এজিএম বন্ধ থাকলেও রিহ্যাবের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার।
বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগ এর মহাপরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার মঙ্গলবার বলেন, শুধু সাধারণ সভা স্থগিত করা হয়েছে। রিহ্যাবের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো বাধা নেই। তিনি আরো বলেন, আমরা একটি তদন্ত কমিটি করে দেব। ওই কমিটি সব বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
দেশের আবাসন খাতের শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) নতুন কমিটি তিন মাসের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছে। এ সময়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ওয়াসা, রাজউকসহ বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের সাথে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ২ কোটি টাকার অনুদান দেওয়ার পর রিহ্যাব এর নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিয়েছে রিহ্যাব এর ১০ জন পরিচালক। আবার ১৯ পরিচালক পাল্টা পত্র লিখেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে।
রিহ্যাব নেতারা বলছেন, বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর আবাসন ব্যবসায়ীদের স্বার্থে একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সদস্য বান্ধব নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হসপিটাল ও হোটেলগুলোর সাথে নানা ধরনের সুবিধামূলক চুক্তি করা হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে গৃহায়ন মন্ত্রণালয় ও আবাসন খাতের সিনিয়র মেম্বারদের সাথে কয়েক দফা বৈঠক করা হয়েছে। পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী, বিদ্যু বিভিন্ন সংস্থাসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সভা করে ড্যাপসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করা হচ্ছে। সাধারণ মেম্বারদের স্বার্থে আগামী ১২ আগষ্ট রিহ্যাব সামার ফেয়ার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই মেলা ঘিরে ব্যবসায়ীরা নানা পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। সব কাজ স্বাভাবিক চলছিল, যখন রিহ্যাবের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ২ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হল, তখনই অভিযোগ আসল। তবে কি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে টাকা দেওয়াই কি রিহ্যাবের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে- এমন প্রশ্ন তুলছেন রিহ্যাব নেতৃবৃন্দ। ইতোমধ্যে এজিএম স্থগিত হয়েছে। এরপর থেকে রিহ্যাব এর কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, এই স্থবিরতা ও সংকটের সূত্রপাত মূলত প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ২ কোটি টাকা অনুদানকে কেন্দ্র করে। এ নিয়ে বোর্ডের একটি অংশ অভিযোগ করেছে যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ হয়নি। তবে বর্তমান নেতৃত্ব বলছে, সব সিদ্ধান্ত বোর্ডের অনুমোদনক্রমেই নেওয়া হয়েছে এবং অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রিহ্যাব নেতাদের দাবি, ‘২ কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূত ব্যয়’ বলা হলেও এটি যে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখ করা হচ্ছে না। তাদের মতে, বোর্ডের অনুমোদন নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে এই অনুদান দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।
এর আগে ১০ জন নির্বাচিত পরিচালক সংগঠনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ে অভিযোগ উত্থাপন করেন। মন্ত্রণালয়ে গত ৩০ জুলাই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে অধিকতর পর্যবেক্ষণ সময় সাপেক্ষ বিধায় ১ আগস্টের এজিএম স্থগিত করে। এরপর রিহ্যাব এর কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে।
এর প্রেক্ষিতে বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ১৯ পরিচালক বানিজ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথক চিঠি দেয়। তাদের দাবি, দ্বিতীয় বোর্ড সভায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। যদিও সেখানে অনুদানের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়সূচি আকস্মিকভাবে নির্ধারিত হওয়ায় নতুন বোর্ড সভা আহ্বানের সুযোগ ছিল না। ফলে দ্বিতীয় বোর্ড সভার নীতিগত সিদ্ধান্তের আলোকে ২ কোটি টাকার চেক প্রদান করা হয়।
রিহ্যাব পরিচালকদের একটি সূত্র বলছে, ২য় বোর্ড সভার কার্যবিবরণির ১২ নং পৃষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিলে অনুদান দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। ১৯ জন পরিচালকদের দাবি যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিলে অনুদান দেয়ার বিষয়টি ২য় বোর্ড মিটিং এ পাশ করা ছিল আর টাকার পরিমানটা ভাইস প্রেসিডেন্টরা আলোচনা করে নিয়েছেন এজন্য প্রেসিডেন্টের এই কাজকে কোনোভাবেই অনিয়ম বলা যায়না। এছাড়া পোষ্ট ফ্যাক্টো অনুমোদন নেওয়ার সুয়োগ তো রয়েছেই।
এছাড়া তারা অভিযোগ করেন, যারা অনিয়মের অভিযোগ তুলছেন তারা বারবার ‘২ কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যয়’ হওয়ার কথা বললেও, একবারও উল্লেখ করছেন না যে অর্থটি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে। তারা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের টাকা নিয়েও রাজনীতি শুরু করেছে।
এসব অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। এটি শুধু সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নয়; আবাসন খাত, ব্যবসায়িক পরিবেশ ও ক্রেতাদের আস্থার সঙ্গেও জড়িত। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং আগামী ১২ আগস্টের রিহ্যাব সামার ফেয়ার নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই সংকটের সমাধানে সব পক্ষকে মিলেমিশে কাজ করার আহবান জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে সকল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পরিচালকদেরকে নেয়া হলোনা কেন তা নিয়েই মুলত অভিযোগকারী পরিচালকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এ বিষয়ে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল জানান, তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট ১ সহ ৫ জনের তালিকা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে তিনি বাদে মাত্র ১ জনকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়।
ড. আলী আফজাল বলেন, আমরা বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। নির্বাচনের পর সবাইকে নিয়েই সংগঠন পরিচালনা শুরু করেছি। গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব আমাদের অভিযোগকারী ভাই বোনদের দিয়েই শুরু হয়েছে। আবাসন খাত বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই আমাদের পারস্পরিক মতপার্থক্য বা ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করেই এগিয়ে যেতে হবে । তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা এবং আবাসন শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা। এ জন্য পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্য, সাধারণ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। ’
সমস্যাগুলোর বিষয়ে সংগঠনের অভ্যন্তরীণভাবে সমাধানের চেষ্টা না করে সরাসরি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, আমাদের পরিচালনা পর্ষদের ১০ জন সদস্য তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরাসরি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন। এতে রিহ্যাবের স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে এবং সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো মতপার্থক্য বা অভিযোগ থাকলে তা প্রথমে বোর্ডের ভেতরে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত ছিল।
জানতে চাইলে অভিযোগকারী ও রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস বলেন, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে মন্ত্রণালয় থেকে সমস্যা সমাধনের কথা বলা হয়েছে। আমরা শুরু থেকেই পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে রিহ্যাব পরিচালনা করতে চেয়েছি। কিন্তু সব জায়াগায় কেমন জানি লুকচুরি। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি এবার শুধরে নিয়ে ভালভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারব। তা না হলে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাব। বর্তমানে তিনি ওমরায় রয়েছেন।
রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি ও দ্য স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (এসইএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল বলেন ‘আবাসন খাত এমনিতেই কঠিন সময় পার করছে। করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, মূল্যস্ফীতি ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে। নতুন প্রকল্পও কমে গেছে। এমন অবস্থায় ‘এ ধরনের বিরোধ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে না নিয়ে সংগঠনের ভেতরে বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) বা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত। এমন বিরোধ সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।
