়া, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ ঋণসুদ ও নির্মাণব্যয় লাগামহীন বাড়ায় নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রবণতা কমেছে।
ফলে রড, সিমেন্ট, বালু, সিরামিকসহ প্রায় সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা কমে গেছে। আবাসন খাতের এই ধীরগতির প্রভাব এখন ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, পরিবহন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও আসবাবপত্রসহ ২৬৯টি লিংকেজ শিল্পেও।
সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধীরগতি এ সংকট আরও তীব্র করেছে। বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৪৮ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন বাস্তবায়ন হার।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি প্রকল্প কমে যাওয়ায় নির্মাণসামগ্রীর বড় একটি বাজার সংকুচিত হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার ও ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতির কারণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি।
এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস প্রাইস ইনডেক্সে (বিএমপিআই)। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে সূচকের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ২ দশমিক ২ শতাংশে। অর্থাৎ, নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
নির্মাণকাজ কমলেও ব্যয় কমেনি
নির্মাণকাজ কমলেও ব্যয় কমেনি। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ব্যবসায়ীদের দাবি, কাঁচামালের দাম, কর ও শুল্ক বৃদ্ধির কারণে প্রকৃত ব্যয় সরকারি হিসাবের তুলনায় আরও বেশি বেড়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর বাজার ঘুরে দেখা যায়, রডের দাম প্রতি টনে তিন থেকে চার হাজার টাকা কমলেও বিক্রি কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত।
বর্তমানে প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে ৮৮ থেকে ৯০ হাজার টাকায়। অ্যাঙ্গেলের দাম ৮৭ থেকে ৯২ হাজার টাকার মধ্যে রয়েছে। মোটা প্লেটের দাম প্রতি টনে প্রায় ৫ হাজার টাকা কমে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকায় নেমেছে। পাতলা প্লেটের দামও প্রায় ১০ হাজার টাকা কমে টনপ্রতি দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে ইট, বালু ও সিমেন্টের দামে তেমন পরিবর্তন না এলেও থাই গ্লাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে অ্যাঙ্গেলসহ প্রতি বর্গফুট থাই গ্লাস বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬২০ টাকায়, যা এক বছর আগে ছিল প্রায় ৪২০ টাকা।
সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্মাণকাজের মৌসুম হওয়ায় তখন চাহিদা বাড়ে। বর্ষাকালে কাজ কমে যাওয়ায় বিক্রিও কমে যায়। ফলে কিছু পণ্যের দাম কমলেও অনেক পণ্য আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।
নির্মাণ উপকরণ বিক্রেতা ও আল্লাহর দান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আমিনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় নির্মাণকাজের মৌসুম হওয়ায় তখন চাহিদা বাড়ে। বর্ষাকালে কাজ কমে যাওয়ায় বিক্রিও কমে যায়। ফলে কিছু পণ্যের দাম কমলেও অনেক পণ্য আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।’
একই ধরনের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন আবাসন ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার আহসান হাবিব। তিনি বলেন, ‘বর্ষাকালে ছাদ ঢালাইসহ অনেক নির্মাণকাজ করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পের কাজও এই সময়ে কম থাকে। ফলে নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। শীত মৌসুমে কাজ বাড়লে বাজার আবার কিছুটা সচল হয়।’
কমেছে ঢাকায় ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি
আবাসন ব্যবসায়ীদের হতাশার শেষ নেই। তারা নানানভাবে ধুঁকছেন। এর মধ্যে উচ্চ সুদের কারণে আবাসন বাজারও চাপে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ নিয়ে অনেক ক্রেতার পক্ষে কিস্তি পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ঢাকায় ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে।
বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে। একই সঙ্গে সিরামিক পণ্যের চাহিদাও কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।
নির্মাণসামগ্রী উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোও রয়েছে বিপাকে। সিমেন্ট শিল্পেও উৎপাদন কমে এসেছে। সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা এখন উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দাম কমিয়েও বিক্রি বাড়ানো যাচ্ছে না।
বেড়েছে নির্মাণব্যয়
রিহ্যাবের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নির্মাণখাতেও পড়েছে। পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় শ্রমিকদের মজুরিও আগের তুলনায় বেশি দিতে হচ্ছে। ফলে আবাসন নির্মাণের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যে ফ্ল্যাট কয়েক বছর আগে প্রতি বর্গফুট প্রায় ৮ হাজার টাকায় নির্মাণ ও বিক্রি করা সম্ভব ছিল, বর্তমানে শুধু নির্মাণব্যয়ই প্রায় ১৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, গত পাঁচ বছরে আবাসন ও নির্মাণখাতের প্রবৃদ্ধি ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সময়ে কাঁচামালের দাম প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয়ও অনেক বেড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর ও অন্য ব্যয়। ফলে মোট নির্মাণব্যয় প্রায় ৪২ থেকে ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া এবং বিদ্যমান প্রকল্প চালিয়ে যাওয়া অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
উচ্চ সুদের হারও আবাসন বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ অনেক ক্রেতার নাগালের বাইরে। ফলে ঢাকায় অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে, যার সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে ছোট ও মাঝারি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের ওপর।
আবাসনখাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৬৯টি শিল্প জড়িত। ফলে এ খাতে মন্দা দেখা দিলে শুধু ডেভেলপার নয়, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত ও লাখো শ্রমিকের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।-রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল
উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে গতি ফিরিয়ে আনা, বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং অর্থায়নের ব্যয় কমানো না গেলে আবাসন ও নির্মাণখাতের স্থবিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এর প্রভাব দেশের শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে।
যা বলছে রিহ্যাব
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, ‘আবাসনখাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৬৯টি শিল্প জড়িত। ফলে এ খাতে মন্দা দেখা দিলে শুধু ডেভেলপার নয়, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত ও লাখো শ্রমিকের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
তিনি বলেন, ‘নিবন্ধন ব্যয় কমানো, গৃহায়নবান্ধব করনীতি প্রণয়ন, স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে এ খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।’
তার ভাষ্য, কর বৃদ্ধির কারণে ২৫ লাখ টাকার একটি লিফটের দাম বেড়ে প্রায় ৩৫ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বালু, সিমেন্ট, রড, টাইলসসহ প্রায় সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি পুরো খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।’ জাগোনিউজ