আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
নগদ আয় না হওয়া সম্পদের ওপর আগাম করারোপ করা হচ্ছে

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব কেন্দ্র করে আবাসন খাতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে জমির মালিক, ডেভেলপার, ফ্ল্যাট ক্রেতা, এমনকি নির্মাণসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্পও প্রভাবিত হতে পারে।

এ বিষয়ে প্রস্তাবিত করের সম্ভাব্য প্রভাব, আবাসন খাতের বর্তমান বাস্তবতা এবং সরকারের প্রতি রিহ্যাবের সুপারিশ নিয়ে কথা বলেছেন আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ইয়াসির আরাফাত রিপন

জাগো নিউজ: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর নিয়ে রিহ্যাবের প্রধান উদ্বেগ কী?

ড. আলী আফজাল: আমাদের মূল উদ্বেগ হলো, যে সম্পদ থেকে এখনো কোনো নগদ আয় হয়নি, সেই সম্পদের ওপর আগাম কর আরোপ করা হচ্ছে। জমির মালিক যৌথ উন্নয়ন চুক্তিতে ফ্ল্যাট পেলেও হাতে নগদ অর্থ পান না। ফলে কোটি কোটি টাকার কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বাস্তবে অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এতে আবাসন খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাগো নিউজ: সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

ড. আলী আফজাল: ধরুন, একটি প্রকল্পে জমির মালিক ১২টি ফ্ল্যাট পেলেন, যার আনুমানিক মূল্য ১২ কোটি টাকা। বিদ্যমান প্রস্তাব অনুযায়ী অর্জনমূল্য বাদ দিয়ে অবশিষ্ট মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হতে পারে। অর্থাৎ নগদ অর্থ না পেয়েও তাকে প্রায় ২ কোটি টাকার কাছাকাছি করের দায় বহন করতে হতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রেই অবাস্তব।

জাগো নিউজ: সরকার বলতে পারে জমির মালিক তো মূল্যবান সম্পদ পেয়েছেন। তাহলে কর দিতে আপত্তি কোথায়?

ড. আলী আফজাল: আমরা করের বিরোধিতা করছি না। আমাদের বক্তব্য হলো, কর আরোপের সময় ও ভিত্তি যৌক্তিক হওয়া উচিত। প্রকৃত আয় বা মুনাফা অর্জনের আগে শুধু কাগুজে মূল্য ধরে কর আরোপ করলে জমির মালিককে হয় ঋণ নিতে হবে, নয়তো সম্পদ বিক্রি করতে হবে। এটি করনীতির ন্যায়সংগত প্রয়োগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

জাগো নিউজ: সাইনিং মানির প্রসঙ্গটি কেন বারবার তুলে ধরছেন?

ড. আলী আফজাল: কারণ অনেকেই জানেন না যে, সাইনিং মানির ওপর এরই মধ্যেই কর পরিশোধের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ সরকার শুরুতেই রাজস্ব পাচ্ছে। এরপর আবার ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময় অতিরিক্ত কর আরোপ করা হলে একই ধরনের লেনদেনের ওপর নতুন আর্থিক চাপ তৈরি হবে।

জাগো নিউজ: এই করের প্রভাব কি শুধু জমির মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

ড. আলী আফজাল: মোটেও না। দেশের অধিকাংশ আবাসন প্রকল্প যৌথ উন্নয়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। যদি জমির মালিকরা অতিরিক্ত করের কারণে চুক্তিতে নিরুৎসাহিত হন, তাহলে নতুন প্রকল্প কমে যাবে। এর প্রভাব ডেভেলপার, নির্মাণশিল্প, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়বে।

আরও পড়ুন

বাজেটে আবাসন খাতে প্রত্যাশিত সহায়তা নেই: রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট

জাগো নিউজ: সাধারণ ফ্ল্যাট ক্রেতাদের জন্য এর অর্থ কী?

ড. আলী আফজাল: প্রকল্প ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের বিক্রয়মূল্যও বাড়বে। অতিরিক্ত করের বোঝা বিভিন্নভাবে প্রকল্প ব্যয়ের অংশ হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ক্রেতাকেই বেশি দাম দিতে হয়। এতে মধ্যবিত্তের নিজস্ব বাসস্থানের স্বপ্ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

জাগো নিউজ: ভাড়াটিয়াদের ওপরও কি কোনো প্রভাব পড়তে পারে?

ড. আলী আফজাল: নতুন আবাসন সরবরাহ কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে বাজারে চাপ সৃষ্টি হবে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকলে ভাড়া বৃদ্ধির প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। তাই এই নীতির প্রভাব শুধু সম্পত্তি ক্রেতাদের নয়, ভাড়াটিয়াদের ওপরও পড়তে পারে।

জাগো নিউজ: কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কী ধরনের ঝুঁকি দেখছেন?

ড. আলী আফজাল: আবাসন খাতের সঙ্গে রড, সিমেন্ট, কাচ, সিরামিক, টাইলস, অ্যালুমিনিয়াম, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, পরিবহনসহ বহু শিল্প ও সেবাখাত জড়িত। নতুন প্রকল্প কমে গেলে এসব খাতেও উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

আরও পড়ুন

আবাসন খাতে ‘কালো টাকা’ বৈধ করার সুযোগ, বৈষম্য বাড়ার শঙ্কা

জাগো নিউজ: সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য কি এতে ব্যাহত হতে পারে?

ড. আলী আফজাল: স্বল্পমেয়াদে কিছু অতিরিক্ত রাজস্বের সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও নির্মাণ কার্যক্রম কমে গেলে সরকারের অন্য উৎস থেকেও রাজস্ব আদায় কমতে পারে। তাই বিষয়টি সামগ্রিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

জাগো নিউজ: রিহ্যাবের বিকল্প প্রস্তাব কী?

ড. আলী আফজাল: আমাদের প্রস্তাব হলো, জমির মালিক যখন ফ্ল্যাট বিক্রি করে প্রকৃত অর্থে আয় বা মুনাফা অর্জন করবেন, তখন কর আরোপ করা যেতে পারে। এতে সরকারও রাজস্ব পাবে, আবার বিনিয়োগ ও আবাসন বাজারেও অযথা চাপ সৃষ্টি হবে না।

আরও পড়ুন

ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি রিহ্যাবের

জাগো নিউজ: শেষবারের মতো সরকারের প্রতি আপনার বার্তা কী?

ড. আলী আফজাল: আমরা বিশ্বাস করি, রাজস্ব আহরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব। তাই জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ কর পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এটি শুধু আবাসন খাতের বিষয় নয়; কর্মসংস্থান, নগর উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের আবাসন সক্ষমতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

শেয়ার করুন