আমাদের মেইল করুন abasonbarta2016@gmail.com
জমি রেজিষ্ট্রির সময় যে তথ্যাবলী জানা প্রয়োজন

সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়কে স্থায়ী করে রাখবার একটি চমৎকার উপায় হইতেছে রেজিষ্ট্রেশন আইন। সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় মৌখিকভাবে হতে পারে। আবার লিখিত দলিল দ্বারাও হতে পারে। কিন্তু মৌখিকভাবে ক্রয়-বিক্রয়ের বিপদ অনেক। প্রতারিত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সময়ের সাথে সাথে সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেকেই লোভ সম্বরণ করতে না পেরে ছলে বলে এবং কৌশলে কি করে অন্যের সম্পত্তি আত্মসাত করা যায় তার প্রচেষ্টা চালায়।  বহু বৎসরের অতিকভজ্ঞতার ফসল এই রেজিষ্ট্রেশন আইন।

 

 রেজিষ্ট্রেশন আইনের উদ্দেশ্যঃ 

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-সম্পত্তি সম্পর্কিত স্বত্ত্বের জার দলিল প্রণয়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা এবং দলিলের যথার্থতা সম্পর্কে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা বিধান করাই রেজিষ্ট্রেশন আইনের উদ্দেশ্য। জালদলিল ও মিথ্যা স্বাক্ষী দ্বারা সমর্থিত মিথ্যা দাবির উপর প্রতিষ্ঠিত এরূপ সম্পত্তি বিষয়ক মামলা প্রতিরোধ করবার অভিপ্রায়েই এই আইনের সৃষ্টি হয়েছে। রেজিষ্ট্রীকরণের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হইল, স্থাবর-সম্পত্তির ক্রেতাদের স্বত্ত্বের অবস্থা নির্ণয়ের অবলম্বন প্রদান করা। রেজিষ্ট্রীকরণের উদ্দেশ্য হইল-স্বত্ত্বের নিশ্চয়তা প্রদান করা ও জাল-জালিয়াতি ও গোপনীয় আদান-প্রদান প্রতিরোধ করা এবং একটি সম্পত্তিতে একজন ব্যক্তির এরূপভাবে অর্জিত স্বত্ত্ব পরাভূত করা।

 

রেজিস্ট্রেশন প্রশাসন 

রেজিষ্ট্রেশন কার্য পরিচালনার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি রেজিষ্ট্রেশন পরিদফতর রয়েছে। সরকারকে রেজিষ্ট্রেশন পরিদফতরের প্রধান কর্মকর্তা হিসাবে একজন অফিসার নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যিনি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিষ্ট্রেশন সংক্ষেপে আই.জি.আর. নামে অভিহিত হবেন। সরকারকে আরও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে সরকার ইন্সপেক্টর জেনারেলের নিয়োগের পরিবর্তে অন্য কোন অপিসার নিয়োগ করতে পারবেন যিনি ইন্সপেক্টর জেনারেলের উপর অর্পিত ক্ষমতা ও কর্তব্যের সবগুলি বা যে কোন একটি নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে পরিচালনা করবেন। বর্তমানে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবন জেলাগুলিকে এই রেজিষ্ট্রেশন পরিদফতরের আওতার বাহিরে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে একজন ইন্সপেক্টর জেনারেল আছেন যিনি সাধারণতঃ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পর্যায়ের অফিসারগণের মধ্য হতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। ইন্সপেক্টর জেনারেলের অধীনে বর্তমানে একজন সহকারী ইন্সপেক্টর জেনারেল, দুইজন রেজিষ্ট্রি অফিসসমূহের পরিদর্শক, ঊনপঞ্চাশ জন জেলা রেজিষ্ট্রার, চারশত পঁচাত্তর জন সাব-রেজিষ্ট্রার, অবকাঠামোভূক্ত কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়ে রেজিষ্ট্রেশন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

মালিকানা স্বত্বের তদন্ত ও তল্লাশীঃ 

সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতার অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে ক্রয়েচ্ছু সম্পত্তির স্বত্বের তদন্ত ও তল্লাশী। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে বিক্রেতার নিকট হতে প্রাপ্ত স্বত্ব সম্পর্কীয় দলিলাদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। বিক্রেতার বর্তমান মালিকানা স্বত্ব কিরুপে কবে এবং কতখানি বর্তাইয়াছে দেখতে হবে। বিক্রেতা যদি ওয়ারিশানসূত্রে সম্পত্তির মালিক হন তাহা হলে তার পূর্ববর্তী মালিকদের ধারাবাহিক ও বৎসরানুক্রমিক একটি তালিকা প্রস্ত্তত করা আবশ্যক। তদন্ত করে দেখতে হবে বিক্রেতার পুর্ববর্তী মালিকের এই সম্পত্তিতে বৈধ মালিকানা স্বত্ব ছিল কিনা। কিংবা থাকলেও সময় প্রবাহে তাদের মালিকানা স্বত্ব কোনরূপ খর্ব হয়েছে কিনা। ওয়ারিশানসূত্রে প্রাপ্ত বিক্রেতার সম্পত্তির উপর অন্য কোন ওয়ারিশানের হক আছে কিনা এবং তাকলে ছাহাম বন্টন হয়েছে কিনা। বিক্রেতা খরিদসূত্রে বিক্রয়েচ্ছু সম্পত্তির মালিক হলে, সে যার নিকট হতে সম্পত্তি খরিদ করেছে তাহার বৈধ মালিকানা-স্বত্ব ছিল কিনা এবং থাকলে সঠিক রেজিষ্ট্রি করে স্বত্বান্তর করা হয়েছে কিনা। বিক্রেতার মালিকানা-স্বত্ব সম্পর্কীয় চেক, পরচা, নকশা ইত্যাদি পরীক্ষার পর সম্পত্তিসম্পর্কীত ইতিপূর্বে সম্পাদিত দলিল দস্তাবেজ যাহাকে ‘বায়া দলিল’ বলে পরীক্ষা করতে হবে। ইতিপূর্বে দলিল দস্তাবেজ বলতে মূল দলিল, বন্টননামা, হেবা-নামা, সালিশী আদালতে হুকুমজারী, ট্রাস্ট দলিল, ওয়াকফ্নামা, স্বত্ব প্রত্যার্পণ সম্পর্কিত কোন দলিলাদি, উইলের প্রবেট ইত্যাদি বোঝায়। বিক্রেতার স্বত্বের প্রমাণ হিসাবে দেওয়ানী আদালতের রায়ের কপি নামজারীর সইমোহরী কপি, সরকারী বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রদত্ত কর বা খাজনার রসিদপত্র ইত্যাদি যাচাই

করে দেখা উচিত।  

 দখলী স্বত্বঃ 

দলখ মালিকানা স্বত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিক্রেতাকে সম্পত্তির উপর গিয়ে সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে বিক্রেতার সম্পত্তির উপর কার্যকরী দখল আছে কিনা। সম্পত্তিটি যদি অন্য কাহারও দখরে থাকে তাহা হলে দখলকাররা কেন, কতদিন ও কি সূত্রে দখলে আছে এবং তাহা বিক্রেতার স্বত্ব ক্ষুনড়বকারক কিনা যাচাই করা উচিৎ।

 তল্লাশীঃ 

ক্রেতার ক্রয়েচ্ছু সম্পত্তি তল্লাশী করা একান্তভাবে আবশ্যক। যে রেজিষ্ট্রেশন অফিসের এখতিয়ারভূক্ত এবং রাজস্ব দফতরে সম্পত্তিটির কাগজপত্র সংরক্ষিত হয়, এই উভয় স্থানে তল্লাশী করা উচিত। বিক্রেতা তার স্বত্ব প্রমাণের জন্য যে সকল কাগজ ও দলিলাদী উপস্থাপন করে তা সঠিক কিনা সে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে গিয়ে পরীক্ষা করেই নিশ্চিত হওয়া যায়।

 রাজস্ব দফতরঃ 

রাজস্ব দফতরে তল্লাশী বলতে কালেক্টরেট, রাজস্ব সার্কেল অফিস, সাব-ডিভিশনাল ম্যানেজার অপিস ও তহশিল অফিসে, যেখানে সম্পত্তিটির খাজনা প্রদত্ত হয় অনুসন্ধান করা বোঝায়। এই সমস্ত দফতর তদন্ত করে এবং সইমোহরী কপি নিয়ে দেখতেহবে সম্পত্তিটি বিক্রেতার নামে আছে কিনা। অবশ্য মনে রাখা আবশ্যক যে রাজস্ব দফতরে রক্ষিত কাগজপত্রের ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে এবং মালিকের নামজারী করিয়াও চেক পরছা পাইতে অনেক সময় বিলম্ব হয়ে থাকে। এই ভুলভ্রান্তি বা বিলম্ব হেতু মালিকানা-স্বত্ব না লোপ পেয়েছে এরূপ ধারণা করা ঠিক হবে না, যদি পর্যায়ক্রমে মালিকানা-স্বত্ব ও দখল সঠিক বলিয়া গণ্য হয়ে থাকে।

 রেজিষ্ট্রেশন অফিসঃ 

বিক্রয়ে ইচ্ছুক সম্পত্তিটি যে রেজিষ্ট্রেশন অফিসের এখতিয়ারভূক্ত সেই অফিসে তললাশী দিয়ে পরীক্ষা করা যায়, সম্পত্তিটি ইতিপূর্বে একই বিক্রেতা বা অন্য কাহারও দ্বারা বিক্রয় হয়েছে কিনা। রেজিষ্ট্রেশন অফিসে তল্লাশী করবার নিমিত্ত লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তি থাকে, এসব ব্যক্তিকে ‘সার্ভার’ বলা হয়। দাগ নম্বর বা দলিলদাতার নামের আদ্যক্ষর রেজিষ্ট্রেশন অফিসের যে ইনডেক্সে থাকা সম্ভব। একজন সার্চার তল্লাশী করে বুঝতে পারবে দাগটি বিক্রয় হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে কতবার, কার দ্বারা এবং বর্তমানে কার নামে আছে ইত্যাদি। তল্লাশী ইচ্ছানুযায়ী যে কোন বৎসরের জন্য করা যায়, তবে স্থাবর সম্পত্তির তল্লাশী অনধিক বার বৎসরের জন্য করলে উত্তম হয়।

 

জমি বা সম্পত্তি নিবন্ধন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তার জন্য জানা দরকার জমি রেজিস্ট্রেশন আইন। ২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে  ১৯০৮ সালের জমি রেজিস্ট্রেশন আইনের কিছু সংশোধনী আনা হয়,  যা ১ জুলাই ২০০৫ সাল থেকে কার্যকর হয়। উক্ত সংশোধনীর উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো-

১। আগে জমি বিক্রির কাজটি ছিল একপক্ষীয় অর্থাৎ শুধু বিক্রেতাই দলিল সম্পাদনের কাজ করতেন। এখন বিক্রেতার পাশাপাশি ক্রেতাকেও সম্পাদনের কাজ করতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে দলিল করার সময় উভয়পক্ষকে উপস্থিত থাকতে হবে। ফলে এখন আর বিদেশে বসে কিংবা অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক ছেলে-মেয়ের নামে জমি কেনা সম্ভব না।

২। সম্পত্তিটিতে বিক্রেতার উপযুক্ত মালিকানা রয়েছে কিনা, তা প্রমাণের জন্য সম্পত্তিটির পূর্ববর্তী বিক্রেতা বা মালিকের কাগজপত্রের প্রমাণপত্র থাকতে হবে। এছাড়া সম্পত্তিতে যে বিক্রেতার আইনানুগ মালিকানা আছে এই মর্মে একটি হলফনামা জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় জমির বিক্রেতাকে দাখিল করতে হবে।

৩। সম্পত্তির ধরণ,সম্পত্তির দাম,সম্পত্তির মানচিত্র এবং আশপাশের সম্পত্তির বিবরণ ও আঁকানো ছবি দিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক।

৪। শেষ ২৫ বছর উক্ত সম্পত্তিটিতে কার কার মালিকানায় ছিল তার বিবরণ রেজিস্ট্রেশনের সময় দাখিল করা বাধ্যতামূলক।

৫। ক্রেতা ও বিক্রেতার ছবির উপরে দুপক্ষেরই স্বাক্ষর এবং টিপসই দেওয়া বাধ্যতামূলক। এর ফলে বেনামীতে আর কোনো সম্পত্তি কেনা-বেচা করা যাবে না।

৬। কোন ব্যক্তি যদি অন্য কোন ব্যক্তির নিকট হতে জমি ক্রয় করবে, এ মর্মে বায়নাপত্র করে থাকে , তাহলে সেই বায়নাপত্রটিও এখন থেকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এক্ষেত্রে নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন ফি হবে ৫০০ টাকা।

৭। জমির মূল্য ৫ লাখ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকার মধ্যে হলে রেজিস্টেশন ফি হবে ১ হাজার টাকা।

৮। জমির মূল্য যদি ৫০ লাখ টাকার বেশি হয়, তাহলে রেজিস্ট্রেশন ফি হবে ২ হাজার টাকা।

৯। যদি শরিয়া আইন অনুসারে স্বামী স্ত্রী,ভাই-বোন বা ছেলে মেয়েদেরকে কোন সম্পত্তি দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে সম্পত্তির মূল্য যাই হোক না কেন নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন ফি হবে ১০০ টাকা।

১০। চলতি সংশোধনী আইন কার্যকর হওয়ার পূর্বে সম্পত্তি কেনার চুক্তি সম্পাদনের ৩ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকত। কিন্তু বর্তমানে তা ১ বছর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে উল্লেখ্য যে, উভয় পক্ষ যদি চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় চুক্তিতে উল্লেখ করেন, তাহলে সেটিই কার্যকর হবে। অন্যথায় না থাকলে ১ বছর পর্যন্ত মেয়াদ থাকবে।

তবে উল্লেখ্য যে সমস্ত সম্পত্তি বিক্রির বায়না চুক্তি এখন পর্যন্ত নিবন্ধন করা হয় নি, সেই ক্ষেত্রে এই আইন বলবৎ হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে নিবন্ধনের জন্য বিক্রির সব প্রমাণ উপস্থিত করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় নির্ধারিত সময়ের পর সেই সম্পত্তির বিক্রয় চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে।

যদি কোনো সম্পত্তি কোনো ব্যক্তির নিকট বন্ধক থাকে, তাহলে যার কাছে জমিটি বন্ধক আছে তার লিখিত সম্মতি ছাড়া অন্য কোথাও বন্ধক রাখা বা বিক্রয় করা যাবে না। বিক্রি করলে তা বাতিল বলে বিবেচিত হবে।

অন্যান্য আইনকানুনঃ

  • ভূমি হস্তান্তরের দলিল স্ট্যাম্পের উপর সরকার কর্তৃক প্রকাশিত নির্দিষ্ট ফরমেট বা ছক অনুযায়ী তৈরি করতে হবে। এই ছকে ক্রেতা-বিক্রেতার ছবি সংযোজনের নতুন বিধান রাখা হয়েছে।

তামাদি হওয়ার সময়সীমা

  • তামাদি হওয়ার সময়সীমা তিন বছর থেকে এক বছর করা হয়েছে। দলিল তৈরি হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তা রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময়

  • দলিল তৈরি হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তা রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
  • মুসলিম পারিবারিক ধর্মীয় আইন অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি মৌখিক দান বা হেবা দলিলও এখন থেকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এই দলিল হবে ঘোষণামূলক। এর জন্য ফি হবে মাত্র ১০০ টাকা।

হেবা বা দান কে কাকে করতে পারে:-

  • হেবার ক্ষেত্রে শুধু রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয় তথা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে,পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে,ভাই-ভাই,বোন-বোন অথবা ভাই-বোন,দাদা-দাদী, নানা-নানী থেকে নাতি-নাতনী ও নাতি-নাতনী থেকে নানা-নানী সম্পর্কের মধ্যে হেবা দলিলে রেজিস্ট্রেশন করা যাবে। এ ক্ষেত্রে নামমাত্র ১০০ (একশত) টাকায় রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ পাওয়া যাবে।

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন:-

  • উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। তবে এক্ষেত্রে ওয়ারিশগণের মধ্যে সম্পত্তি বন্টন না হওয়া পর্যন্ত রেজিস্টেশন করার প্রয়োজন নেই।

সম্পত্তি বন্ধকের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন:-

  • সম্পত্তি বন্ধকের ক্ষেত্রেও রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি হবে ২০০ (দুইশত) টাকা থেকে ৫০০০(পাঁচ হাজার) টাকা। আগে যা ছিল ৫০০(পাঁচশত) টাকা থেকে ৫০,০০০(পঞ্চাশ হাজার) টাকা। এর ফলে বন্ধকি সম্পত্তি কেউ অন্যত্র বিক্রয় করে প্রতারণা বা জালিয়াতির আর কোনো সুযোগ পাবে না।

আদালতের মাধ্যমে প্রাপ্ত অগ্রক্রয় সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন:-

  • আদালতের মাধ্যমে প্রাপ্ত অগ্রক্রয় দলিলও রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বায়না চুক্তির রেজিস্ট্রেশন ও ফি:-

এখন থেকে বায়না চুক্তি রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। সম্পত্তি বিক্রয়ের জন্য বায়নার ক্ষেত্রে ৫(পাঁচ) লাখ টাকা পর্যন্ত সম্পত্তির ক্ষেত্রে ৫০০/-(পাঁচশত) টাকা,

৫ লাখ টাকার অধিক থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ১,০০০/-(এক হাজার) টাকা,

৫০ লাখ টাকার অধিকমূল্য সম্পত্তির জন্য ২,০০০/-(দুই হাজার) টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হবে।

বায়না নামা রেজিস্ট্রেশন করা ছাড়া চুক্তি বলবৎ করতে আইনগত কোন সুবিধা পাওয়া যাবে না। আবার বায়নার অবশিষ্ট টাকা জমা না করা হলে কোন মামলা মোকদ্দমা করা যাবে না। সম্পত্তি বিক্রয়ের বায়নানামা চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

তবে বায়নানামা রেজিস্ট্রেশন না করা চুক্তি কার্যকর বা বাতিল করতে হলে রেজিস্ট্রেশনের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের পর ৬ মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে। সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল ৩ মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

বিঃ দ্রঃ ভবিষ্যতে মামলা মোকদ্দমা থেকে পরিবারগুলোকে রক্ষা করতে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির দলিল রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পূর্ব পুরুষদের আপসে সম্পত্তি বন্টনের দলিল রেজিস্ট্রেশন বার্ধতামূলক করার ফলে ওয়ারিশদের ভোগান্তি অনেকাংশে হ্রাস পাবে। মাত্র ২০-(বিশ) টাকা মূল্যের স্ট্রাম্পে দলিল করে তা রেজিস্ট্রেশন করা যাবে এবং সর্বোচ্চ অংশ প্রাপ্ত অংশীদারের সম্পত্তির হিসাব থেকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণের অংশীদারদের ভাগে পাওয়া সম্পত্তির মূল্য মানের শতকরা আড়াই ভাগ টাকা সব অংশীদারের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ নেওয়া হবে।

• কবলা বন্ধকী দলিল রেজিস্ট্রি ফি

ক. স্ট্যাম্প শুল্ক ক্রয়মূল্যের…………………………………………………………………………৫%
খ. রেজিস্ট্রি ফি ১-২৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রয়মূল্যের জন্য টাকা…………………………………….৫০/-
গ. রেজিস্ট্রি ফি ২৫০১-৪০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রয়মূল্যের জন্য ……………………………………..২%
ঘ. রেজিস্ট্রি ফি ৪০০১ হতে তদুর্ধ্ব বিক্রয়মূল্যের জন্য………………………………………………২.৫০%

ঙ.হলফনামা ফি টাকা………………………………………………………………………………৫০/-

চ. পৌরকর: সিটি কর্পোরেশন/পৌর/টাউন/ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার জন্য………………………..১%
ছ. উৎস কর: সিটি কর্পোরেশন/পৌর/টাউন/ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার জন্য……………………….৫%
জ. সিটি কর্পোরেশন/পৌর/টাউন/ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকা বর্হিভূত জমি বিক্রির
ক্ষেত্রে জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ কর (১%+১%)………………………………………….২%
ঝ. সিটি কর্পোরেশন/পৌর/টাউন/ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বর্হিভূত এলাকার ১ লাখ
টাকার অধিক মূল্যের অকৃষি জমি বিক্রির ক্ষেত্রে বিক্রেতার উৎস কর……………………………….৫%
ঞ. মওকুফ: সিটি কর্পোরেশন/পৌর/টাউন/ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকার বাইরের ১ লাখ টাকার নিচে অকৃষি জমি ও অন্যান্য কৃষি/ভিটি/নামা ইত্যাদি) জমি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পৌর কর ও উৎস কর দিতে হবে না। কিন্তু জমি বিক্রির মূল্য ১ লাখ টাকার বেশি হলে, জমিটি অকৃষি হলে সে জমি পৌর এলাকার বাইরে হলেও তার জন্য ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে……………………………………………………………….৫%

রেজিস্ট্রেশন করার জন্য কিছু তথ্যের প্রয়োজন হয়। জমি রেজিস্ট্রি করতে বিক্রীত জমির পূর্ণ বিবরণ উল্লেখ থাকতে হবে। দলিলে দাতা-গ্রহীতার পিতা-মাতার নাম, পূর্ণ ঠিকানা এবং সাম্প্রতিক ছবি সংযুক্ত করতে হবে। যিনি জমি বিক্রি করবেন তার নামে অবশ্যই নামজারি (মিউটেশন) থাকতে হবে (উত্তরাধিকার ছাড়া)। বিগত ২৫ বছরের মালিকানা সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও সম্পত্তি প্রাপ্তির ধারাবাহিক ইতিহাস লেখা থাকতে হবে। সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য, সম্পত্তির চারদিকের সীমানা,নকশা দলিলে থাকতে হবে। দাতা কর্তৃক বিক্রীত সম্পত্তি অন্য কারো কাছে বিক্রি করেননি মর্মে হলফনামা থাকতে হবে। জমির পর্চাগুলোতে (সিএস,এসএ,আরএস) মালিকানার ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। বায়া দলিল (প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে) থাকতে হবে।

মমমমমমরেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) আইন-২০০৪ প্রবর্তনের পূর্বে রেজিস্ট্রেশন আইন-১৯০৮ এর বিধান মোতাবেক দলিল নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি প্রদান করে নির্দিষ্ট মূল্যের স্ট্যাম্পে লিখিত হতো। তখন দলিলের কোন নির্ধারিত ফরম ছিল না। দলিল লেখনগণ রেজিস্ট্রেশন আইন-১৯০৮ এর বিধান অনুসরণ করে তাদের গতানুগতিক কিছু ভাষা প্রয়োগ করে দলিলের মূল গাঁথুনি তৈরি করতেন। দলিলের সমগ্র অবয়বের মধ্যে দাতা, গ্রহিতা, চৌহদ্দি, তফসিলের বর্ণনা, বিক্রয়ের কারণ ছাড়া অন্যান্য অপ্রাসংগিক বিষয়ে আলোচনা থাকতো বেশি। কোন দক্ষ ব্যক্তি ছাড়া দলিল থেকে পাঠোদ্ধার করে দলিলের মূল বক্তব্য উদ্ধার করা কঠিন ছিল। দলিল সম্পাদনকালে দলিলদাতাকে কোন ডকুমেন্ট উপস্থান করতে হতো না, শুধুমাত্র নিজেকে দলিল দাতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে, দুজন সাক্ষী ও একজন সনাক্তকারীর স্বাক্ষর গ্রহণ করে দলিল সম্পাদিত হতো। ফলে ভুয়া দলিল সম্পাদনের সম্ভাবনা থাকতো বেশি। তা ছাড়া বিক্রেতা জমির প্রকৃত মালিক কি না, মালিক হলে তিনি কি পরিমাণ সম্পত্তির মালিক তা যাচাই করার কোন পদ্ধতি ছিল না। এ সকল সমস্যা দূরীকরণের জন্য দলিল রেজিস্ট্রিকরণের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে “ রেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) আইন-২০০৪” ও “ রেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) আইন-২০০৬”।

রেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) আইন-২০০৪ প্রবর্তনের পূর্বে কোন দলিল নিম্মবর্ণিত প্রধান অংশ ছিলঃ
(ক) দাতার নাম ও ঠিকানা।
(খ) গ্রহীতা/গ্রহীতাগণের নাম ও ঠিকানা।
(গ) দলিল সম্পদনের কারণসমূহ গতানুগতিক বর্ণনা।
(ঘ) বিক্রিতা জমির চৌহদ্দি।
(ঙ) বিক্রিত জমির তফসিল।
(চ) এফিডেফিট।
(ছ) প্রতি পৃষ্ঠায় বিক্রেতার স্বাক্ষর ও শেষ পৃষ্টায় স্বাক্ষী ও সনাক্তকারীর স্বাক্ষর, নাম ও ঠিকানা।

রেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) আইন-২০০৪ এর মাধ্যমে সংযোজিত ধারা ২২-এ এর বিধান মোতাবেক সরকার এস আর ও নং-৮১-আইন/২০০৫, তারিখ-০৬/০৪/২০০৫ খ্রিঃ এর মাধ্যমে ভূমি রেজিস্ট্রেশন এর জন্য সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি নমুনা “ফরম” প্রবর্তন করেন। বর্তমানে উক্ক নমুনা ফরম অনুযায়ী দলিল সম্পদিত হচ্ছে।

সূত্র : জাতীয় ই তথ্যকোষ

শেয়ার করুন