আব্দুর রাজ্জাক
সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিহ্যাব
একটি মানুষের জীবনে নিজের একটি ঘর শুধু একটি স্থাপনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিরাপত্তা, স্বস্তি, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন। আমাদের দেশের কোটি কোটি মানুষের কাছেই নিজের একটি বাসস্থান এখনো সেই স্বপ্নের নাম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে একটি ফ্ল্যাট বা নিজের একটি বাড়ি করা দিন দিন সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুযোগের কারণে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। এর ফলে আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। এই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম বড় প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন খাতেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
বেসরকারি আবাসন উদ্যোক্তারা গত কয়েক দশকে শহর ও শহরতলিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করেছেন। একটি আবাসন প্রকল্প শুধু একটি ভবন তৈরি করে না; আবাসন খাত দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
তবে এই খাত এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জমির মূল্য বৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, কর ও বিভিন্ন ফি, অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে আবাসন নির্মাণের ব্যয় অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে ক্রেতা ও উদ্যোক্তা—দুই পক্ষই এক ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে।
ফ্ল্যাটের মূল্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই বাস্তবতাগুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একটি ফ্ল্যাটের মূল্য শুধু নির্মাণসামগ্রীর দাম দিয়ে নির্ধারিত হয় না। জমির মূল্য, নির্মাণ ব্যয়, অর্থায়নের খরচ, অনুমোদন, কর, ভ্যাট, ইউটিলিটি ও অন্যান্য ব্যয়—সবকিছু মিলিয়েই চূড়ান্ত মূল্য তৈরি হয়। তাই সাধারণ মানুষের জন্য আবাসনকে সাশ্রয়ী করতে হলে সমস্যাটিকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে।
আমরা মনে করি, মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তুলনামূলক কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুযোগ বাড়ানো গেলে অনেক পরিবার নিজেদের আবাসনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে। একই সঙ্গে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করা, কর ও ফি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং পরিকল্পিত নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকার ওপর আবাসনের চাপ কমাতেও আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। শুধু রাজধানীকে কেন্দ্র করে আবাসন সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ঢাকার আশপাশে এবং দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় শহরে পরিকল্পিত নগরায়ন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে মানুষের বসবাসের সুযোগ ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
এখানে ক্রেতাদের সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্ল্যাট কেনার আগে জমির মালিকানা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, নকশা, নির্মাণের মান, চুক্তির শর্ত, মূল্য, হস্তান্তরের সময়সীমাসহ প্রয়োজনীয় বিষয় যাচাই করা উচিত। একইভাবে আবাসন উদ্যোক্তাদেরও ক্রেতার আস্থা ও সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একটি ফ্ল্যাট বিক্রি শেষ কথা নয়; ক্রেতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি একটি সম্পর্ক তৈরি হয়।
আমরা বিশ্বাস করি, আবাসন খাতকে এগিয়ে নিতে সরকার, বেসরকারি উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্রেতা—সব পক্ষের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক প্রয়োজন। নীতিতে স্থিতিশীলতা থাকলে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। আর বিনিয়োগ বাড়লে আবাসনের সরবরাহও বাড়বে।
আজকের বাংলাদেশে আবাসনকে শুধু ব্যবসা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মানুষের জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মৌলিক প্রয়োজন। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ তার সামর্থ্যের মধ্যে নিরাপদ ও মানসম্মত একটি ঘরের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন।
আবাসন খাত নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা একটাই—নীতি হবে বাস্তবসম্মত, বিনিয়োগ হবে নিরাপদ, উদ্যোক্তারা দায়িত্বশীল হবেন এবং ক্রেতারা পাবেন আস্থার পরিবেশ। সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে এগিয়ে গেলে আবাসন সংকটকে ধীরে ধীরে সম্ভাবনায় পরিণত করা সম্ভব।
একটি পরিকল্পিত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থা শুধু মানুষের থাকার জায়গা নিশ্চিত করবে না; এটি গড়ে তুলবে আরও সুন্দর, কর্মক্ষম ও ভবিষ্যৎমুখী বাংলাদেশ।